বুধবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



যুক্তরাজ্যের বাঙালি অধ্যূষিত টাওয়ার হ্যামলেটসে মাদক নির্মূলে যুদ্ধ ঘোষণা



বিজ্ঞাপন

০ ৩৭ ড্রাগ ডিলারের জেলদণ্ড
০ ৩শ অফিসারের ৪ মাসের অপারেশন
০ ৫০ আস্তানায় হানায়
০ নগদ ৬০ হাজার পাউন্ডসহ ৪ শর্টগান জব্দ
বিশেষ প্রতিবেদক:
বাঙালি অধ্যূষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রায় প্রতিটি রাস্তাঘাটে মাদক ব্যবসা জমজমাট। মাদকসেবীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা। স্কুল থেকে বখে যাওয়া কিশোর ও তরুণেরা অভিভাবকদের খামখেয়ালীপনায় মিশছে মাদকাসক্তদের সঙ্গে। হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত। একসময় মাদকসেবী থেকে নাম লেখাচ্চেছ মাদক ব্যাবসায়ীদের তালিকায়। পর্যায়ক্রমে হয়ে ওঠছে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্যাং লীডার। এরপর নিয়ন্ত্রণ করছে মাদক সাম্রাজ্য।

গত মাসে প্রকাশিত জিসিএসই ও এ লেভেল পরীক্ষায় বরাবরের মতো চম্কার ফলাফল করেছে বাঙালি অধ্যূষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের ছেলেমেয়েরা। স্কুল কলেজ শেষ করে মেধাবী ছেলে মেয়েরা উচ্চচশিক্ষা লাভে যাচ্চেছ অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজের মতো খ্যাতনামা ইউনিভার্সিটিতে। উচ্চচতর ডিগ্রী নিয়ে বেরিয়ে এসে হাইপ্রোফাইল চাকরিতে যোগদান করছে কেউ কেউ। এদের কথা মাঝে মাঝে সংবাদপত্রের পাতায় বড় হরফে ছাপা হয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত হাতেগোনা এসব ছেলেমেয়ের অর্জন গর্বিত করে গোটা কমিউনিটিকে। কিন্তু এই সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। এর বিপরীত চিত্র ভয়াবহ। মাদকের আগ্রাসী থাবা কেড়ে নিচ্চেছ বিপুলসংখ্যক কিশোর, তরুণের সম্ভাবনাময় জীবন। এরা হারিয়ে যাচ্চেছ ভয়াবহ এক অন্ধকার জগতে। সেই জগত হচ্চেছ মাদক রাজ্য। একবার প্রবেশ করলে আর ফিরে আসা যায়না। শুধু নিজের জীবনই নষ্ট হয়না, নিজের পরিবার ও সমাজকে নষ্ট করে দেয় মাদকের নেশা।

টাওয়ার হ্যামলেটসের রাস্তাঘাটে একটি দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে। একটি গাড়ি এসে হঠ্ াকোথাও থামবে। সাথে সাথে দুই একজন যুবক এসে গাড়িটির দুপাশে দাঁড়াবে। খুলে যাবে গাড়ির দুপাশের উইন্ডো। মাথা ঢুকিয়ে দুজন পথচারি গাড়ি ড্রাইভারের সাথে কী যেনো জরুরী কথা বলবে। মিনিটের মধ্যেই গাড়িটি স্থান ত্যাগ করবে। দুই পথচারী চলে যাবে যার যার গন্তব্যে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তারা নিয়ে যাচ্চেছ হাতের মুঠোয় করে কিছু একটা। কী নিয়ে যাচ্চেছ তারা? এটা বুজতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। হেরোইন, কোকেইনসহ নানা ধরনের মাদক। কিছু তারা সেবন করে, আবার কিছু বিক্রি করে।

এ এতো গেলো রাস্তাঘাটে মাদক বিকিকিনির অভিনব দৃশ্য। ঘরে বসেই কিচেনের জানালা দিয়ে দেদারছে মাদক বিক্রি করছে আরো অনেক ব্যবসায়ী। তারা পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সাধুর মতোই জীবনযাপন করে। কিন্তু রাত একটু ঘনিয়ে এলেই ঘরের সামনে মাদকসেবীদের লাইন দেখা যায়।

বেথনাল গ্রীনের এক বাসিন্দা জানান, তিনি যে বিহ্বিংয়ে থাকে তাঁর ঠিক বিপরীত বিহ্বিংয়ের নিচতলার একটি ফ্লাটে থাকে এক মাদক ব্যবসায়ী। স্বপরিবারেই সেখানে বসবাস করে সে। স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। দিনে চলাফেরা সাধুর মতো। কিন্তু রাত হলেই রূপ পাব্বে যায়। তার সাথে দেখা করতে আসে অনেকেই। কিচেনের জানালা খুলে মাদক বিকিকিনি চলে জমজমাট। অনেকেই বিষয়টি লক্ষ্য করেন না। কারো কারো দৃষ্টিগোচর হলেও ভয়ে কথা বলেন না। অনেকে পুলিশকে জানাতেও ভয় পান। এভাবেই টাওয়ার হ্যামলেটসের দেদারছে চলছে মাদক ব্যবসায়।

টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে যারা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের নিরান্নবধ্বুই শতাংশই বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত। সাম্প্রতিক সময়ে ড্রাগ ডিলারদের বিরুদ্ধে কাউন্সিলের সাড়াশী অভিযানে এমন চিত্র ফুটে ওঠেছে। গত মাসে ৫ দফায় আদালতের রায়ে ৩৭ জনের জেল জরিমানা হয়েছে। তাদের সকলেই বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত তরুণ ও যুবক।

তবে মাদকের আগ্রাসন যখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তখনই মাদক নির্মুলে নড়েচড়ে বসেছে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ও পুলিশ। প্রায় প্রতিদিনই অভিযান চলছে পাড়ায় পাড়ায়। আটক করা হচ্চেছ ড্রাগ ডিলারদের। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, গত ১৭ আগস্ট শুক্রবার স্নেয়ার্সব্রুক ক্রাউন কোর্টে ১৬ জন মাদক ব্যবসায়ীকে মোট ৪৯ বছর, ২৩ আগস্ট ৮ জন মাদক ব্যবসায়ীকে ২৪ বছর এবং সর্বশেষ ৩১ আগস্ট আরো ৩জন ব্যবসায়ীকে ৭ বছর ৮ মাস কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এরআগে আরো ৪ জনের শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া আগামী ২৭ সেপ্টে“র আরো ৬ জনের জেল দন্ড ঘোষণা করা হবে। ওই ৬ জন তাদের বিরুদ্ধে আনিত আভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছে।

দীর্ঘ ৪ মাসের অপারেশন শেষে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়। অপারেশন ষ্ক্রকনটিনামম্ব নামের এই অভিযানটি পুলিশ, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল এবং স্থানীয় হাউজিং এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে কয়েক মাস আগে পরিচালিত হয়। ৩০০ জনেরও বেশি অফিসার এই অপারেশনে নিয়োজিত ছিলেন। অপারেশন চলাকালে পুলিশ মোট ৫০টি ঠিকানায় তল্লাশী চালিয়ে ৬০ হাজার পাউন্ড ক্যাশ, বিপুল পরিমানের ক্লাস এ ড্রাগস এবং ৪টি শর্ট গান জব্দ করে।

উল্লেখ্য, ৩১ আগস্ট, শুক্রবার সর্বশেষ যে ৩ জনকে জেল দন্ড দেয়া হয় তারা হলেন সালিকুল ইসলাম (২২) সিঙ্গেলওয়েল রোড, গ্রেভইসএন্ড – ২ বছর ৪ মাস, তৌকির আহমদ (২১), আর্নেস্ট স্ট্রীট, টাওয়ার হ্যামলেটস – ২ বছর ৮ মাস এবং মোহাম্মদ আলী হাসান ২৫, নো ফিক্সড এড্রেস- ২ বছর ৮ মাস।

১৭ আগস্ট, শুক্রবার স্নেয়ার্সব্রুক ক্রাউনকোর্টে যে ১৬ জন ড্রাগ ডিলারের জেল হয়েছে তারা হলো, হাবিবুর রহমান (২২) সোয়াটন রোড, রাজা মিয়া (২৩) ট্রাফালগার গার্ডেন, জামিল হোসাইন (২৪) শ্যাডওয়েল গার্ডেন, ওলিউর রহমান (২৩) চ্যাপম্যান স্ট্রীট, রাকিব উদ্দিন (১৯) টার্লিং স্ট্রীট, সোলায়মান রাবিধ্ব (১৮) হোবার টাওয়ার, আবু তাহের সিদ্দিকী (২৪) গ্লাসওয়ার্থ এভিনিউ, রুহেল আহমদ (৩১) কমোডর স্ট্রীট, ইমতিয়াজ ইসলাম (২১) বেকেলস স্ট্রীট, মোহাম্মদ আহমদ (২৫) ব্যাকন স্ট্রীট, রাশিক উদ্দিন (২৬) হ্যাজেলডেন রোড, ইলফোর্ড, এনামুর রহমান (২২) অরডেল রোড, মোহাম্মদ মহিবুর রহমান (২২) সেন্টপলস ওয়ে, আমমেদুর রহমান (২১) কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই, আব্দুল আজিজ (৩৯) মিয়া টেরেস এবং আকবর হোসাইন (২৪) হ্যালী স্ট্রিট।

২৩ আগষ্ট, বৃহস্পতিবার শাস্তি হওয়া ৮ জন হলেন, সামাদ উদ্দিন (২৮), চিকস্যান্ড স্ট্রীট, নউফেল ই- গাবোজ (২১) কমার্শিয়াল রোড, নুর হোসাইন (২১) মার্টিনিউ স্কয়ার, শ্যান বেইটস (২১) কর্নওয়াল স্ট্রীট, ইসমাঈল কিয়ানী (২০) ক্যাম্পবেল রোড, মোহাম্মদ মোততাকীর রহমান (২০) জিউফ কেইড ওয়ে, তাহমিদ হোসাইন (২১) দ্যা কোয়ার্টার ডেক, মোহাম্মদ মহসিন (৪২) ওরিয়ন হাউস।

টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র জন বিগস ড্রাগ ডিলারদের শাস্তি এবং অপারেশনটি সফল হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ড্রাগ এবং এ সংক্রান্ত অসামাজিক কার্যকলাপ আমাদের বাসিন্দাদের কাছে একটি বিরাট উদ্বেগের বিষয়। এই উদ্বেগ দমনে পুলিশের সাথে আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে। মেয়র বলেন, এই শাস্তি ড্রাগ ডিলারদের উদ্দেশ্যে একটি শক্তিশালী ম্যাসেজ। যারাই এই কাজে নিয়েজিত থাকবেন তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। তিনি বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটসে ড্রাগ ডিলারদের স্থান নেই।

এছাড়া মেয়র ড্রাগ ডিলিংয়ের ভিকটিমদেরও সহযোগিতা চালিয়ে যাবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। মেয়র বলেন, আমাদের এখানে বেশকটি ভালো সার্ভিস রয়েছে এবং তারা যাতে সুস্থ জীবনে ফিরে আসেন এজন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্চিছ।
কেবিনেট মেম্বার ফর কমিউনিটি সেইফটি কাউন্সিলার আসমা বেগম বলেন, ড্রাগ ডিলিং আমাদের কমিউনিটির একটি রোগ বিশেষ। এই রোগ দূর করতে কাউন্সিল এবং পুলিশ সর্বোচ্চচ প্রায়োরিটি দিয়ে আসছে।

টাওয়ার হ্যামলেটসের ক্রাইম, গ্যাং এন্ড ড্রাগ বিষয়ক কর্মকর্তা ডিটেক্টটিভ চীফ ইন্সপেক্টর মাইক হ্যামার তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাস্তা থেকে এসব ড্রাগ ডিলারদের উচ্চেছদের ঘটনা টাওয়ার হ্যামলেটস তথা লন্ডনের জন্য একটি সুসংবাদ। শাস্তি প্রাপ্তরা কোকেইন, হিরোইন সরবরাহে জড়িত ছিলো। আশা করছি তাদের গ্রেফতার এবং শাস্তির কারনে এই সাপ্লাই কাজ বন্ধ হবে তথা সমাজে এর একটি দীর্ঘ মেয়াদী ইতিবাচক ফল আসবে। তিনি বলেন, আমরা এখানেই থেমে যাইনি। আমাদের অপারেশন অব্যাহত আছে। আমরা বাসিন্দাদের আরো সুখবর দিতে পারবো বলে আশাবাদী।