শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



কুলাউড়ায় শেকলে বাঁধা জীবন ও একটি পরিবারের আর্তনাদ
বিশেষ প্রতিবেদক

বিশেষ প্রতিবেদক



বিজ্ঞাপন

শিকল বাঁধা ছোট ভাই তৌফিক মিয়া এবং ইনসেটে বড় ভাই মোশাহিদ আলী ওরফে আয়না মিয়া

আধপাকা একটি ঘরের মধ্যে শুয়ে আছেন তৌফিক মিয়া (৩২)। অচেনা লোক দেখলেই অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। তার অনেক জিজ্ঞেসা হয়তো মানুষের কাছে। কেনো তার পায়ে শিকল বাঁধা?

তিনি তার কারণ না জানলেও পরিবারের লোকজনের দাবি মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়াতে চার বছর ধরে তাকে এভাবে শেকলবন্দি রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া না করায় শরীরে জেঁকে বসেছে নানা রোগ।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার জয়জন্ডী ইউনিয়নের দক্ষিণ গিয়াসনগর গ্রামের প্রয়াত ক্বারি রমিজ উদ্দিন ওরফে রমিজ ক্বারির ছোট ছেলে তৌফিক মিয়া। চার বছর আগে বাবা রমিজ ক্বারি মারা যাবার পর তিনি শোকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর তাকে নিয়ে বিপাকে পড়েন মা, বোন ও বড় ভাই।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, জীবদ্দশায় বিভিন্ন মসজিদ-মক্তবে চাকরি করে কোনো রকমে স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলছিলো রমিজ ক্বারির পরিবার। মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যান তিনি। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরেন বড় ছেলে মোশাহিদ আলী ওরফে আয়না মিয়া। একই সঙ্গে দিনমজুরের কাজ করেন মা। অসুস্থ ভাই, বোন ও নিজের স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন আয়না মিয়া।

আয়না মিয়া বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর তৌফিক পাগলামি শুরু করে। মানুষের জিনিষপত্র নষ্ট করে ও শিশুদের মারধর করতে থাকে। যার কারণে আমরা বুঝতে পারি সে মানসিকভাবে অসুস্থ। অভাবের সংসারের নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ভাইকে অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েছি। কিন্তু টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা করতে না পারায় সে আর সুস্থ হয়ে ওঠেনি। তাই বাধ্য হয়ে শেকলবন্দি করে তাকে রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে নিজের স্ত্রী অসুস্থ। ডাক্তার দেখানোর পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার জরায়ুতে সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসক জানিয়েছেন অপারেশন করতে হবে। টাকার অভাবে আজও স্ত্রীর অপারেশন করাতে পারেননি। গত ছয় মাস আগে পুকুরপাড়ে পড়ে ছোট বোন রুলি বেগমের পায়ের গোড়ালি ভেঙে যায়। কোনো উপায় না পেয়ে ১২ শতকের পৈতৃক ভিটা থেকে কিছু অংশ বিক্রি করে বোনের চিকিৎসা শুরু করেন। ছয় মাসে তিনটি অপারেশন করেন ডাক্তার। কিন্তু আজও বোনটি সুস্থ হয়ে উঠেনি। তার পায়ের ভাঙা গোড়ালি এখনো জোড়া লাগেনি। সর্বশেষ গত এক মাস আগে হটাৎ করে বৃদ্ধ মা স্টোক করেন। মাকে নিয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে গোটা পরিবারের সবাই অসুস্থ।’ এভাবে বলতে বলতে এক পর্যায়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন আয়না মিয়া।

বড় ভাইয়ের করুণ আর্তনাদ শুনে আগ্রহভরে তৌফিক মিয়ার দিকে এগিয়ে গেলে দেখা যায়, তার চাহনিতে যেন সুস্থ হয়ে উঠার একটা করুণ আকুতি বিরাজমান। কিন্তু চিকিৎসা করার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। দু’মুঠো ভাত যোগান দেওয়া যে পরিবারের পক্ষে দূরহ হয়ে ওঠেছে, সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা কিভাবে করবেন আয়না মিয়া? তাই হতাশা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে।

সমাজের বিত্তবানরা একটু সুনজর দিলে এমন দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে পারে এ পরিবারটি। মহৎপ্রাণ কোনো সুহৃদ আয়না মিয়ার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাইলে আয়নার মিয়ার ০১৭২৮-৯৯৬৪০১ মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারেন।