লাতু ডেস্ক:: ঘরে কয়েকটি রুম। এর মধ্যে কর্নারের কক্ষে রক্তমাখা লাশ পড়েছিল সিলেটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারের। পাশের ঘরে উপুর করে রাখা স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের মরদেহ। কাজের মেয়ে তাহমিনার মরদেহ পাশে। তিন লাশই রক্তমাখা। গলাকাটা। শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। যারাই লাশ দেখেছেন আঁতকে উঠেছেন। আলোচিত এই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায়। বাসার মালিক আব্দুস সাত্তার। সিলেটের এক সময়ের পরিচিত ব্যবসায়ী। কয়লা ব্যবসা করতেন। আরও অনেক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। বয়স ৮৫ বছর। এখন অনেকটা ঘরবন্দি। মসজিদে যাতায়াত ছাড়া আর কোনো কাজ নেই তার।
স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে নিয়ে বসবাস করতেন নিজ বাসার দু’তলায়। ঘরে থাকতো নগরের জল্লারপাড়ের কাজের মেয়ে তাহমিনা। বুধবার সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে নৃশংসভাবে তারা বাসায় খুন হন। বাসার নিচ তলায় কাজ করছে রং মিস্ত্রিরা। সকালে এসে তারা কাজে লাগে। সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত তারা আব্দুস সাত্তার সহ পরিবারের তিন সদস্য বাসাতে সুস্থ ছিলেন। ১০টার একটু পর কাজে মিস্ত্রি যায় তার ফ্ল্যাটে। গিয়ে দেখে দরোজার ভেতর থেকে রক্ত আসছে। দেখেই তিনি চিৎকার করেন। আশপাশে লোকজন ছুটে আসেন। তারাও দেখেন রক্ত। বাসার ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ আসছিল না। পুলিশকে খবর দেয়া হয়। পাশে থাকা আত্মীয়স্বজনরাও ছুটে আসেন। পুলিশ আসার আগেই তারা দরোজার সিটকিনি ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে রক্তমাখা লাশ। এরই মধ্যে পুলিশ ছুটে যায় সেখানে। আশপাশের শত শত মানুষ ছুটে আসেন। সংবাদ ওয়েবিনার
নিহতের ভাগিনা মুন্না আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তার মামা আব্দুস সাত্তার একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। তিনি স্ত্রী সহ ওই বাসাতে থাকেন। সঙ্গে থাকে কাজের মেয়ে তাহমিনা। প্রতিবেশীরা সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত তাদের সাড়া-শব্দ পেয়েছেন। সকাল ৯টার পর তারা বাসার ভেতরে সুর চিৎকার শুনেছিল। কিছুক্ষণ পর চিৎকার থেমে যাওয়ায় কেউ আর ওদিকে কান দেননি। পরে দরোজার ভেতর থেকে রক্ত বের হতে দেখলে বিষয়টি জানাজানি হয়। তিনি বলেন- তার মামার সঙ্গে কারও তেমন বিরোধ নেই। তিনি শান্তশিষ্টভাবে এলাকায় বসবাস করেন। তার দুই সন্তান আমেরিকা ও দুই সন্তান লন্ডনে বসবাস করেন। এদিকে ঘটনার পর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে- একটি ঘরের মেঝেতে বৃদ্ধ সাত্তারের লাশ পড়ে আছে। পরনে লুঙ্গি ও হাফ গেঞ্জি। গালে ও পেঠে কুপানোর চিহ্ন। গলাকাটা। রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাশের পাশে। পাশের ঘরেই পড়েছিল স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের লাশ। গোটা ঘরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল রক্ত। তরতাজা রক্ত মেঝেতে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম। তার আগেই সেখানে সিআইডি’র ক্রাইম সিন ও পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা যান। গোটা ঘর পরিদর্শন করে পুলিশ কমিশনার বলেন, তিনজনকেই গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। শরীরের বিভিন্নস্থানে আরও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। দু’টি কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করেন তিনি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ডাকাতি। কারণ ঘরের আলমিরা, ওয়্যারড্রব খোলা ছিল। জিনিসপত্র তছনছ করা। ডাকাতরা মূল্যমান জিনিসপত্র নিয়ে যেতে পারে। অন্যটি হচ্ছে পূর্ব শত্রুতা। এর মধ্যে জমি সংক্রান্ত বিরোধ থাকতে পারে। দলিলাদি নিতে কোনো পক্ষ ঘটনা ঘটাতে পারে। দু’টি কারণকে সামনে রেখে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান চালানো হবে। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনাকালীন সময়ে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। সিসিটিভি রয়েছে। তবে লাইন কাটা। তারা বাসা, রাস্তা ও এলাকার অন্যান্য বাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। মিতালী সংঘের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক নাজু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- আব্দুল সাত্তার খুবই সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। তার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না।
তিনি মসজিদে গিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। কারও সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি তাদের জানা নেই। তবে মাসখানেক আগে এক ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বিরোধ ছিল। পরবর্তীতে এলাকার মানুষ বসে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। ঘটনার পর সেখানে যান পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক। তিনি ধারণা করেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এ ঘটনাটি ঘটতে পারে। এদিকে দুপুরে ওই বাসা পরিদর্শন করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তারা ঘটনার নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করেন পুলিশ দ্রুতই খুনিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবে। এমন ঘটনা নৃশংস ও অমানবিক বলে জানান তারা।
এদিকে নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যবসায়ী ছিলেন। তার মূল বাড়ি বিয়ানীবাজারের আকাখাজনা গ্রামে। বর্তমানে তার লন্ডন প্রবাসী এক মেয়ে দেশে রয়েছেন। তিনি সন্তানদের নিয়ে বিয়ানীবাজার গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। ঘটনার খবর শোনার পর তিনি দুপুরে সেখানে আসেন। স্বজনরা জানিয়েছেন, যে বাসায় আব্দুস সাত্তার খুন হয়েছেন ওই বাসা তার নিজের। পাশের বহুতল ভবনটিও তার। একটি ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করেন। আর বাকি সব ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া থাকেন। নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার পুরনো বাসিন্দা তিনি। প্রায় ৫০ বছর আগে তিনি প্রথম ওই এলাকায় বসতি গেড়েছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে ওই এলাকায় মানুষের বসবাস শুরু হয়।সংবাদ ওয়েবিনার
বর্তমানে আধুনিক মডেলের একটি এলাকা হচ্ছে মিতালী। নিকট অতীতে ওই এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। নিহত আব্দুস সাত্তারের স্বজন তাওহীদ হোসেন জানিয়েছেন, আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে একপক্ষের জমি সংক্রান্ত মামলা চলছে। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ১৯ আগস্ট হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই তাকে খুন করা হয়েছে। ওই মামলা সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার বলে জানান তিনি।






