রবিবার, ১৯ মে ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ



                    চাইলে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন

বড়লেখায় বনে আগুন : বিট কর্মকর্তা প্রত্যাহার, তদন্ত প্রতিবেদন রোববার



বিজ্ঞাপন

এ.জে লাভলু:: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টের আওতাধীন সমনভাগ বিটের মাখালজুড়া ও ধলছড়া এলাকার বনাঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনায় বন বিভাগের সমনভাগ বিটের কর্মকর্তা নুরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বড়লেখা রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন দাস শুক্রবার (১৭ মার্চ) রাত ১০টায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সমনভাগ বিটের কর্মকর্তা নুরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করেছেন। তাকে বনবিভাগের সিলেট বিভাগীয় অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে।’

এদিকে ঘটনাটি তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি এখনও তদন্ত কাজ করছে। আগামী রোববার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এর আগে গত ৭ মার্চ দুপুরে সমনভাগ বিটের মাখালজুড়া ও ধলছড়া এলাকার বনাঞ্চলে আগুন লাগে। এতে কয়েক হেক্টর বনভূমির বাঁশ-গাছ ও ঝোপঝাড় পুড়ে যায়। ফলে হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।

স্থানীয় লোকজন ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বনায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষিত বনে আগুন লাগানো হয়েছে। এতে বনবিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের মদদে উপকারভোগীরা বনে আগুন দিয়েছেন। আগুনে বনের প্রায় ৪০ হেক্টর বনভূমির বাঁশ-গাছ ও ঝোপঝাড় পুড়ে গেছে বলে তারা ধারণা করছেন। এতে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের। হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। বনবিভাগ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে বনবিভাগ বলছে, কারও ফেলা সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। আগুনে বনের প্রায় ১ দশমিক ৮৫ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টের আওতাধীন সমনভাগ বিটের সমনভাগ সংরক্ষিত বনের আয়তন ১ হাজার ৮৫০ হেক্টর। সমনভাগ বনাঞ্চলটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মিলে চিরসবুজ একটি বনাঞ্চল এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশের মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অবস্থান অন্যতম। গত ৭ মার্চ দুপুরে সমনভাগ বিটের মাখালজুড়া ও ধলছড়া এলাকার বনাঞ্চলে আগুন লাগে। আগুনে বনের কয়েক হেক্টর বনভূমির বাঁশ-গাছ ও ঝোপঝাড় পুড়ে ছাই হয়ে যায়। খবর পেয়ে বনবিভাগের লোকজন দীর্ঘ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নেভান। তবে আগুনে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বনভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ, ধ্বংস হয়েছে বন্যপ্রাণির আবাসস্থল। বনে আগুন লাগার ঘটনায় গত ১১ মার্চ বড়লেখা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বন বিভাগের সমনভাগ বিটের কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় লোকজন বলেন, বনে গাছ লাগানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। আগুনে বনের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ-গাছ ও ঝোপঝাড় পুড়ে গেছে। জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। প্রাণের ভয়ে বনে থাকা কয়েকটি হাতি ভারতের দিকে পালিয়েছে। পাঁচ-ছয় দিন বন আগুনে পুড়েছে। বনবিভাগের লোকজনদের জানানোর পরও তারা তাতে গুরুত্ব দেননি। শুরুতে গুরুত্ব দিলে এত বন পুড়ত না। এতে স্পষ্ট যে বনে আগুন লাগার পেছনে বনবিভাগের লোকজন জড়িত রয়েছেন।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী খোর্শেদ আলম বলেন, আমরা সরেজমিন সমনভাগ বিটের মাখালজুড়া ও ধলছড়া এলাকার বনাঞ্চল ঘুরে দেখেছি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৪০ হেক্টর এলাকা আগুনে পুড়ে গেছে। একদিকে আগুনে বন পুড়ছে আর অন্যদিকে কিছু লোকজন সেখান থেকে গাছ ও বাঁশ কেটে ফেলছে। তিনি বলেন, আমরা জেনেছি যে বনায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে আগুন দিয়ে সংরক্ষিত বন পুড়ানো হয়েছে। এতে বনবিভাগের লোকজন জড়িত রয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, একটি প্রাকৃতি বন চাইলেই তৈরি করা যায়না। কিন্তু সহজেই তা ধ্বংস করা যায়। এই সংরক্ষিত বনটি যেভাবে আছে সেভাবে থাকতে দেওয়া উচিত। প্রাকৃতিক বন বন্যপ্রাণীরা ভালোবাসে। হাতির বিচরণকৃত এলাকায় বাঁশ-বন থাকা উচিত। এগুলো যদি পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয় তাহলে হাতি বন থেকে দ্রুত হারিয়ে যাবে। আর হাতি হারিয়ে হয়ে গেলে এই বনের জীববৈচিত্র্য থাকবে না। আগুন লাগার পর হাতিরা সেখান থেকে প্রাণের ভয়ে ভারতের দিকে পালিয়েছে। খোর্শেদ বলেন, সারা বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনে জন্য কাজ করছে তখন আমরা এর বিপরীতে উল্টো কাজ করতে পারিনা।

বড়লেখা রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন দাস শুক্রবার রাত ১০টায় বলেন, কেউ হয়তো সিগারেট টেনে অবশিষ্ট অংশ বনে ফেলেছে। তা থেকে হয়তো বনে আগুন লাগতে পারে। যেদিন বনে আগুন লেগেছে ওইদিনই স্থানীয় বিট কর্মকর্তা দীর্ঘ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পরদিন আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে জিপিএস মেশিন দিয়ে পরিমাপ করে দেখেছি যে আগুনে বনের ১ দশমিক ৮৫ হেক্টর বনভূমি পুড়েছে। এতে ঝোপঝাড় ও গাছপালার পাতা ঝলসে গেছে। এই ঘটনায় সমনভাগ বিট কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম থানায় সাধারণ ডায়রি করেছেন। আগুন পুড়ে গাছের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পুষাতে সেখানে গাছ লাগানো হবে। তিনি বলেন, ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত এখনও চলছে। আগামী রোববার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। বনায়নের জন্য বনে আগুন লাগানো হয়েছে কিনা এবং এর পেছনে বনবিভাগের লোকজন জড়িত রয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা অস্বীকার করেন।

বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইয়ারদৌস হাসান বলেন, সংরক্ষিত বনে আগুন লাগার বিষয়ে সমনভাগ বিট কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, পাথারিয়া সংরক্ষিত বন এলাকায় আগুন লেগেছে। এতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীসহ অনেক কীটপতঙ্গ, পাখির বাসার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক প্রাণী মারা গেছে। পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বনের প্রাণীরা ভয়ে আর বনে থাকবে না। তারা লোকালয়ে বা বন থেকে অনেক দূর চলে যেতে পারে।