রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ



                    চাইলে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন

জুড়ীর কমলা বাগানে অজানা রোগের হানা



বিজ্ঞাপন

সাইফুল্লাহ হাসান :: মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা কমলা চাষের জন্য খ্যাত। এই উপজেলার টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই কমলার চাষ হচ্ছে। এখানে অনেকেই কমলা বাগান করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করে কমলা চাষিরা নতুন দুর্ভোগে পড়েছেন। তাদের কমলা বাগানে হানা দিয়েছে অজানা রোগ।


মরে যাচ্ছে অনেক বাগানের কমলার গাছ। কেনো মরে যাচ্ছে সেটাই চাষিরা বুঝতে পারছেন না। চাষিরা বলছেন, কৃষি অফিসের পরামর্শও কাজে আসছে না। তাই দিন দিন কমতে শুরু করেছে কমলার বাগান। অন্যদিকে চাষিরা এ অবস্থায় নতুন করে বাগান করতে আগ্রহীও হচ্ছেন না।

সরেজমিনে জুড়ীর বিভিন্ন কমলা বাগানে ঘুরে দেখা গেলো তারই প্রতিচ্ছবি। এই নিয়ে কথা হয় কমলা চাষিদের সঙ্গে। তারা জানান তাদের কষ্টের কথা, ব্যথার কথা।

জুড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী ডুমাবাড়ি এলাকার মকবুল আলী। ১০ বছর আগে ৩ একর জায়গায় ৪৬০টি গাছ দিয়ে বাগান করেছিলেন তিনি। প্রতি বছরই ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আসতো এই বাগান থেকে। বাগানের খরচ বাদে যে টাকা থাকতো তা দিয়েই ভালোই চলছিলো সংসার। ৪ ছেলে, ৪ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বাগানের মধ্যে ছোট্ট একটি বাড়িতে দিনযাপন করছিলেন। কিন্তু গত ৩ বছর থেকে বাগানের গাছগুলো মারা যাওয়ায় তার স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

মকবুল জানান, তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিন বছর আগেও উপজেলার সেরা বাগানটি ছিলো তার। কৃষি কার্ড থাকলেও বিগত ৫ বছর থেকে সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না তিনি।

মকবুল বলেন, বাগান করার পর ৫-৬ বছর ভালোই কমলা হইছিলো। এরপর থেকে দুইটা চারটা করে গাছ মরতে থাকে। মরতে মরতে হাতেগোনা ৩০ টির মতো গাছ রয়েছে। এগুলোতেও এখন আর ফল আসে না। অনেকবার কৃষি অফিসাররা বাগানে আসলেও কোন কাজ হচ্ছে না, গাছগুলোকে আর রক্ষা করা যাচ্ছে না।

পাতা হলুদ হয়ে ডালপালা মরে যায়, ধীরে ধীরে গাছটিতে আর ফসল আসে না। গাছ মারা যায় কয়েকদিনের মধ্যেই। বলছিলেন ওই এলাকার ৭০ বছর বয়সি চুনু মিয়া। তার বাগানেরও একই হাল।


চুনু মিয়া বলেন, এখন ১০০টি গাছ রয়েছে আমার বাগানে। এবছর এই সব গাছে ফলই আসে নাই। দুই একটি আসলেও বানর, কাঠবিড়ালি, বিভিন্ন রকমের পাখি এগুলো খেয়ে ফেলেছে।

কমলা চাষি শফিক উদ্দিনের বাগানে রয়েছে ২ হাজার ২৯টি গাছ। ৩ একর জায়গায় তিনি বাগান করেছেন। ৩ বছরে থেকে তার বাগানে ৪শ গাছ মারা গেছে।

শফিক উদ্দিন বলেন, কি কারণে গাছগুলো মারা যাচ্ছে তা বলতে পারছি না। যে গাছগুলোতে সবচেয়ে বেশি ফল আসতো সেই গাছগুলোই মারা যাচ্ছে। কৃষি অফিসাররা এসে পরামর্শ দিলেও কাজে আসছে না। ধীরে ধীরে প্রত্যেকটি গাছে এই অজানা রোগ হানা দিচ্ছে।

গাছের মড়ক থামাতে না পারলে এই এলাকা থেকে কমলা চাষ বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় কমলা চাষিরা।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় ১৪২ হেক্টর জমিতে ১৯৩টি কমলাবাগান আছে। সবচেয়ে বেশি ৯১ হেক্টর জমিতে কমলা চাষ হয় জুড়ী উপজেলায়। বড়লেখায় ২৫ হেক্টর, কুলাউড়ায় ১৭ হেক্টর, সদরে ১ দশমিক ৫ হেক্টর, শ্রীমঙ্গলে ৬ হেক্টর, কমলগঞ্জে ১ হেক্টর ও রাজনগরে ০ দশমিক ৫০ হেক্টর জমিতে কমলা চাষ হয়।

চাষিরা জানান, জুড়ীতে মূলত দুই ধরনের কমলার চাষ হয়- নাগপুরী ও খাসি জাত। এখানে খাসি কমলার চাষ বেশি হয়। নাগপুরী কমলাগুলো আকারে বড়, খাসি তুলনামূলক ছোট হয়।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কাজী লুৎফুল বারী বলেন, গাছ মরে যাওয়ার সম্পূর্ণ দায় ম্যানেজমেন্টের। চাষিরা নিয়মিত পরিচর্যা করে না। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। গাছের গুড়িতে পানি এসে আয়রন ও অ্যালুমিনিয়াম জমে গাছটি ধীরে ধীরে মরে যায়।

তিনি বলেন, কিভাবে মারা যাওয়ার হাত থেকে গাছকে রক্ষা করা যায় সে বিষয়ে চাষিদের অনেকবার ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে।