রবিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



যুক্তরাজ্যে জিসিএসই ও এ লেভেল পরীক্ষার ফলাফল বাঙালি শিক্ষার্থীদের জয়জয়কার
বিশেষ প্রতিবেদক

বিশেষ প্রতিবেদক



বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্যে গত ১৬ আগস্ট এ লেভেল এবং ২৩ আগস্ট জিসিএসই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে বৃটিশ-বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা বরাবরের মতোই ভালো ফলাফল করেছে। সাপ্তাহিক দেশ এর ইমেইলে প্রেরীত কিছু কৃতী শিক্ষার্থীর ফলাফল নিচে তুলে ধরা হলো।

জিসিএসইর ফলাফল :
মোহাম্মদ বিলাল আহমদ : টাওয়ার হ্যামলেটসের বাসিন্দা মোহাম্মদ বিলাল আহমদ সেন্টপলস ওয়ে ট্রাস্ট স্কুল থেকে ছয়টি বিষয়ে ডাবল স্টার, তিনটি বিষয়ে এ স্টার, ও দুটি বিষয়ে এ পেয়ে কৃতীত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাঁর পিতা হাজী মোহাম্মদ আনোয়ার মিয়া ও মাতা মোছাম্মৎ আনোয়ারা বেগম সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী। তার দেশের বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার উত্তর দাওরাই গ্রামে।

শাহ শাখাওয়াৎ আলী : জিসিএসই পরীক্ষায় শাহ শাখাওয়াৎ আলী নিউহ্যামের ব্রমটন মেনর স্কুল থেকে তিনটি এ স্টার এবং সব বিষয়ে ‘এ’ পেয়ে কৃতীত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদ হতে চায়।
শাহ শাখাওয়াৎ আলী ইস্ট লন্ডনের বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিক শাহ শহীদ আলীর দ্বিতীয় সন্তান এবং অবসর প্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম শাহ ফজর আলীর নাতি। তাদের গ্রামের বাড়ি নবীগঞ্জ উপজেলার কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের মান্দার কান্দি গ্রামে। কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব শাহ সহিদ আলী তাঁর সন্তানের উজ্বল ভবিষ্যতের জন্য সকলের নিকট দোয়া চেয়েছেন।

টাওয়ার হ্যামলেটসের শিক্ষার্থীদের সাফল্য:
এদিকে নতুন মার্কিং পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত এবারের জিসিএসই রেজাব্বে টাওয়ার হ্যামলেটস বারার শিক্ষার্থীরা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে।
ঐতিহ্যগত এ – ই গ্রেড পদ্ধতির বদলে এবার থেকে নতুন মার্কিং পদ্ধতি ১ থেকে ৯ চালু করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে টাওয়ার হ্যামলেটসের জিসিএসই পরীক্ষার্থীদের ৮২ শতাংশ এবার ইংরেজীতে ৯-৪ গ্রেড লাভ করে, যা পুরনো পদ্ধতির এ থেকে সি গ্রেড এর সমমান। অংকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী অর্জন করেছে ৯-৪ গ্রেড।

২০টি জিসিএসই সাবজেক্টে এবার প্রথমবারের মতো নতুন মার্কিং পদ্ধতি চালু হলো। এর আগে গেলোবার ৩টি সাবজেক্টে নতুন এই পদ্ধতি চালু করা হয়েছিলো।

পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সকালে নির্বাহী মেয়র জন বিগস হোয়াইটচ্যাপলের সোয়ানলী স্কুলে যান এবং উৎফুল্ল শিক্ষার্থীদের উচ্চছাসে নিজেও অংশ নেন। সোয়ানী স্কুলের ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এবার ম্যাথস ও ইংলিশে ৯ – ৪ গ্রেড লাভ করেছে।

শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে মেয়র বিগস বলেন, কঠোর পরিশ্রমের পর প্রত্যাশিত ফল শিক্ষার্থীদের লাভ করতে দেখে আমিও অভিভূত। গোটা বারায় এবারের জিসিএসই রেজাব্ব সন্তোষজনক।

কাউন্সিলের শিক্ষা বিষয়ক কেবিনেট মেম্বার কাউন্সিলর ড্যানি হ্যাসল গিয়েছিলেন মালবারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী, তাদের শিক্ষক, সহায়তাকারী কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে এমন অনন্য সাফল্য অর্জন হয়েছে। আমরা সবাই গর্বিত, আনন্দিত।
সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন গার্লস স্কুল থেকে এবারের জিসিএসই পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের ৯৩ শতাংশই ইংলিশে ৯-৪ গ্রেড পেয়েছে, যা গতবারের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি। ইংলিশ এবং ম্যাথস এ এবার ৯-৪ গ্রেড লাভ করেছে এই স্কুলের ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী।

এবারের জিসিএসইতে বারার মেধাবী শিক্ষার্থীদের একজন হচ্চেছ সোয়ানী স্কুলের মাউড মাকলগলান, যে ৮টি বিষয়ে ৯ গ্রেড ও ২টি এস্টার লাভ করেছে। মাউড সহ সারা দেশের ৭৩২ জন শিক্ষার্থী নতুন পরীক্ষা পদ্ধতিতে ৯ গ্রেড লাভ করে। সোয়ানলীর আরেক শিক্ষার্থী মেগান ওহ্বহাম ৪টিতে গ্রেড ৯, ২টিতে গ্রেড ৮, ৩টিতে গ্রেড ৭ এবং এ স্টার লাভ করেছে।

মাহদি হাসান ১১টি জিসিএসইম্বর মধ্যে ৪টিতে গ্রেড ৯, ৪টি বিষয়ে গ্রেড ৮ এবং তিনটি এ স্টার লাভ করেছে এবং ম্যাথস ও ফিজিক্স নিয়ে সে এ লেভেল করার পরিকল্পনা করছে। সোয়ানলী স্কুলের সফিয়া মারিয়া লালডজ স্কোর ৫টি গ্রেড ৯, ৩টি গ্রেড ৭, ৩টি এ ও ১টি এ স্টার।

এ লেভেল পরীক্ষার ফলাফল:
মোহাম্মদ যোবায়ের মালিক : স্যার জনকাস সিক্সথ ফর্ম স্কুল থেকে এ এলেভেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অংকে এ স্টার ও বিজনেস স্টাডিজে বি পেয়ে কৃতীত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে মোহাম্মদ যোবায়ের মালিক। সে পূর্ব লন্ডনের ফোর্ডস স্কয়ার মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালিক এর পুত্র। ডেগেনহাম ইস্ট এর বাসিন্দা মোহাম্মদ জুবায়ের মালিকের দেশের বাড়ি ওসমানীনগর উপজেলার হাজীপুর গ্রামে। ইতোপুর্বে লন্ডন ইসলামিক স্কুল থেকে জিসিএসই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সে চমৎকার ফলাফল করে। সে সকলের দোয়া প্রার্থী। সে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে অংক ও ম্যাথস নিয়ে পড়বে।

শাহ ফাহিমুর রহমান : এ লেভেল পরীক্ষায় লন্ডন একাডেমী অব এক্সিলেনস থেকে শাহ ফাহিমুর রহমান কেমিস্ট্রি, বায়োলজি ও ম্যাথমেটিকসসহ প্রতিটি বিষয়ে এ গ্রেড পেয়ে কৃতীত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে খ্যাতনামা বিদ্যাপীঠ কিংস কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। শাহ ফাহিমুর রহমান ভবিষ্যতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হতে চায়। সে তাঁর পিতা-মাতা এবং পরিবার সকলের নিকট দোয়া প্রার্থী।

শাহ ফাহিমুর রহমান সুনামগঞ্জ জেলার শিল্প নগরী ছাতক দোলারবাজার ইউনিয়নের বুরাইয়া চিছরাওলী গ্রামের (পীরবাড়ি) অধিবাসী এবং যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব শাহ মোসতাহিদ মিয়ার নাতি, শাহ আসফাকুর রহমান ও ফৌজিয়া খানম চৌধুরীর জ্যৈষ্ঠ সন্তান এবং ব্যারিস্টার শাহ মিসবাউর রহমানের ভাতিজা।

উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে মোধাবী ছাত্র ফাহিমুর রহমান জিসিএসই পরীক্ষায় ১১টি বিষয়ে স্টার পেয়ে কৃতীত্বের স্বাক্ষর রেখেছে।

টাওয়ার হ্যামলেটসের শিক্ষার্থীদের সাফল্য:
এদিকে এ লেভেল পরীক্ষায় টাওয়ার হ্যামলেটস বারার শিক্ষার্থীরা বরাবরের মতো ভালো ফল অর্জন করে তাদের সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে তাদের উন্নতি লক্ষ্যনীয়।

বারার ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কমপক্ষে তিনটি এ লেভেলে এ স্টার থেকে ই গ্রেডে পেয়েছে, যা গতবার অর্থ্ া২০১৭ সালের তুলনায় ৫ দশমিক ৯ ভাগ বেশি।
শতকরা ৯৩ ভাগ শিক্ষার্থী কমপক্ষে ২টি এ লেভেলে এ স্টার -ই গ্রেড পায়, যা গতবারের চেয়ে ৩.৪ শতাংশ বেশি। ৯৮ শতাংশ এ স্টার – ই গ্রেড পেয়ে কমপক্ষে একটি এ লেভেল উত্তীর্ণ হয়েছে, যা গতবারের চেয়ে ১.৮ শতাংশ বেশি।

ইউনিভার্সিটিগুলো যে স্কোরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের আসন অফার করে, সেই স্কোরিংয়ের ক্ষেত্রে টাওয়ার হ্যামলেটসের একজন এ লেভেল শিক্ষার্থী এবার গড়ে ৩৩ দশমিক ৫ পয়েন্ট অর্জন করেছে, যা ২০১৭ সালের চেয়ে ১.৬ পয়েন্ট বেশি।
পপলারের ল্যাংডন পার্ক স্কুলের সকল সিক্সথ ফর্ম শিক্ষার্থী তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রায় সকলেই পছন্দের ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

এ লেভেল পরীক্ষার ফল ঘোষনার দিন ১৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার নির্বাহী মেয়র জন বিগস ল্যাংডন পার্ক স্কুলে যান এবং সাফল্যের আনন্দে উদ্বেলিত ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষকদের আনন্দ উদযাপনে অংশ নেন। এসময় তিনি বলেন, আমাদের তরুণ ছেলেমেয়েরা যে কঠোর পরিশ্রম করেছে, তা ফল এবারের রেজাব্বে ফুটে উঠেছে। তাদের এই অনন্য অর্জনে আমি খুবই অভিভূত এবং আমি তাদেরকে ও তাদের সকল শিক্ষক ও অন্যদের অভিনন্দন জানাই।

স্কুল বিষয়ক কেবিনেট মেম্বার, কাউন্সিলর ড্যানি হ্যাসল বলেন, এই রেজাব্ব সত্যিকার অর্থেই যথার্থ এবং গত বছরের চেয়ে এবার উন্নতির ধারা যে অব্যাহত রয়েছে, তার প্রমান হচ্চেছ এবারের রেজাব্ব। আমাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাপোর্ট স্টাফদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এই অসাধারণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

ল্যাংডন পার্ক স্কুলের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী মানাউল হক বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির লেডি মার্গারেট হল কলেজে ম্যাথমেটিক্সে ফাউন্ডেশন কোর্স করার আমন্ত্রণ পেয়েছে। সারাদেশ থেকে মাত্র ১২ জন শিক্ষার্থী অক্সফোর্ডের ফাউন্ডেশন ইয়ার প্রোগ্রামে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছে এবার। এই অফারে উচ্চছসিত মানাউল বলেন, অক্সফোর্ডে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি ভীষন উদ্দীপ্ত। আগে কখনোই আমি ফাউন্ডেশন ইয়ার প্রোগ্রামের কথা শুনিনি। অক্সফোর্ডে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনে আমাকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে এটি নিচ্ঞসন্দেহে আমার জন্য উপযুক্ত একটি সুযোগ।

ল্যাংডন পার্ক স্কুলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফল অর্জন করেছে শাহ আহমেদ, সে পেয়েছে ২টি এ এবং একটি এ স্টার গ্রেড এবং সে গণিত নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন এর কিংস কলেজে অধ্যয়ন করবে।

শাইখা ইসলাম ল্যাংডন পার্ক স্কুলে এ লেভেলে অধ্যয়ন শুরু করলেও পরে সে স্পোর্টস’ এ বিটেক কোয়ালিফিকশন এ পরিবর্তন করে এবং এখানে সে স্কোর করেছে ট্রিপল ডিস্টিংশন। এখন সে এডুকেশন স্টাডিজ নিয়ে বিএ ডিগ্রীর জন্য ইউসিএল এ আসন নিশ্চিত করেছে।

শাইখা বলেন, প্রথম দিকে আমি ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারবো, এমনটা আশা করিনি, তবে এখন আমি কী করতে পারবো ভেবেছিলাম, তারচেয়ে অনেক বেশি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। ইউসিএল এ সুযোগ পেয়ে আমি বিস্মিত হয়েছি।