শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



শিয়াল সমাচার: যে বিকট আওয়াজ শুধু জন্তুরা শুনতে পারে, মানুষ নয়



বিজ্ঞাপন

তাইসির মাহমুদ:
রাত তখন তিনটা। ঘুমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। হঠাৎ স্ত্রীর ফিশফিশ শব্দে ঘুম ভাঙলো। তাঁর কণ্ঠে আতঙ্ক। দীর্ঘশ্বাস নিচ্ছেন। ফিশফিশ করে কানে কানে বললেন, নিচের তলায় সিটিংরুমে কে যেনো হাঁটাহাঁটি করছে।

বললাম ডাকাত? বললেন, জানিনা হতে পারে? আমিও দারুন ভয় পেলাম। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বিছানা ছেড়ে ওঠে বসলাম। কী করবো। নিচেরতলার দিকে কান পেত সিটিংরুমে হাঁটাহাটির মৃদু আওয়াজও শুনতে পেলাম। তাহলে তো ডাকাত? এর আগে কোনো দিন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। কোনো অভিজ্ঞতাও নেই। ভয়ে কাঁপছি, আর ভাবছি কী করবো।

স্ত্রী বললেন, পুলিশ কল করো । বললাম হ্যা, পুলিশ ডাকবো পুলিশ। তবে আগে নিশ্চিত হওয়া চাই, সত্যিই কি ঘরে ডাকাত ঢুকেছে। সাহস করে ছোট একটা লাঠি নিয়ে বেড রুম থেকে বেরুলাম। উপর থেকে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকালাম। কিছুই দেখা যায় না। তবে সিটিং রুমে হাঁটাহাটির শব্দ শুনা যাচ্ছে ।

তাহলে কারা হাঁটছে। ডাকাত হলে তো উপরে ওঠে এসে প্রথমে আমাদের হাত-পা বাধার কথা। নাহ, তাহলে ডাকাত নয়। বোধহয় ছিচকে চোর হবে । ধীরপায়ে সিটিংরুমের দিকে পা বাড়ালাম। লাঠিটি মাথার উপরে তুলে ধরে দুহাতে চেপে ধরে প্রস্তুত রাখলাম। চোর হোক, ডাকাত হোক- দেখামাত্রই মাথা ফাটিয়ে দেবো। ধীর পায়ে এগুচ্ছি। উপরতলা থেকে একপা, দুপা করে সিড়িবেয়ে নিচে নামছি। সারা শরীর ভয়ে ঘেমে গেছে। এগিয়ে যাচ্ছি। সিটিং রুমে ঢুকতেই দেখলাম কে বা কারা গার্ডেনের দরজা দিয়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে যাচ্ছে । আমিও পিছু দৌড় দিলাম। তাহলে নিশ্চয় চোর হবে, ডাকাত নয়। ডাকাত হলে দৌঁড় দিতো না। কিন্তু নাহ, গার্ডেনে বেরিয়ে দেখলাম দুইটা শিয়াল দেয়াল টপকে পালিয়ে যাচ্ছে।

যাক, আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। চোর নয়, ডাকাতও নয়- শিয়াল । কিন্তু কীভাবে শিয়াল ঘরে ঢুকলো? বুঝতে পারলাম ভুলটি আমারই। ঘুমাতে যাওয়ার আগে সিটিংরুমের দরজা খুলে গার্ডেনে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দরজা বন্ধ করতে ভুলে যাই। বেডরুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। তাই শিয়ালদুটো দেখা করতে সিটিং রুমে এসেছিলো।

ডেগেনহ্যামে নতুন ঘরে আসার পর থেকে শিয়ালের উৎপাতে অতিষ্ঠ। চারদিকে ইটপাথরের সীমানা প্রাচীর আছে। এরপরও দিনে-দুপুরে দেয়াল টপকে শিয়ালরা গার্ডেনে ঢুকেপড়ে। আর রাতের বেলা তো শিয়ালের রাজত্বই বলা চলে । নিচতলার লাইট অফ করে শোবার ঘরে ঢোকামাত্র পাশের ঝোপঝাড় থেকে দেয়াল টপকিয়ে গার্ডেনে ঢুকে পড়ে শিয়ালরা । গার্ডেন সোফায় বসে পরামর্শসভা করে একাধিক শিয়াল। বাচ্চাদের ট্রাম্পালিনে ওঠে শিয়ালরাও রাতে লাফালাফি করে। সকালে ঘুম থেকে ওঠে সোফা এবং ট্রাম্পালিনে শিয়ালের পদচিহ্ন পাওয়া যায়। কী করবো? কীভাবে শিয়াল তাড়াবো, উপায় খুঁজছিলাম।

হঠাৎ একদিন বেড়াতে এলেন ডেগেনহ্যামের নতুন প্রতিবেশী মুজিব ভাই (যুক্তরাজ্য জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট, স্কুল শিক্ষক মোঃ মুজিবুর রহমান)। ভাবলাম, যেহেতু একই এলাকার বাসিন্দা তাই তাঁর ঘরেও নিশ্চয় শিয়ালের উপদ্রব আছে । জানতে চাইলাম শিয়াল তাড়ানোর উপায় কী। বললেন, বছরদিন আগে যখন তিনি ডেগেনহ্যামে মুভ করেন তাঁর অবস্থাও ছিলো এমনই। শিয়ালের যন্ত্রনায় অতীষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। শেষে শিয়াল তাড়ানোর মেশিন এনেছেন। মেশিনটির নাম ফক্স রেপেলেন্ট ।

স্ত্রী ফক্স রেপেলেন্ট’র কথা শুনে আর মোটেও দেরি করলেন না। গুগলে খোঁজে আমাজানে দুইটি ফক্স রেপেলেন্ট মেশিন অর্ডার করলেন। দাম ডেলিভারীসহ চব্বিশ পাউন্ড নাইনটি নাইন পেন্স । দুইদিনের মাথায় স্পেশাল ডেলিভারীতে ঘরে পৌছলো। ব্যাটারি লাগিয়ে সন্ধ্যা রাতে গার্ডেনে পুতে রাখলাম বিশেষ মেশিনটি।

বেশ কৌতুহল। দেখতে চাই মেশিনটি কীভাবে শিয়াল তাড়ায়? রাতে সিটিংরুমের লাইট অফ করে গার্ডেনের গ্লাসের দরজা দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। দেখলাম দুটো শিয়াল দেয়াল টপকিয়ে ভেতরে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু কী এক অজানা শক্তি তাদেরকে ভেতরে ঢুকতে বাঁধা দিচ্ছে । প্রবল শক্তি খাটিয়েও ভেতরে ঢুকতে পারছেনা। একটু এগিয়ে আসে, পরক্ষণে পেছন ফিরে দৌড়ে পালায়। এভাবে করতে করতে শিয়াল দুটো একসময় নিখোঁজ হয়ে গেলো।

মেশিনে কোনো সাড়াশব্দ নেই। গার্ডের একপ্রান্তে পুতে রাখা। অপরপ্রান্তে শিয়াল ঢোকার চেষ্টা করছে । কিন্তু সে ঢুকতে পারছেনা। কেন পারছেনা। কেন সে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে? মেশিনটির কী এমন শক্তি। মেশিনের ইন্সট্রাকশন পেপার পড়ে জানতে কৌতুহলী হয়ে ওঠলাম । তারপর যা জানলাম তা আশ্চর্য হওয়ার মতো।

কোনো জন্তু যখন মেশিনটির আশেপাশে আশে তখন মেশিন একধরনের বিকট শব্দ করে । এতো বিকট ও তীব্র আওয়াজ যে, কোনো পশু পাখি জন্তু সেখানে স্থির থাকতে পারে না। ভয়ে দৌঁড়ে পালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমরা (মানুষ) কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পাই না। মেশিনটির বিকট আওয়াজ শুধু জন্তুরাই শুনতে পারে।

ফক্স রেপেলেন্ট’র ভুমিকা দেখে কবরের শাস্তি সম্পর্কে একটি কথা মনে পড়লো। মানুষের মৃত্যুর পর কবরে শাস্তি হলে তা নাকি পশু পাখি, জন্তু জানোয়ারই শুধু শুনতে পায়। কোনো মানুষ শুনতে পায় না।

এতোদিন এই চির সত্যটি বিশ্বাস করে আসছিলাম ধর্মগ্রন্থ পড়ে। এখন বাস্তবে দেখলাম। মানুষ এমন একটি যন্ত্র আবিস্কার করেছে, যার আওয়াজ শুধু জন্তুরা শুনতে পারে, মানুষ নয়।

তাইসির মাহমুদ
ডেগেন্হ্যান, লন্ডন
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮