শুক্রবার, ২৩ জুলাই ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



যেভাবে ‘ন্যাড়া মস্তান’ হলেন হাকালুকির ফারুক!



বিজ্ঞাপন

সাইফুল্লাহ হাসান :: রাতের আঁধারে ডাকাতের কবলে পড়েন ফারুক মিয়া। নিজের সাহসীকতা ও বুদ্ধি দিয়ে তখন সাত সাতটি ডাকাতের সঙ্গে মারপিট করে পালিয়ে আসেন তিনি। মূহুর্তের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে তার নিজ এলাকায়। পরে গ্রামের মানুষই তার নাম দেন ন্যাড়া মস্তান।

ফারুক মিয়া ওরফে ন্যাড়া মস্তানের বাড়ি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর এলাকায়। সম্প্রতি এশিয়ার সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকি ভ্রমণে গিয়ে দেখা হয় তার সঙ্গে। হাওরের পাশেই ছোট্ট একটি বাড়িতে তার বসবাস।


ন্যাড়া মস্তান বলেন, ‘‘বহুদিন আগে হাওরে রাতে ডাকাতের দল হানা দেয়। তারা আমাকে ধরে নিয়ে যায়। বহু কষ্টে মারপিট করে তাদের কাছ থেকে ছুটে আসি। গ্রামের মানুষজন কীভাবে যেনো জেনে ফেলে বিষয়টি। আশপাশের মানুষজন বলেন, ‘তুই সাতজন ডাকাতের কাছ থেকে বাইচ্চা আইছত। আইজ তাহি তর নাম ন্যাড়া মস্তান দিলাম।’ এখন ন্যাড়া মস্তান ছাড়া এলাকায় অন্য কোনো নামে আমারে চিনে না। এই এলাকায় যতো মস্তান থাকুক, সব ন্যাড়া মস্তানের নিচে।”

ফারুক মিয়ার কাছ থেকে জানা যায়, গত কয়েকবছর ধরে তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছেন। এই সংস্থার কাজ হচ্ছে হাওরের পাখি যাতে কেউ হত‌্যা না করে, গাছ পালা কেউ যাতে কেটে নিয়ে না যায়। এসবের দেখভাল করেন ন‌্যাড়া মস্তান। এই কাজের জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতন ছিল তার। করোনা শুরুর পর থেকে তাকে আর বেতন দিচ্ছে না সংস্থাটি। তার খোঁজ-খবরও রাখে না। তারপরও সর্বদা হাওরের পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন ন‌্যাড়া মস্তান। আর সেজন‌্য অত্র এলাকার সবাই তাকে ভালোবাসে।

স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার ন‌্যাড়া মস্তানের। হাওড় দেখভালের পাশাপাশি কৃষি কাজ করে সংসার চালান।

তিনি বলেন, ‘এক ছেলে পড়ালেখা করে না। এমনে টুকটাক কামকাজ করে। ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা করানোর। অন্য ছেলেকে পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়তে চাই। আমি গরিব হতে পারি কিন্তু ছেলেকে কষ্ট করেও লেখাপড়া করাচ্ছি। সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। যখন আমি থাকব না, তখন ছেলেরা বলবে বাপে আমারে কী দিয়ে গেছে? সেজন্য আমি কষ্ট করেও তাদের লেখাপড়া করাচ্ছি।’

হাওরে কথা হয় চাষি জমির উদ্দিনের সাথে। ন্যাড়া মস্তানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সে আমাদের সঙ্গে হাওরে নিয়মিত কাজ করে। সবাই তারে মস্তান নামে চিনে। তার কারণে অনেক অতিথি পাখি রক্ষা পেয়েছে শিকারীদের হাত থেকে।’


স্থানীয় পরিবেশকর্মী খোরশেদ আলম বলেন, ‘হাওরের পরিবেশ রক্ষা করা খুব জরুরি। প্রতি বছর হাকালুকিতে প্রচুর পাখি শিকার হয়। পাখি বাঁচলে পরিবেশ সুন্দর থাকবে। হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পাখি যাতে নিধন না করা হয়, সেদিকে কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি আরও আগে একবার শুনেছি এই ন্যাড়া মস্তানের কথা। একজন কৃষক হয়েও হাওর রক্ষার উদ্যোগের বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’