রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ



                    চাইলে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন

কাঁদছে সিলেট



বিজ্ঞাপন

লাতু ডেস্ক:: তখনো ঘুমে সিলেটের মানুষ। নাজিরবাজারের সেই ‘ডেডস্পট’ কুতুবপুরে সড়ক দুর্ঘটনা। এর আগেও এখানে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সকালের দুর্ঘটনার খবরে বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা। একেক করে ওই স্পটে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন ১৪ জন নির্মাণ শ্রমিক। এমন ঘটনায় কাঁদছে সিলেট। শোকাহত মানুষ।

মহাসড়কে একসঙ্গে এত লাশ সাম্প্রতিককালে দেখেননি সিলেটের মানুষ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচলে বেড়েছে আতঙ্কও। মারা যাওয়া সব নির্মাণ শ্রমিকের বেশির ভাগেরই বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায়।

তারা নগরের আম্বরখানা লোহারপাড়া এলাকার বিভিন্ন কলোনির বাসিন্দা। ওখানকার ভোটারও। দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া সায়েদ নূরের ভাই শের আলীও ছিলেন ওই পিকআপে। ছোট্ট একটি পিকআপ। সেটি মালামাল পরিবহন করার কথা। কিন্তু গাদাগাদি করে ৩০ জন নির্মাণ শ্রমিককে নিয়ে যাচ্ছিলো সিলেট নগর থেকে ওসমানীনগরে গোয়ালাবাজারে। সেখানে একটি বিল্ডিংয়ের ঢালাইয়ের কাজে তাদের কামলা খাটুনির কথা ছিল।

শের আলী জানিয়েছেন- আম্বরখানা পয়েন্ট হচ্ছে তাদের শ্রম বিক্রির বাজার। প্রতিদিন ফজরের আজানের পর কয়েকশ’ শ্রমিক বেলচা, টুকরি নিয়ে এসে হাজির হন। ওখান থেকে বিভিন্নস্থানে গিয়ে দিনভর শ্রম বিক্রি করেন এসব অভাবী শ্রমিক।

গত ০৭ জুন ভোরে তেমনি করে লোহারপাড়া কলোনি থেকে বের হয়ে আম্বরখানা পয়েন্টে আসেন তারা। এক ঠিকাদারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর তাদের ছোট্ট একটি পিকআপ ভ্যানে করে গোয়ালাবাজারের পথে রওয়ানা দেন। ৩০ জন শ্রমিক নিয়ে ওই পিকআপ ভ্যানটি রওয়ানা হয়। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যায় নাজিরবাজারের কাছাকাছি এলাকায়। এমন সময় একটি আলুবাহী ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় তিনি বসা ছিলেন পিকআপের সামনের সিটে।

সংঘর্ষের পর চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ। বাঁচাও-বাঁচাও আর্তনাদ। তিনি পিকআপের সামনে গ্লাসের ভাঙা অংশ দিয়ে কোনো মতে বাইরে আসেন। এসে চোখের সামনেই দেখেন কেয়ামত চলছে। সহকর্মীদের রক্তমাখা দেহ সড়কের উপরও পড়ে আছে। বিকট শব্দ শুনে এগিয়ে আসেন এলাকার মানুষ। আহতদের মধ্যে যারা সাড়া দিচ্ছিলেন তাদের কয়েকজনকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। এরমধ্যে তিনিও একজন।

দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি মো. শামসুদ্দোহা জানিয়েছেন-সংঘর্ষের কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি ঘটনাস্থলে যান। স্পটে ১১টি লাশ দেখতে পান। অন্যদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এলাকার মানুষ প্রথমে এগিয়ে এসে সহায়তা করেন। পরে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা যান। প্রথমে আহতদের এবং পরে নিহতদের লাশ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা প্রচেষ্টার পর সড়কের উপর থেকে দুটো গাড়ি সরিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।

এদিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আরও তিন জনের মৃত্যু ঘটে। সবমিলিয়ে বিকাল পর্যন্ত ওই দুর্ঘটনায় ১৪ জন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন- আমরা ১৪ জনের লাশ পেয়েছি। হাসপাতালে আহত রয়েছেন আরও ১৭-১৮ জন। তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে- ২-৩ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান তিনি।

নিহতরা হলেন- সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত সজীব আলীর ছেলে রশিদ মিয়া, শান্তিগঞ্জ উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের মৃত হারুন মিয়ার ছেলে দুলাল মিয়া, একই উপজেলার বাবনগাঁ গ্রামের মৃত ওয়াহাব আলীর ছেলে শাহিন মিয়া, দিরাই উপজেলার আলীনগর গ্রামের মৃত শিশু মিয়ার ছেলে হারিছ মিয়া, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার হলদিউড়া গ্রামের আব্দুর রহিমের স্ত্রী আমিনা বেগম, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত মফিজ মিয়ার ছেলে সায়েদ নূর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার তলেরতন গ্রামের মৃত আওলাদ উল্লার ছেলে আওলাদ হোসেন, দিরাই উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের মৃত ছলিম উদ্দিনের ছেলে একলিম মিয়া, গচিয়া গ্রামের বারিক উল্লার ছেলে সিজিল মিয়া, ভাটিপাড়া গ্রামের সিরাজ মিয়ার ছেলে সৌরভ মিয়া, নেত্রকোনার ভারহাট্টা উপজেলার দশদার গ্রামের ইসলাম উদ্দিনের ছেলে আওলাদ মিয়া, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের শমসের নুরের মেয়ে মেহের, দিরাই উপজেলার মধুপুর গ্রামের সোনা মিয়ার ছেলে দুদু মিয়া, একই গ্রামের শাহজাহানের ছেলে বাদশা মিয়াসহ ১৪ জন।

এদিকে নিহতদের লাশ ও আহতদের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে শোকের মাতম শুরু হয়। স্বজনরা হাসপাতালের মর্গে, জরুরি বিভাগের সামনে কান্না করেন। এমন পরিস্থিতিতে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া এসব মানুষের পরিবার। তারা জানিয়েছেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ায় তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

বুধবার সকালে সিলেটে সফরে আসেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালেদ মাহমুদ চৌধুরী। আহতদের দেখতে তিনি সকাল ৯টার দিকে হাসপাতালে যান। তার আগে সেখানে পৌঁছেন সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সিলেটের জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান। এ সময় তারা নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনার পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার খবর নেন। এ সময় জেলা প্রশাসক সরকারের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা প্রদান করেন। মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে আরও ২৫ হাজার টাকা করে প্রদান করেন।