শামসুল ইসলাম :: অভিবাসনের ইতিহাস আসলে মানুষের টিকে থাকার ইতিহাস। উন্নত জীবন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনার খোঁজে মানুষ যুগে যুগে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশী বংশদ্ভূত অভিবাসীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশী অভিবাসীদের কাছে, ইউরোপ সবচেয়ে পছন্দের ও স্বপ্নের ঠিকানা হিসাবে স্থান পেয়েছে। মানুষের সহজাত এই অভিবাসন প্রবনতারই প্রকাশ ঘটে ইউরোপ থেকে ব্রিটেন বা ব্রিটেন থেকে ইউরোপ পাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে ব্রেক্সিট-পূর্ব সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের “ফ্রি মুভমেন্ট” সুবিধার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষ অবাধে যুক্তরাজ্যে এসে কাজ করেছেন, বসতি গড়েছেন, নাগরিকত্ব নিয়েছেন। একইভাবে বহু ব্রিটিশ নাগরিকও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থায়ী হয়েছেন।
এই অভিবাসনের প্রবাহে ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষও যুক্তরাজ্যে এসেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক সত্য হলো, এই মানুষদের সবচেয়ে বেশি বিরূপ দৃষ্টিতে দেখেছেন অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশিই। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি ও একই শেকড়ের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ থেকে আসা বাংলাদেশি অভিবাসীদের অনেকেই প্রকাশ্যে কিংবা নীরবে “দ্বিতীয় শ্রেণির” নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করেন। যেন তারা “আসল” ব্রিটিশ নন, বরং সুবিধাভোগী অনুপ্রবেশকারী।
বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন, “When the rich wage war, it is the poor who die.” অর্থাৎ ক্ষমতা ও আধিপত্যের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। অভিবাসী সমাজের ভেতরেও প্রায়শই একই বাস্তবতা দেখা যায়, মূলধারার বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে আমরা নিজেদের মধ্যেই বিভাজনের দেয়াল তুলি।
অথচ বাস্তবতা হলো, ব্রিটিশ সমাজে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা নিজেরাও দীর্ঘদিন ধরে বর্ণবাদ, শ্রেণিগত বৈষম্য ও সামাজিক প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। আজও যুক্তরাজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নিজের পরিচয় দিতে গেলে “ব্রিটিশ” বললেই যথেষ্ট হয় না; জাতিগত পরিচয়ের ঘরে স্পষ্ট করে লিখতে হয় “বাংলাদেশি”। পাঁচ প্রজন্ম ধরে ব্রিটেনে বসবাস করলেও পরিচয়ের এই ভিন্নতা মুছে যায় না। অর্থাৎ, যে সমাজে নিজেরাই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতার সংগ্রামে রয়েছেন, সেই সমাজেরই আরেক অংশ হয়ে তারা নিজেদের স্বজাতিকেই তাচ্ছিল্য করেন—এ এক অদ্ভুত আত্মবিরোধিতা।
সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়োর একটি ধারণা এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি “সামাজিক পুঁজি” (social capital) বলতে বোঝান—মানুষের পারস্পরিক আস্থা, সম্পর্ক ও সহযোগিতার শক্তিকে। যেসব জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা ও নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে, তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দ্রুত এগিয়ে যায়। বিপরীতে, যারা নিজেদের ভেতরেই বিভক্ত থাকে, তারা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরিসংখ্যানও এই মানসিকতার অসারতা স্পষ্ট করে। যুক্তরাজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী এসেছে পোল্যান্ড থেকে—প্রায় আট লাখ। এরপর রোমানিয়া, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি ও পর্তুগাল। সব মিলিয়ে ব্রেক্সিটের আগে ও পরে প্রায় ৪০ লাখ ইইউ নাগরিক যুক্তরাজ্যে বসবাস করতেন বা করছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইইউ নাগরিকের সংখ্যা আনুমানিক এক লাখেরও কম। অর্থাৎ, সামগ্রিক অভিবাসী বাস্তবতায় তারা সংখ্যাগতভাবে খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, সমস্যা যেন ওই ক্ষুদ্র অংশটিকেই ঘিরে। বাকি ৩৯ লাখ ইউরোপীয় অভিবাসীকে নিয়ে তেমন আপত্তি নেই; আপত্তি যত নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষদের নিয়ে। কেন?
সম্ভবত এর পেছনে কাজ করে এক ধরনের মানসিক অনিরাপত্তা। অনেক অভিবাসী যখন কষ্ট করে একটি সামাজিক অবস্থান তৈরি করেন, তখন পরবর্তীতে আসা একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেন। কেউ ভাবেন—“আমরা কষ্ট করে এসেছি, এরা সহজে সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।” কেউ আবার আশঙ্কা করেন—নতুনদের কারণে তাদের সামাজিক মর্যাদা বা অর্থনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই মানসিকতা কেবল বাংলাদেশিদের মধ্যে নয়, বিশ্বের বহু অভিবাসী সমাজেই দেখা যায়। তবে আমাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও প্রকট, কারণ আমরা প্রায়ই নিজেদের আত্মপরিচয় নির্মাণ করি অন্যকে ছোট করে।
নোবেলজয়ী লেখক টনি মরিসনের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে: “The function of racism is distraction.” অর্থাৎ বিভাজনের রাজনীতি মানুষের দৃষ্টি প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে সরিয়ে দেয়। অভিবাসী সমাজেও অনেক সময় এই বিভাজন আমাদের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ—শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নতি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কিংবা প্রজন্মগত অগ্রগতি—এসব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে বলা যায়, ব্রিটেনে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে কট্টর জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী যারা সাদা অরিজিন ছাড়া কাউকে ব্রিটিশ উত্তরাধিকার মনে করে না। মজার বিষয় এই কট্টরপন্থীদের প্রতিও অনেক বাংলাদেশী ব্রিটিশের সমর্থন দেখা যায়। এ যেন “নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করা।”
ফ্রান্সের উদাহরণও একই বাস্তবতার প্রতিফলন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়ায় ফ্রান্সে অভিবাসীদের জন্য কাজ ও বসবাসের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ কর্মসূত্রে সেখানে যান। কিন্তু সেখানেও দেখা যায়—যারা সরাসরি ফ্রান্সে স্থায়ী হয়েছেন, তাদের একটি অংশ ইউরোপের অন্য দেশ থেকে আসা বাংলাদেশিদের “কম মর্যাদার” হিসেবে দেখেন। যেন অভিবাসনেরও আবার স্তরভেদ আছে।
এ প্রশ্ন তাই অনিবার্য—আমরা বাঙালিরা এমন কেন?
কেন আমরা নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠি? কেন একই সংগ্রামের মানুষ হয়েও একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতার বদলে সন্দেহ, অবজ্ঞা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব পোষণ করি? কেন আমাদের আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে পারস্পরিক সহযোগিতার বদলে বিভাজনের ওপর?
সম্ভবত উত্তরটি নিহিত আছে আমাদের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস, সামাজিক শ্রেণিবিভাজন এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটে। আমরা এখনও ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে এমন এক মানসিক কাঠামো থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি, যেখানে নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে হলে অন্য কাউকে নিচে নামাতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।” বিদেশের মাটিতে এই কথাটির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ অভিবাসী জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিল পারস্পরিক সংহতি। ভাষা, সংস্কৃতি ও স্মৃতির বন্ধনই মানুষকে টিকিয়ে রাখে। সেখানে যদি একই শেকড়ের মানুষই একে অন্যকে অবজ্ঞা করে, তবে সেটি শুধু ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা নয়—একটি বৃহত্তর সামাজিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।
সময় এসেছে নিজেদের দিকে নতুন করে তাকানোর। কারণ একটি জাতির পরিপক্বতা বোঝা যায়, তারা নিজেদের দুর্বলতম মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে—সেটি দিয়ে।
লেখক: সম্পাদক, ফ্রান্স দর্পণ, লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক।



