শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ



Sex Cams

                    চাইলে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন

সুনামগঞ্জে ‘বিষে’ তিন সন্তানের মৃত্যু, মুমূর্ষু বাবা হাসপাতালে



বিজ্ঞাপন

লাতু ডেস্ক, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬:: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় তিন শিশুকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে স্বজনরা ধারণা করেছেন।

তারা এ ঘটনার জন্য শিশুদের বাবার দিকে ইঙ্গিত করেছেন; যিনি নিজেও ‘বিষ পান’ করে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

শনিবার ভোরে উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের সীমান্ত গ্রাম রজনীলাইনের একটি বাড়ি থেকে তিন শিশুর লাশ ও তাদের বাবাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বলে জনিয়েছেন বাদাঘাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ হোসাইন মোহাম্মদ আরাফাত।

মারা যাওয়া তিন শিশু হল- ১০ বছর বয়সি মাওয়া আক্তার, সাত বছর বয়সি শামীম মিয়া ও দেড় বছর বয়সি তামিম মিয়া।

স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাবি, মাদক ও জুয়ায় আসক্ত শরাফত আলী নিজেই সন্তানদেরকে বিষ মিশিয়ে খাওয়ান। তারপর নিজেও বিষপান করেন।

তাহিরপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ফৌজিয়া সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাত ১টা বা দেড়টার দিকে ঘটনাটি ঘটেছে। পরদিন সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে তিন সন্তান ও বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দেখা যায়, শিশু তিনজন হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই মারা গেছে। আর শরাফতকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”

প্রতিবেশী রনু মিয়া বলেন, “শরাফত মিয়ার স্ত্রী সৌদি আরব প্রবাসী। ঘটনার দিন তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় বড়ছড়া বাজারে যান শরাফত মিয়া। বাড়ি ফেরার পথে সঙ্গে করে খাবার নিয়ে যান।”

আরেক প্রতিবেশী বলেন, তিন সন্তানকে হত্যার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নজিরবিহীন। নেশাগ্রস্ত শরাফত মদ বা ইয়াবা খেয়ে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরেক প্রতিবেশীর দাবি, শরাফত অনলাইন জুয়া ও নেশায় আসক্ত। সম্প্রতি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা জুয়ায় নষ্ট করেছে তিনি।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শরাফত আলীর পাশে আছেন তার বড় ভাই মারফত আলী। তিনি বলেন, “প্রায় তিন বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন শরাফত আলীর স্ত্রীর ফাতেমা বেগম।

“পরে তাদের ঘরে আরেকটি সন্তান জন্ম হয়। সম্প্রতি তার স্ত্রী আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্ত্রীকে বিদেশ পাঠানোর জন্য শরাফত নিজেই প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করেন।”

তিনি বলেন, “যাত্রার দিন নির্ধারিত হওয়ার এক সপ্তাহ আগে স্ত্রীকে বিদেশ না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন শরাফত। তবে সেই নিষেধ না মেনে বৃহস্পতিবার শরাফতকে না জানিয়ে সৌদি চলে যান ফাতেমা।

“এরপর থেকে শরাফত মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। নিষেধ করার পরও স্ত্রী প্রবাসে চলে যাওয়ায় বাড়ির সকলের ওপরও রাগ করেন তিনি।”

ঘটনার আগের দিন দুপুরে শরাফত তিন সন্তানকে বাজারে নিয়ে মিষ্টি খাওয়ান এবং নতুন জামাকাপড়ও কিনে দেন বলে দাবি মারফত আলীর।

তিনি বলেন, “বাজার থেকে একটি মোরগ কিনে বাড়ি ফেরেন তারা। রাতে নিজের হাতে রান্না করেন শরাফত। সেই রান্না করা ভাত তিন সন্তানকে খাওয়ান। এরপর পানি জাতীয় কিছুর সঙ্গে বিষ মিশিয়ে সন্তানদের পান করিয়ে নিজেও বিষপান করেন শরাফত।

“রাত ২টার দিকে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতর থেকে শিশুদের কান্নার শব্দ শুনতে পান। পরে ঘরের দরজা ভেঙে সবাইকে ছটফট করতে দেখা যায়। বড় ভাতিজিকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, ‘সবাইকে জোর করে শরবত খাওয়ানোর পর থেকে ব্যথা শুরু হয়।’ এরপর তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।”

মারফত আলী বলেন, শরাফত স্ত্রীর প্রায় ১২ লাখ টাকা জুয়া খেলে নষ্ট করেছে। সে মাদক সেবনও করতো। শুক্রবার রাতের ফ্লাইটে তার স্ত্রী সৌদি গেছে শ্রমিকের কাজ করতে। এ নিয়ে হয়তো রাতেই তার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে ঝগড়াঝাটি হয়েছে এবং পরে বিষপান করেছে।

শরাফতের ফুফু স্বরুফা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাত ২টার দিকে শরাফত তাকে ফোন দিয়ে বলেন, তাদের উপর দাবিদাওয়া না রাখতে। কারবালা ঘটিয়ে ফেলছেন। এটা শুনে তিনি শরাফতের ভাইদের ফোন দেন।

তিনি বলেন, “তখন তারা গিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে শরাফত ও তার শিশু সন্তানকে উদ্ধার করেন। তখন বড়ো মেয়ে মাওয়া তাদের বলে, ‘বাবা জুসের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে জোর করে আমাদের খাইয়েছে। এরপর থেকে ব্যথা করতেছে।’”

স্বরুফা বেগম বলেন, এরপর তিন সন্তান ও শরাফতকে নিয়ে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে রওয়ানা দেন স্বজনরা। মাহরাম নদীতে নৌকা না থাকায় বাদাঘাট বাজারে হাফিজ কমপ্লেক্সে একজন স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে যান। তিনি তাদেরকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেন।

তখন অনেক রাতে ঘাটে নৌকা না পেয়ে শরাফত ও তার শিশু সন্তানদের নিয়ে আবার বাড়িতে চলে আসেন স্বজনরা। সকালে তাহিরপুর উপজেলা হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক তিন শিশু সন্তানকে মৃত ঘোষণা করেন।

তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমদ বলেন, “ভোর ৪টার দিকে আমরা সংবাদ পাই, একজন বাবা ও তার তিন সন্তান বিষ পান করেছেন। আত্মীয়-স্বজনরা তাদের বাদাঘাটের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যান। চিকিৎসক তিন শিশুকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন কারা মারা গেছে।

“এ ছাড়া মুমূর্ষু অবস্থায় বাচ্চাদের বাবাকে উপজেলা হাসপাতাল থেকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ওয়াশ করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।”

তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। শরাফত মাদক ও অনলাইন জুয়ায় জড়িত। তার স্ত্রী বিদেশে ছিল। আগে তিনি অনেক টাকা-পয়সা পাঠিয়েছিলেন, যা খরচ করে ফেলেন শরাফত।”

এ ঘটনায় মামলা নিহতদের বাবার বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানান ওসি ফারুক আহমদ।