এ.জে লাভলু:: মৌলভীবাজারে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পল্লীবিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও গাছ ঘেঁষে, কোথাও বসতঘরের ওপর দিয়ে, আবার কোথাও নিচু হয়ে হাতের নাগালে চলে আসা এসব লাইন যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টরা ঝুঁকিপূর্ণ লাইন তদারকি করে সংস্কার বা মেরামত করা তো দূরের কথা, অভিযোগ পেয়েও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। বরং অনৈতিক সুবিধা দিলে কাজ দ্রুত করা হয়-এমন অভিযোগও রয়েছে। অন্যথায় দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনাও ঘটেছে, তবুও সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ছে না। প্রতিকার চাইতে গিয়ে অনেকেই হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। দ্রুত এসব ঝুঁকিপূর্ণ লাইন মেরামত না হলে ঝড়ে লাইন ছিঁড়ে প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের ভবান ভট্টশ্রী গ্রামের রুহুল আমিন রিপন ও আব্দুল হাছিব এবং ওয়াহিদ আহমদ ও জসিম উদ্দিনের বাড়ির মাঝখান দিয়ে টেনে নেওয়া পল্লীবিদ্যুতের (লাইন) একটি খুঁটি ভবন নির্মাণের জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে সরানো হলেও সেখানে খুটি না বসিয়ে গাছের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সঞ্চালন লাইন টেনে মিটার সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে অনৈতিকভাবে এ কাজটি করা হয়েছে। উপজেলার সুড়িকান্দি গ্রামের সেলিম উদ্দিনের বাড়ির ওপর দিয়ে পল্লীবিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন টানা রয়েছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সেলিমের পরিবার বাধ্য হয়ে পিলারের ওপর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে লাইনটি কিছুটা উঁচু করে রেখেছেন। একইভাবে জুড়ী উপজেলার পাতিলাসাঙ্গন গ্রামের আব্দুল খালিকের বাড়ির পাশ দিয়ে একটি গাছ ঘেঁষে লাইন টানা হলেও সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। একই উপজেলার বাছিরপুর (রহমানীয়া জামে মসজিদ সংলগ্ন) এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের বাড়ির সীমানা প্রাচীরের ভেতরে থাকা একটি বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সম্প্রতি সঞ্চালন লাইন সরিয়ে প্রায় বছরখানেক আগে রাস্তায় বসানো অন্য একটি খুঁটিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বড়লেখা উপজেলার হাতলিয়া এলাকায় জবলু হোসেনের মুরগির ফার্মের পাশে একটি খুঁটি হেলে পড়েছে। দোহালিয়া কুইয়ারি টিলা গ্রামের আরিফ উদ্দিনের বাড়ির আমগাছ ঘেঁষে সঞ্চালন লাইন টানা হলেও তাতে প্লাস্টিকের পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে। চুকারপুঞ্জি থেকে শেওরাডিগা পর্যন্ত টানা লাইনে নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে বেশি ব্যবধানে খুঁটি স্থাপন করায় বিদ্যুতের তার নিচের দিকে নেমে গেছে। যা বর্ষায় পানিতে পড়ে দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এছাড়া গাজিটেকায় এলাকায় দীর্ঘদিনের পুরোনো লোহার খুঁটিও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও তা মেরামত বা সংস্কার করা হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো সংস্কার করে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করা হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সুড়িকান্দি গ্রামের সেলিম উদ্দিন বলেন, প্রায় দুই বছর আগে খুঁটি ও তার সরানোর জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু এখনও কাজ হয়নি। টিনের সঙ্গে লাইন না লাগার জন্য পিলার বসিয়ে তাতে পাইপ লাগিয়ে কিছুটা উঁচু করে রেখেছি। বিষয়টি পল্লী বিদ্যুতের লোকজনকে বার বার বললেও কোনো উপকার হচ্ছে না।
পাতিলাসাঙ্গন গ্রামের আব্দুল খালিক বলেন, গত বছর নিয়ম অনুযায়ী খুঁটি স্থানান্তরের আবেদন করেছিলাম। খুঁটি সরালেও বাড়ির পাশ দিয়ে গাছ ঘেঁষে লাইন রেখে গেছে। এতে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে, কিন্তু বারবার জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বাছিরপুর এলাকার এক গ্রাহক জানান, আমাদের এখানে বছরখানেক আগে বিদ্যুতের নতুন বেশ খুটি স্থাপন করা হয়েছে। এই খুটিগুলোতে এখনও তার টানা হয়নি। কিন্তু একটি খুটি দেখলাম নিয়মবর্হিভূতভাবে এক গ্রাহকের বাড়ির কাছে স্থাপন করা হয়েছে। অথচ একটি খুটি স্থানান্তর করতে হলে সেখানে অনেক নিয়ম আছে। কিন্তু সেখানে কীভাবে এটি বসানো হলো তা বোধগম্য নয়। নিশ্চই এখানে পল্লী বিদ্যুতের লোকজন কোনো সুবিধাগ্রহণ করে এই কাজটা করেছে।
দোহালিয়া গ্রামের এক গ্রাহক জানান, দোহালিয়া গ্রামে বিদ্যুতের তার দীর্ঘদিন ধরে গাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে জানানো হলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে যেকোনো সময় তার ছিঁড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বড়লেখা আঞ্চলিক কার্যালয়ের এজিএম মো. রুহুল আমিন বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
তবে ডিজিএম মো. খায়রুল বাকী খান বলেন, যেসব স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ লাইন রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা খুঁটির নিচে ঘর নির্মাণের পর খুঁটি স্থানান্তরের আবেদন করেন। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।





