শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



বড়লেখায় বরুদল নদীর ভাঙন: নদীতে বিলীন হচ্ছে রাস্তা, হুমকিতে ১৩০ বসতভিটা



বিজ্ঞাপন

তপন কুমার দাস:
‘অনেক বছর ধরি নদী ভাঙতেউ (ভাঙতে) আছে। কোনো কাজ অর (হচ্ছে) না। বারিসাত (বর্ষায়) অন্যর বাড়িত গিয়া পুয়া-পুরি লইয়া (ছেলেমেয়ে নিয়ে) থাকা লাগে। ঘরর ভিতর দিয়া পানি যায়। ঘরর মাঝে থাকতে ভয় লাগে। আমরার কষ্ট দেখার কেউ নাই।’ কথাগুলো কমলা বেগমের। তিনি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ১ নম্বর বর্ণি ইউনিয়নের মুদৎপুর গ্রামের বাসিন্দা। এই ইউনিয়নের বরুদল নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে তাঁর ঘরবাড়ি।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বর্ণি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বরুদল নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ইউনিয়নের মনাদী-মনারাই পাকা রাস্তা। এ রাস্তা দিয়ে ইউনিয়নের ২নম্বর ওয়ার্ডের মনাদী, মনারাই, রংপুর, পাকশাইল ও পূর্ব মনারাইসহ অন্তত দশটি গ্রামের কয়েক হাজার লোক চলাচল করেন। গেল বর্ষায় মনাদী-মনারাই পাকা রাস্তার মনাদি গ্রামে প্রবেশ মুখের অন্তত দেড়শ মিটার নদীতে ভেঙে পড়েছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। জরুরী সময়ে বড় যানবাহন গ্রামে ঢুকতে পারে না। নদীর ভাঙনের ফলে বর্তমানে হুমকিতে রয়েছে আশপাশের অন্তত ৫০টি বসতভিটা।

অপরদিকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মুদৎপুর, মিহারি-ফকিরবাজার সংযোগ রাস্তায়ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছেন। অব্যাহত ভাঙনের ফলে ৪নং ওয়ার্ডের মুদৎপুর ও ৮নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব শিলকুরা গ্রামের নদী পাড়ের প্রায় ৮০টি বসত ভিটা এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। পানি বৃদ্ধি পেলে এসব বসত ভিটে নদীতে বিলীন হবে বলে স্থানীয়দের আশংকা। গত দেড় দশকে নদী ভাঙনে বসত ভিটা হারিয়ে অন্তত ৫০ পরিবার অন্যত্র বাড়ি করেছেন। নদীতে বিলীন হয়েছে মসজিদ, কবরস্থান।

ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় দীর্ঘদিন থেকে এ অবস্থা চলছে। বর্ষাকালে নদীর ভাঙনে রাস্তা বিলীন হওয়াসহ বসতবাড়ি ও আবাদি জমি হুমকির মুখে রয়েছে। ফলে গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ তৈরি হয়েছে সব হারানোর ভয়। আনুমানিক দুই যুগ থেকে বরুদল নদীতে ভাঙন দেখা দেয়। নদী বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার পূর্বে ছিল।

সরেজমিনে মনাদি, মনরাই, মুদৎপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বর্ষায় নদীর ভাঙনে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। রাস্তা ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু বসত বাড়ির উঠান ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে ঘরও চলে যেতে পারে নদীতে। এ বছর কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে কাজ করা হয়েছিল। কিন্তু এ কাজে উপকারে চেয়ে ক্ষতি হয়েছে আরো বেশি। নতুন করে ভূমি ভেঙেছে।

মনাদী গ্রামের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কতবার বর্ষাত নদী ভাঙিয়া জায়গা নিছে। আবার ভাঙলে যাইবার আর জায়গা নাই। রাস্তাটায় কাম অইলে (কাজ হলে) আর নদীতে গার্ড ওয়াল দিয়া ঠিক করি দিলে হয়তো বাকিটা রক্ষা পাইবো।’

স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, ‘যেভাবে ভাঙন চলছে। দ্রুত রোধ করা না হলে গ্রামের আরও অনেক বাড়িঘর নদীর গর্ভে চলে যাবে। রাস্তা ভাঙায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা খুব কষ্টে আছেন। দীর্ঘদিন থেকে ভাঙলেও কেউ এদিকে নজর দেয় না। মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে আছে।’

মনাদি গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন ও ময়নুল হক বলেন, ‘রাস্তা ভেঙে নদীতে পড়েছে। এখন গ্রামে গাড়ি যেতে পারে না। আত্মীয়-স্বজন আসলে পায়ে হেঁটে বাড়িতে যান। বিশেষ করে রোগীদের কষ্ট। জরুরি সময়ে অ্যাম্বুলেন্স গ্রামে ঢুকে না। আমরা কি পরিমাণ কষ্ট করছি এটা বুঝানো যাবে না। প্রায় ৩০ বছর থেকে ভাঙছে। আর আমরা পশ্চিম দিকে সরছি। আর ভাঙলে যাওয়ার জায়গা নেই আমাদের। এই দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি হবে আমাদের জানি না।’

জালাল উদ্দিন নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা নৌকার ভোটার। ভোটের সময় আইলে নেতারা আইয়া বড় বড় কথা আর আশ্বাস দেইন। কিন্তু কাজের বেলা কিছু নাই। দেওয়ালে পিঠ ঠেকছে ভাই। এবার যদি ভাঙন রোধে কোনো কাজ করা না হয়। ভোটের বাক্স খালি যাইব।’ একই বক্তব্য গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালিক, লাল উদ্দিনেরও।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জুবের হোসেন বলেন, ‘নদীপাড়ের রাস্তাটি অর্ধ কিলোমিটার পূর্বে ছিল। ভাঙনের ফলে পশ্চিম দিকে সরেছে অনেক বছর হয়। অনেক পরিবার ভাঙনের ফলে জায়গা ছেড়েছে। বিভিন্নভাবে মানুষ ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে। মনাদি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র ও মৎস্যজীবী। বাড়ি ঘর আর ভাঙলে মেরামত করার সামর্থ তাদের নাই। দ্রুত এ ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে বর্ণি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘ভাঙনের ফলে রাস্তার অবস্থা বেহাল। বাড়ি ঘর ঝুঁকিতে আছে। দুই যুগ থেকে ৩টি ওয়ার্ডে ভাঙছে। আর মানুষ অন্যত্র ঘরবাড়ি করছে। এখন যে অবস্থায় আছে। আর ভাঙলে মানুষের যাওয়ার জায়গা থাকবে না। স্থায়ীভাবে এটার সমাধান করা দরকার। নাদীপাড়ের আশপাশের অন্তত ১৫০ পরিবার ভাঙনের মুখে আছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ শাহাব উদ্দিন মহোদয় সরেজমিনে অবস্থা দেখে গেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন দেখে গেছেন। দ্রুত ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘এ বছর দুই জায়গায় কিছু কাজ হয়েছিল। ভাঙনের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে অবহিত হয়েছি। ভাঙন রোধের জন্য বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। শ্রীঘ্রই সরেজমিনে ভাঙনস্থল পরিদর্শন করা হবে। স্থায়ীভাবে কাজ করতে হলে বড় বাজেটের প্রয়োজন। এতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। নতুন করে যাতে না ভাঙে সে জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রাক্কলন প্রস্তুত করে বাজেট চাহিদা বোর্ডে প্রেরণ করা হবে। বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।