রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ



                    চাইলে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন

বড়লেখায় বাঁশ পড়ে ভাঙল আশ্রয়নের ঘরের বারান্দা, মামলা হলো ভাঙচুর-চুরির! বিস্মিত এলাকাবাসী



বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক:: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ন প্রকল্পের একটি ঘরের দরজা, জানালা, টিনের চালাসহ আসবাবপত্র ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। গত ২০ ডিসেম্বর বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিম চৌধুরী বাদী হয়ে থানায় এই মামলাটি করেন। মামলায় দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. সাদিক, আব্দুল মালিক, মো. রেজা ও জাসমিন বেগমকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে ভাঙচুরের অভিযোগে দায়ের করা মামলার ঘটনায় বিষ্মিত এলাকাবাসী। তাদের দাবি, মামলার এজাহারে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা সঠিক নয়। মূলত আশ্রয়ন প্রকল্পের এই ঘরের নিম্নমানের কাজ ঢাকতে এই সাজানো মামলা করা হয়েছে বলে তারা পাল্টা অভিযোগ করেছেন। এলাকার লোকজন ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের মামদনগরের (মোহাম্মদনগর) প্রধানমন্ত্রীর উপহারের পাওয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের একটি ঘরে থাকেন পারভীন নেছা। ওই এলাকার বাসিন্দা মো. সাদিক ও তার পিতা আব্দুল মালিক আশ্রয়ন প্রকল্পে পারভীন নেছার পাশের ঘরের মালিকানা প্রাপ্ত বাসিন্দা। মো. রেজা ও জাসমিন বেগম তাদের আত্মীয়। গত ১৮ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৮টা থেকে ৯টার দিকে মো. সাদিক, আব্দুল মালিক, মো. রেজা ও জাসমিন বেগম দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পারভীন নেছাকে আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর ছেড়ে যেতে হুমকি দেন। একপর্যায়ে তারা পারভীন নেছার জন্য বরাদ্দ হওয়া বসতঘরে হামলা চালিয়ে দরজা, জানালা, টিনের চালাসহ আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। পাশাপাশি তারা (আসামিরা) বসতঘর সংলগ্ন চারা সবজিগাছ কেটে ৮০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন, ঘরের বাসনপত্র ও নগদ টাকা চুরি এবং ৫ হাজার টাকার বাঁশ ঝাড় কেটে নিয়েছেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে মামলার এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, উপকারভোগী পারভিন নেছার ঘরের বারান্দার তিনটি পিলার ভাঙা আছে। বারান্দার চালা মাটিতে পড়ে আছে। তবে দরজা, জানালা কিংবা দেওয়ালে ভাঙচুরের কোনো আলামত নেই। আঙিনার চারাগাছ সম্পূর্ণ অক্ষত।

এছাড়া মামামলার এজাহারে ঘটনার সময় উপকারভোগী পারভীন নেছা ঘরে উপস্থিতি থাকার কথা এবং ১ নম্বর স্বাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার (পারভীন নেছা) দাবি, ওই দিন তিনি বাড়িতে (আশ্রয়নে) ছিলেন না। তার ঘরের বারান্দা কিভাবে ভেঙেছে তাও তিনি জানেন না।

মুঠোফোনে আলাপকালে পারভীন নেছা বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। ঘর পেয়েছি। কারো সাথে ঝগড়া করেতে যাইনি। জায়গার যে মালিক ছিল তারা আমার পাশের ঘর পেয়েছে। তারা নানাভাবে হয়রানি করে। ভয় দেখায়। ঘর ছাড়তে হুমকি দেয়। যেদিন বারান্দা ভাঙছে ঐদিন আমি ওখানে (ঘটনাস্থলে) ছিলাম না। গাজিটেকায় ছিলাম। আমি পরের দিন গিয়া দেখছি বারান্দা ভাঙা। এসিল্যান্ড স্যার ও তহশিলদার মরির (মহুরি) দিয়া মামলা লেখাইছন। তারা মামলাত কিতা লেখছইন (লিখেছেন) আমি কইতাম পারতাম নায়।’

মামলার বাদী বড়লেখা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. ফজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি মামলা করেছি। এর থেকে বেশি কিছু মন্তব্য করতে পারব না।’ ঘটনার দিন উপকারভোগী পারভীন ঘরে ছিলেন না; অথচ তাকে এজাহারে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী করা হলো কিভাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এদিকে মামলার এজাহারে ঘটনার সময় রাত ৮টা থেকে ৯টা উল্লেখ থাকলেও স্থানীয় লোকজন দিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তারা বলছেন, ঘরের বারান্দাটি ভেঙে পড়েছে দিনের বেলা আনুমানিক বেলা ১টা থেকে ২টার মধ্যে। আর ঘরের বারান্দা ইচ্ছা করে কেউ ভাঙেনি। বাঁশ ঝাড় কাটার সময় অসাবধানতাবশত কয়েকটি বাঁশ বিদ্যুতের লাইনে টানপড়ে খেয়ে পিলার ভেঙে ঘরের বারান্দা পড়ে যায়।

আশ্রয়ন প্রকল্পের পাশের জামে মসজিদের ইমাম মো. আব্দুল মন্নান বলেন, ‘ঘরের বারান্দা যেদিন ভেঙে পড়েছে তখন আনুমানিক দুপুর দেড়টা হবে। আমি মসজিদের সামনে ছিলাম। লোকজন বাঁশ কাটছিল। কয়েকটি বাঁশ কারেন্টের লাইনে পড়ে ঘরের বারান্দায় টান খায়। এরপর বারান্দাটি পড়ে যায়। কেউ ইচ্ছা করে ভাঙেনি কিংবা কোনো মারামারির ঘটনায়ও ভাঙেনি।’

স্থানীয় পূর্ব মোহাম্মদনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল খালিক বলেন, ‘প্রশাসন যদি সঠিক ঘটনা দিয়া মামলা করতো আমাদের কোনো দুঃখ ছিল না। এমনিতেই ঘরের কাজ হয়েছে নিম্নমানের। ইতা পিলারো ঠিকমতো সিমেন্টও নাই। এ জন্য লাইনে বাঁশ পড়ে টান খেয়ে বারান্দা পড়ে গেছে। তারা (প্রশাসন) মামলা করেছে হামলা, ভাঙচুরের।’

মোহাম্মদনগর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আশ্রয়নের ঘরে বিদ্যুত দেওয়ার জন্য লাইন বারান্দার খুঁটির সাথে শক্ত করে বাধা ছিল। পল্লী বিদ্যুতের লোকজন বলেছে বাঁশগুলো না কাটলে ঝড়-তুফানে লাইনে পড়ে ঝামেলা হবে। তাই আব্দুল মালিক দৈনিক মজুরিতে লোক দিয়ে দিয়ে বাঁশ কাটতে লাগান। বাঁশ কাটার সময় কয়েকটি বাঁশ লাইনে পড়ে টান খেয়েই বারান্দা পড়েছে। এটাই হল শতভাগ সত্য ঘটনা। তবে প্রশাসন সাজিয়ে মামলা করেছে ভাঙচুর, চুরির। বারান্দা ভেঙেছে দিনের বেলা। এলাকার লোকজনও এসে দেখেছেন। তারা মামলা দিয়েছে রাতের। এই ঘরগুলোর কাজ খুবই খারাপ হয়েছে। মূলত প্রশাসন ঘরের খারাপ কাজকে আড়াল করতেই সাজানো মামলা দিয়েছে। মানুষকে হয়রানি করছে।’ একইরকম বক্তব্য গ্রামের নূরুল ইসলামসহ অনেকের।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মন্নান বলেন, ‘প্রকাশ্যে দুপুরবেলা পাশের বাঁশঝাড় কাটার সময় ১ থেকে ২টি বাঁশ কারেন্টের লাইনে পড়ে ঘরের পিলারে টান খেয়ে দুইটি পিলার সম্পুর্ণ ও একটি পিলার আংশিক ভেঙে পড়ে। এতে টিনের চালাসহ বারান্দা মাটিতে পড়ে যায়। আশপাশের লোকজন তা দেখেছেন। এখানে কেউ হামলা করে ভাঙেনি। মূলত নিম্নমানের কাজের কারণেই পিলারসহ বারান্দা মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে। তা ঢাকতেই প্রশাসন হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেছে।’

বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাহাঙ্গীর হোসেইন মুঠোফোনে বলেন, ‘উপকারভোগী পারভিন নেছা আমাদের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন পাশের ঘরের লোকজন তাকে ভয়ভীতি দেখায়। তাকে থাকতে দেয়না। বিভিন্ন ধরনের ঝামেলা করে। এই হিসেবে আমরা ধারণা করেছি এটা তারা করেছে (বারান্দা ভেঙেছে)। প্রথমে তারা (আসামিরা) বলেনি। পরে তারা ভাঙার কথা বলেছে এবং ঠিক করে দেবে বলে জানিয়েছে। এটা এখন আদালতের বিষয়।’

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়ারদৌস হাসান মঙ্গলবার বিকেলে বলেন, ‘শাহবাজপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল হককে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’