রবিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না: প্রধানমন্ত্রী
নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক



বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার কোনও পদক্ষেপও নিচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদে থাকার কোনও সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে।’

১৯ সেপ্টেম্বর বুধবার জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম মিলন ও সরকরি দলের ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর পৃথক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সবাই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জন্য বিরাট বোঝা বলে স্বীকার করেছেন। মানবিক কারণে নির্যাতিক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য তারা আমাদের সাধুবাদ জানিয়েছেন। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগে চীন, সোভিয়েত রাশিয়া, ভারতসহ সবার থেকে আমরা সাড়া পেয়েছি। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ হয়েছে, এ বিষয়ে সবাই একমত। তাদের নিজভূমিতে ফেরত নিতে হবে। এই চাপটা সবাই দিচ্ছেন, কেউ সরাসরি চাপ দিচ্ছেন, কেউ প্রকাশ্যে দিচ্ছেন, কেউ ভেতরে ভেতরে দিচ্ছেন। কেউ কেউ হয়তো তাদের কূটনৈতিক কোনও পরিকল্পনার কারণে প্রকাশ্যে প্রকাশ্যে চাপ দেননি। কিন্তু আমাদের বলেছেন, মিয়ানমার যেন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে যায়, তার জন্য যা যা করণীয়, তার সবই করবেন। আমাদের কূটনৈতিক সাফল্য এটাই যে, আমরা সবাইকে একমতে আনতে পেরেছি যে, মিয়ানমার তাদের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাবে।’

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত গিয়ে যেন বসবাস করতে পারে, সেজন্য সেখানে একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে চীন ও ভারত রোহিঙ্গাদের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করে দিচ্ছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রসঙ্গে সরকারের তৎপরতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। মিয়ানমারের সঙ্গে তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিছু নামের তালিকাও প্রস্তুত হয়েছে। মিয়ানমার সরকার তাদের নিয়ে যাবে বলে স্বীকারও করেছে। যদিও স্বীকার করেছে কিন্তু এখনো নেওয়ার মতো কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তবে, আমরা যথেষ্ট সক্রিয় আছি। তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সফলতা অর্জন করতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।’

এর আগে মিলনের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে চাই। আওয়ামী লীগ সরকারের গ্রহণ করা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে রোহিঙ্গাদের নিজদের ভূমিতে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।’

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে কক্সবাজারসহ আশপাশের জনগোষ্ঠী ও প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বনভূমি উজাড় ও পাহাড় কাটার কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ডিপথেরিয়া, পোলিও, এইচআইভিসহ নানা সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে মানবপাচার, মাদকদ্রব্য চোরাচালানসহ অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের ঝুঁকিও বেড়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে তিনটি চুক্তি সই হয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য দ্বি-পাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’

আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাতে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে এ সমস্যার অগ্রগতি পর্যালোচনাসহ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আমরা বিভিন্ন সভায় তুলে ধরবো। এ ছাড়া অধিবেশনের সাইডলাইনে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হবে।’

এদিকে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভূর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক সাফল্য এইটুকু যে, আমরা আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি করতে পেরেছি। এখন সারাবিশ্ব মনে করে রোহিঙ্গদের ওপর অন্যায় হয়েছে এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত নেওয়া মিয়ানমারের কর্তব্য। আন্তর্জাতিক আদালতও রোহিঙ্গাদের অত্যাচারে যারা জড়িত, তাদের বিচারের ব্যবস্থা করছে। ওই আদালত আমাদের কাছে যেসব তথ্য চাচ্ছে, আমরা তার সবই দিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, বিমেসটেক সম্মেলনে আমার সঙ্গে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতির ঘরোয়াভাবে কথা হয়েছে। তিনি রোহিঙ্গাদের বিষয়টি স্বীকার করে তাদের ফেরত নেবেনও বলেছেন। আশা করি, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার বাধ্য হবে।’

১৯৭৮-৭৯ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ শুরু হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওই সময় সামরিক শাসকেরা কীভাবে বিষয়টি হ্যান্ডেল করেছে, তা জানি না। তবে, তাদের ব্যর্থতার কারণে এটা অব্যাহত আছে। এরপর আশির দশকে আশে, ৯২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আবার আসে। পরে আলাপ-আলোচনা করে কিছু ফেরত দেওয়া গেছে।’

সরকারি দলের এম এ মালেকের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সারাদেশে ৯১৪টি সেতু ও ৩ হাজার ৯৭৭টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে।’

এ কে এম রহমত উল্লাহর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে। এতে মোট ২৫ হাজার ১৬টি প্লট আছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের যানজট উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।’

আলী আজমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কেনা সেলফ প্রপেল্ড কামান আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের সময়ে সেনাবাহিনীর শক্তি বাড়াতে অ্যান্টি ট্যাংক গাইডেড মিসাইল, অ্যান্টি ট্যাংক উইপন, মাল্টিপল লঞ্চড রকেট সিস্টেম, উইপন লোকেটিং রাডার, গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার, আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার, আর্মার্ড রিকভারি ভেহিকেল ও এফএম-৯০ মডেলের এয়ার ডিফেন্স এসএএমসহ আরও বেশ কিছু সরঞ্জাম কেনা হয়েছে।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে সাগরে নজরদারি বাড়াতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে দু’টি মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফট ও দুটি হেলিকপ্টার সংযোজিত হয়েছে। এছাড়া আরও দু’টি মেরিটাইম এয়ারক্রাফট নির্মাণাধীণ আছে এবং দুটি হেলিকপ্টার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তরের আগে বিকেল পাঁচটার পর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।