মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক যেন এক মৃত্যু কুপ, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল



বিজ্ঞাপন

জাহিদ উদ্দিন:
পূর্ব সিলেটের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সিলেট-জকিগঞ্জ রোড। এই সড়কটি যাত্রীদের কাছে মুত্যু কুপে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি যানবাহন যেন সর্বোচ্চ গতিতে ধেয়ে আসা মৃত্যুদূত। চোখের পলকে ঘটে যায় দুর্ঘটনা ও মুত্যু। যে কারণে এই রোডে সড়ক দুর্ঘটনায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এ মিছিলে শামিল হচ্ছে সব শ্রেণী পেশা, বয়সের মানুষ। অকালে ঝরে পড়ছে তাজা প্রাণ। স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারি হচ্ছে বাতাস। পঙ্গুত্বের অভিশাপ তো আছেই। পরিবারের নেমে আসে আর্থিক কষ্টও। আইনের যথেষ্ট প্রয়োগ না থাকা এবং অসচেতনতা ও অদক্ষ চালকের কারণেই গোলাপগঞ্জ তথা সিলেট জকিগঞ্জ রোড এতো ভয়ংকর। একটি দুর্ঘটনার রক্তের দাগ শুকানোর আগেই আরেকটি প্রাণের বিনিময়ে রক্তে লাল হয় সিলেট-জকিগঞ্জ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট জকিগঞ্জ রোডের মূলত গোলাপগঞ্জ উপজেলার পাঁচমাইল এলাকা থেকে রানাপিং বাজার পর্যন্ত কোনো না কোনো এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি। গোলাপগঞ্জ উপজেলার এ এলাকার ভিতরে এ বছরের প্রথম থেকেই বেশ কয়েকটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে যার ক্ষত এখনো মুছে যায়নি। এ বছরের শুরুর দিকে কোন দুর্ঘটনা এ রোডে না হলেও বছরের তৃতীয় মাসের শেষের দিকে দুর্ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিলেটে থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী বাসটি বিয়ানীবাজারের বারইগ্রাম আসার পথে গোলাপগঞ্জ উপজেলার দাঁড়িপাতন এলাকার পৌঁছালে আরেকটি যাত্রীবাহী বাসকে (ড্রাইভার মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে) ওভারটেকিং করতে গিয়ে সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে উল্টে যায়। এ সময় বাসে থাকা যাত্রীরা বাসের নিচে চাপা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্থানীয়দের সহায়তায় সব যাত্রীদের উদ্ধার করলেও বাসে থাকা হেল্পার নিহত হন। এ ঘটনায় প্রায় ৪০ জন যাত্রী আহত হন।

এদিকে গত ২৯ এপ্রিল রোববার সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের হেতিমগঞ্জ নাশাগঞ্জ নামক স্থানে যাত্রীবাহী বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে আব্দুল ওদুদ নামে এক যুবক নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫ জন। নিহত আব্দুল ওদুদ গোলাপগঞ্জের রানাপিং এলাকার বাসিন্দা।

গত ১৯ মে শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আবারো সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক রক্তে লাল হয়। উপজেলার এ সড়কের হেতিমগঞ্জ কায়স্থগ্রাম নয়া মসজিদের প্রাইভেটকার ও সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষের ঘটনায় ঘটনাস্থলেই পথচারী এমি বেগম (২০) নামের এক তরুণী নিহত ও শিশুসহ আরো ৩ জন পথচারী গুরুতর আহত হন। নিহত এমি বেগম উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের লরিফর নওয়াগাও গ্রামের জুরু মিয়ার মেয়ে। আহতরা হলেন- একই এলাকার আতাউর রহমানের মেয়ে জেনি আক্তার (২৪) ও সুমাইয়া আক্তার (৬), তুরন মিয়ার পুত্র তাউহিদ আহমদ (৫)।

সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট বুধবার সকাল সাড়ে ১০ টায় সিলেট থেকে আসা একটি ট্রাক সকাল ১০টা দিকে গোলাপগঞ্জের সিলেট-জকিগঞ্জ রোডের হেতিমগঞ্জ মোল্লাগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি সিএনজির সাথে সংঘর্ষ হয় এতে সিএনজি চালক সুরুজ আলী (৪০) ও তার বড় ভাই তরমুজ আলী (৪৫) হাসপাতালে নেওয়ার পথে নিহত হন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান। পরে ৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে সিলেটের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এসব দুর্ঘটনা গাড়ি চালকদের অবহেলা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোকে দায়ী করেছেন উপজেলার সচেতন মহল।

এছাড়াও তারা গাড়ির অতি গতি, গাড়ি চালানোর লাইসেন্স না থাকা, চালকের দক্ষতার অভাব, সড়কের বেহাল অবস্থা, গাড়ির ফিটনেস না থাকা এসব কারণেই সড়কে প্রতিনিয়ত প্রাণহানী ঘটছে বলে দাবি করেন।

এ ব্যাপারে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর গোলাপগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি ইলিয়াছ বিন রিয়াছত জানান, সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক বিশেষ করে গোলাপগঞ্জের সীমানায় বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনা অদক্ষ চালক ও তাদের বেপরোয়া মনোভাব ও চালকদের প্রতিযোগিতার কারণে ঘটছে। এ ছাড়াও বাইপাস থেকে গোলাপগঞ্জ বাজার পর্যন্ত ডিবাইডার না থাকাও দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। তিনি বাইপাস থেকে গোলাপগঞ্জ বাজার পর্যন্ত ডিবাইডার নির্মাণের জন্যও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম ফজলুল হক শিবলি জানান, প্রাশাসনের পক্ষে থেকে উপজেলার ভিতরে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক সহ বেশ কয়েকটি স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে গাড়ির চালকদের লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস ও গাড়ির কাগজ পত্র যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। যাদের লাইসেন্স বা গাড়ির কাগজ পত্র নেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।