শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



ঈদের ছুটিতে পর্যটকে মুখরিত মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলো
বিশেষ প্রতিনিধি

বিশেষ প্রতিনিধি



বিজ্ঞাপন

ঈদের টানা ছুটিতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলো। দেশের অন্যতম বৃহৎ জলপ্রপাত মাধবকুণ্ড, বর্ষিজুরা ইকোপার্ক, টিলাঘেরা সবুজ চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জি, ডবলছড়া খাসিয়াপুঞ্জি, শিল্পকলা সমৃদ্ধ মণিপুরীসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জীবনধারা ও সংস্কৃতিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই জনপদ পর্যটকদের মন ও দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে এসব আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে।

বনবিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদের প্রথম দিন বুধবার থেকে তৃতীয় দিন শুক্রবার বিকেলে ৩টা পর্যন্ত জেলার বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটেছে। প্রতিদিন আশপাশের উপজেলার মানুষ ছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলা এবং বিদেশি পর্যটকরা ভিড় করছেন এখানে। এতে বেচাকেনা ভালো হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটে ওঠেছে।

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, দূর-দূরান্ত থেকে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবসহ নানা বয়সী মানুষ বাস, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় যানবাহনে করে মাধবকুণ্ডে বেড়াতে আসছেন।

সবচেয়ে বেশি পর্যটক দেখা গেছে কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর লেক আর লাউয়াছড়ায়। এদের মধ্যে সপরিবারে ঘুরতে আসা সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ঈদের ছুটিতে যেন মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় প্রকৃতির সৌন্দর্যের অপারলীলা নিকেতন লাউয়াছড়া উদ্যান আর পদ্মকন্যার মাধবপুর লেক।

উদ্যানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সামাল দিতে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি পর্যটন পুলিশ সদস্যদের হিমশিম খেতে দেখা যায়।

লাউয়াছড়া উদ্যানের ট্যুরিস্ট গাইড সাজু মারচিয়ান জানান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য দেখতে ঈদের পরের দিন বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার লোকজনের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি।

লাউয়াছড়ায় বেড়াতে আসা টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, ছুটিতে প্রকৃতি দেখতে যেতে আমার সবসময় ভালো লাগে তাই এবার পরিবার নিয়ে আসলাম।

হাম হাম থেকে ঘুরে আসা চাকরীজীবী দম্পতি ফারহানা ও সুজন চৌধুরী জানালেন, এত সুন্দর একটি ঝর্ণা কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা এত খারাপ যা বোঝানো সম্ভন নয়।

উপজেলার মনোরম মাধবপুর লেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটকদের ঢল নেমেছিল। পাহাড়ি টিলার উপর সবুজ চা-বাগানের সমারোহ, জাতীয় ফুল দুর্লভ বেগুনী শাপলার আধিপত্য, ঝলমল স্বচ্ছপানি, ছায়া নিবিড় পরিবেশ, শাপলা-শালুকের উপস্থিতি আনন্দের বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে। মাধবপুর চা-বাগানে অবস্থিত মাধবপুর লেকে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

লেকের চারপাশে বিশাল টিলায় সারিবদ্ধ ছোট-বড় গাছ আর সবুজ টিলার মাঝখানে জলরাশি। টলটলে রূপালী জলের সঙ্গে দিবা-নিশির মিতালি করছে নীল পদ্মফুল। জলের আলো ছায়ার নীল পদ্মের লুকোচুরি খেলা মনমুগ্ধ করে আগত পর্যটকদের। এই মনোরম সৌন্দর্য দর্শনে ঈদের ছুটিতে প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসেন মাধবপুর লেকে। নয়নাভিরাম এ জলারণ্য দল বেঁধে দেখতে গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন বেশি ঘটে বলে জানান লেকের প্রধান ফটকে দায়িত্বে থাকা বাবুল সরকার।

অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রসমূহে দর্শনার্থীর চেয়ে লাউয়াছড়া মিশ্র চিরহরিৎ এই বনে অত্যধিক পর্যটকের উপস্থিতি ঘটেছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই ঈদের অধিকতর পর্যটকের উপস্থিতি ঘটেছে বলে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ দাবি করেছে।

ঈদের দিন বুধবার থেকে শুরু হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক পর্যটক লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বন ও প্রাণিকূল দেখতে ভিড় করেন। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে এখানকার বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকসহ গাছে গাছে লাফালাফিরত বানর, হনুমানের দৃশ্যাবলি উপভোগ করতে পর্যটকরা বেশি আগ্রহ বোধ করেন।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় সহকারী বন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, এ ঈদের অন্যান্য সময়ের তুলনায় পর্যটকের সমাগম অধিক ঘটেছে। তবে ঈদে পর্যটকদের উপস্থিতি সব সময়েই বেশি হয়ে থাকে।

অত্যধিক পর্যটকের কারণে কিছুটা বিঘ্ন হওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, লাউয়াছড়ায় তিনটি ট্রেন রয়েছে। দর্শনার্থীরা এই ট্রেন ঘুরেই চলে যান। এখানে গাইডরাও রয়েছে, এদের বলে দেয়া হয়েছে যাতে পর্যটকরা এর বাইরে ও কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যাতে বন ও পরিবেশের ক্ষতি না করতে পারেন সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে। পর্যটকদের জন্য নিয়ন্ত্রিত ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

জেলা পুলিশ সুপার শাহ জালাল জানিয়েছেন, পর্যটকদের আগমন উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি হোটেল মোটেলের সাথে যোগাযোগ রাখছে পুলিশ।