মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



চোখ জুড়ানো কমলগঞ্জের হামহাম জলপ্রপাত: ভ্রমণ যেখানে অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত হয়
ভ্রমণ ডেস্ক

ভ্রমণ ডেস্ক



বিজ্ঞাপন

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কুরমা বনবিট এলাকায় নৈসর্গিক হামহাম জলপ্রপাতের অবস্থান। দুর্গম জঙ্গলে ঘেরা এই জলপ্রপাতটির উচ্চতার নির্ভরযোগ্য সঠিক পরিমাপ এখনো জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় যে, এর উচ্চতা ১৩৫-১৬০ ফুটের মধ্যে, যেখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের উচ্চতা ১৬২ ফুট।

চারিদিকে এক শীতল শান্ত পরিবেশ। ডানে বামে চোখ ফেরানোর উপায় নেই। কেবলই ইচ্ছে করবে তাকিয়ে থাকি সৃষ্টিকর্তার এই অনন্য সৃষ্টির জন্য। জঙ্গলে উল্লুক, বানর আর হাজার পাখির ডাকাডাকির সাথে ঝর্নার ঝড়ে পড়ার শব্দ মিলে মিশে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ। ক্ষনিকের জন্য ভূলেই যেতে হবে কোথায় আছি, কিভাবে আছি। উপরে আকাশ, চারিদিকে বন, পায়ের নিচে ঝিরির স্বচ্ছ জল আর সম্মুখে অপরূপ ঝর্না।

২০১০ সালের শেষের দিকে একদল পর্যটক এই জলপ্রপাত আবিস্কারের দাবী করেন। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি- এই জলপ্রপাতের অস্তিত্বের কথা তাঁরা আগে থেকেই জানতেন।


হামহাম- শব্দটা একটু অপরিচিত মনে হওয়া স্বাভাবিক। কারণ দুটো: এক, এই জলপ্রপাত পরিচিতি পেয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। দুই, এই শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ ধারণা করেন ‘হাম্মাম’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি ,যার অর্থ গোসলখানা। আবার সিলেটি উপভাষায় ‘আ-ম আ-ম’ বলে পানির তীব্র শব্দকে বোঝানো হয়। তাই অনেকে ধারণা করেন এখান থেকেই ‘হামহাম’ নামের উৎপত্তি। এই জলপ্রপাতের আরেক নাম ‘চিতা ঝর্ণা’ হলেও হামহাম নামেই এটি অধিক পরিচিত।


ঝর্ণার যৌবন হলো বর্ষাকাল। তাই বর্ষাতেই এই অ্যাডভেঞ্চার সবথেকে বেশি থ্রিলিং। হামহাম জলপ্রপাতে সরাসরি গাড়ি নিয়ে পৌছানোর কোনো রাস্তা নেই। কয়েক কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা আপনাকে হেঁটে যেতে হবে। আর এই রাস্তা পাড়ি দেওয়ার জন্যই এই যাত্রা ভ্রমণের থেকে বেশিকিছু!

অ্যাডভেঞ্চারের প্রস্তুতি
মূল অ্যাডভেঞ্চার শুরু হবে কলাবনপাড়া থেকে। এটি মূলত কমলগঞ্জ উপজেলার শেষ গ্রাম। এর পাশেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। এই গ্রাম পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে। তারপর শুরু হবে পায়ে হাঁটা রাস্তা। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তাই সঙ্গে একজন গাইড নিয়ে যাওয়া ভাল। এতে পথ হারানোর সম্ভাবনাও থাকবে না এবং সাথে কোনো সাহায্য চাইলেও পাবেন। ঐ গ্রামের অনেকেই গাইড হিসাবে কাজ করে। আপনি জিজ্ঞেস করলেই পেয়ে যাবেন। খরচ পড়বে ৩০০-৫০০ টাকার ভিতরে।

যাতায়াতে পাহাড়ের উপরে বেশ কয়েকবার ওঠা-নামা করতে হয়। পাহাড়ি রাস্তা বেশ পিচ্ছিল থাকে। সেক্ষেত্রে হান্টিং বুট ব্যবহার করা ভাল। তাছাড়া পাহাড়ি পথে হাঁটার সুবিধার্থে একটি করে বাঁশ নিতে পারেন। জোকের হাত থেকে রেহাই পেতে সাথে লবণ ও সরিষার তেল নিলে ভাল হয়। আর অবশ্যই সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার নিয়ে নিতে হবে। কারণ ঐ রাস্তায় কোনো খাবারের দোকান পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

পথের ঠিকানা
ঝর্নাটির কাছে যাওয়ার সুবিধার জন্য এখনো কোনো সরকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ঝর্নায় যেতে হলে কুরমা বনবিটের চাম্পারায় চা-বাগান হয়ে যেতে হয়। চাম্পারায় চা-বাগান থেকে কলাবনপাড়ার দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার।

কলাবনপাড়া থেকে রাস্তা শুরু হবে চা-বাগানের মধ্য দিয়ে। বনের শুরুতেই দুটি রাস্তা পাওয়া যাবে। ডান দিকের রাস্তা দিয়েই যাওয়া সুবিধাজনক। রাস্তা দিয়ে ঢুকতেই জানা-অজানা অনেক ধরণের গাছ চোখে পড়বে। আর সাথে চোখে পড়বে নানান প্রজাতির বাঁশ। মাঝেমধ্যেই ছোট ছোট সাঁকো পার হতে হবে। যাবার পথে চোখে পরবে সারি সারি কলাগাছ, জারুল, চিকরাশি, কদম গাছ। ভাগ্য ভাল থাকলে দেখা পেতে পারেন চশমাপড়া হনুমানের!

রাস্তায় সবথেকে উঁচু এবং খাঁড়া যে পাহাড় তার নাম মোকাম টিলা। এটি অতিক্রম করা একটু কষ্টসাধ্য বটে! তবে মন খারাপ করতে হবে না। এর পাশের পাথুরে প্রাচীরগুলো দেখলে আপনার মন ভালো হতে বাধ্য! এই মোকাম টিলার পাশেই আরেকটি ছোট ঝর্না আছে যা স্থানীয়ভাবে ‘সীতাব’ নামে পরিচিত। অপরূপ এই ঝর্ণাটি দেখতে ভুলবেন না।

বর্ষাকালে জোঁকের উপদ্রব বেশি হয়। তাই এই ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। এই পাহাড়ি পথ একসময় আপনাকে স্বচ্ছ জলের স্রোতে নামিয়ে দিবে। এই স্বচ্ছ শীতল জলের স্রোত মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। স্বচ্ছ জলের নিচে তাকালেই চোখে পড়বে বিশাল বিশাল পাথর! এই জলের স্রোতের উৎপত্তি হয়েছে হামহাম জলপ্রপাত থেকে। তাই এই স্রোতে নেমে পড়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই আপনি ঝর্ণার পানি পড়ার শব্দ শুনতে পাবেন। অপূর্ব এই বনেই মধ্যে প্রমত্তা হামহামের পানির শব্দ এক অভূতপূর্ব অনুভূতি!

চারিদিকের শীতল শান্ত পরিবেশের মধ্যে হামহামের জলধারা এক অদ্ভুত ছন্দের সৃষ্টি করে! এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর পরিবেশে একবারও চোখ ফেরানোর চিন্তা আসে না। প্রায় ১৫০ ফুট উঁচু থেকে গড়িয়ে পড়া স্রোতধারা এগিয়ে যাচ্ছে পাথর থেকে পাথরে! আর এই শীতল পানি স্পর্শ করার অনুভূতিও অসাধারণ।


পর্যটকদের অনেকেই জলপ্রপাতের উপরে ওঠার জন্য চিন্তা করেন। কিন্তু এটি খুবই বিপদজনক। কারণ এতে ওঠার কোনো রাস্তা নেই। এছাড়াও এই ঝর্না র আশেপাশের মাটি খুবই পিচ্ছিল। তাই এর উপরে উঠার চেষ্টা করা মানে জীবন বাজি রাখা! আরেকটি কথা, অবশ্যই সন্ধ্যা হওয়ার আগে কলাবনপাড়ায় ফিরতে হবে। সেজন্য ফেরার জন্য কমপক্ষে ৫ ঘন্টা সময় হাতে রাখতে হবে। সূর্যাস্তের পরে জঙ্গলে থাকা খুবই অনিরাপদ।


যা মনে রাখবেন
প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাথে রাখতে হবে। কারণ জঙ্গলে চলার পথে ছোটখাটো ব্যাথা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। এছাড়া সাথে খাবার পরিবহনের জন্য পলিথিন বা প্লাস্টিকের দ্রব্যাদি পরিবহণ করলে তা সাথে ফেরত নিয়ে আসবেন। এগুলো অপচনশীল দ্রব্য, পরিবেশ বিপর্যয় ঘটায়।

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে সরাসরি সড়ক ও রেল পথে মৌলভীবাজার যাওয়া যায়। যারা আকাশ পথে মৌলভীবাজার যেতে চান তাদেরকে প্রথমে সিলেট গিয়ে তারপর সেখান থেকে সড়ক বা রেল পথে মৌলভীবাজার আসতে হবে। অন্যন্য রুটের চেয়ে রেলপথে ভ্রমণই সুবিধাজনক।

সড়কপথে
ঢাকার সায়েদাবাদ, কমলাপুর, কল্যাণপুর সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দিনে-রাতে বিভিন্ন পরিবহনের অসংখ্য বাস এই রুটে চলাচল করে। এই রুটে এসি ও নন-এসি দুই ধরনের বাসই রয়েছে। এসি বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রীণ লাইন, আল-মোবারাকা সোহাগ, সৌদিয়া ও এস.আলম। আর নন-এসি বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ পরিবহন, মামুন, ইউনিক পরিবহন।

রেলপথে
ঢাকা থেকে সরাসরি মৌলভীবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ রয়েছে। ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো মৌলভীবাজার হয়ে সিলেটে যায়। ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে প্রতিদিন একাধিক ট্রেন সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা–সিলেট রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো হলো- কালনী এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস।

বাস, ট্রেন বা বিমান যেভাবেই যান না কেনো, প্রথমে আপনাকে মৌলভীবাজার অথবা শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে যেতে হবে কমলগঞ্জ। শ্রীমঙ্গল থেকে লাউয়াছড়া যাওয়ার জন্য সিএনজি ও জীপ রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ভানুগাছা বাসস্ট্যান্ড থেকে লাউয়াছড়া যাওয়ার লোকাল বাসও রয়েছে।


লাউয়াছড়া বনের গা ঘেঁষে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, টিলা, কাঠের গুড়ি দিয়ে বানানো ছোট ছোট সাঁকো পেরিয়ে ঘন্টা খানিক হাটলেই পৌছে যাবেন কলাবানপাড়া। কমলগঞ্জ পৌরসভার মোড় থেকে আদমপুর রোড ধরে কলাবাগান পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ২৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে কুড়মা বাগান পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা। কুড়মা বাগান থেকে কলাবাগান পর্যন্ত বাকি পথটা কাঁচা রাস্তা। যাওয়ার পথে রাস্তায় পড়বে প্রাচীন চম্পারায় চা বাগান। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চা শ্রমিকদের ছোট্ট একটি গ্রাম এই কলাবাগান । এখান থেকে একজন স্থানীয় লোককে গাইড হিসেবে নিয়ে নিতে হয়। দুর্গম পথে এ ব্যক্তিই হবে আপনার পথ প্রদর্শক।


থাকার ব্যবস্থা
শ্রীমঙ্গল শহরের ভেতরে অনেক হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে। মাঝারি থেকে উচ্চ মানের হোটেল বা গেস্ট হাউস সহজেই পেয়ে যাবেন। এছাড়া শহরের কাছেই রয়েছে পাঁচ তারকা হোটেল ‘গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গলফ’। আপনার পছন্দমত থাকার জায়গা সুবিধামত বাছাই করে নিতে পারবেন। আরেকটা কথা, শ্রীমঙ্গল শহরটা কিন্তু অসম্ভব সুন্দর! তাই সময় পেলে শহরটাও ঘুরে দেখতে ভুলবেন না। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান খুব কাছাকাছি। চাইলে সহজেই ঘুরে আসতে পারবেন।

বাংলাদেশে জলপ্রপাতের সংখ্যা নেহাত কম নয়! নিঃসন্দেহে প্রত্যেক ভ্রমণই নতুন আনন্দ দেবে। কিন্তু হামহাম জলপ্রপাতে যাওয়া শুধুমাত্র ভ্রমণ হিসাবে বলা যাবে না। এই ভ্রমণ আপনাকে একটি দারুণ অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা দেবে!

তথ্যসূত্র:
১) bn.wikipedia.org/wiki/হাম_হাম_জলপ্রপাত
২) moulvibazar.gov.bd/site/tourist_spot/38bcb826-0758-11e7-a6c5-286ed488c766/নয়নাভিরাম-হামহাম-জলপ্রপাত