মঙ্গলবার, ৫ মার্চ ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ



                    চাইলে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন

গোয়াইনঘাটে মুজাহিদুলের বাগানে ৩ থেকে ৮ কেজি ওজনের জারা লেবু, রপ্তানিতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা



বিজ্ঞাপন

মারুফ হাসান:
জারা লেবুর সুমিষ্ট ঘ্রাণ, স্বাদ এবং এর চাহিদার কথা নতুন করে বলবার কিছু নেই। সিলেট অঞ্চলের বিশেষ এই লেবুর সারা দেশেতো বটে বিদেশেও চাহিদা বেড়েছে বহুগুন। জারা লেবু চাষ করে বাৎসরিক ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকা আয় করছেন কোনো কোনো কৃষক। বিদেশে রপ্তানির পথ সহজ হলে এই খাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে বালে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার মুজাহিদুল ইসলাম জারা লেবুর সফল চাষি। পিতা মোস্তাক আহমদের কাছ থেকে বিভিন্ন কলা-কৌশল রপ্ত করে লেবু চাষে বিশেষ সফলতা দেখিয়েছেন মুজাহিদ। গুলজারা, লম্বা গুলজারা, পানিজারা এবং বিছনা জারা নামের চার প্রচাতির জারা লেবুর চাষ করেছেন তিনি। বৎসরে সব খরচ বাদ দিয়ে তার নীট মুনাফা হয় ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকা। সফল লেবু চাষী হিসেবে উপজেলা প্রশাসন থেকে ৩বার পুরস্কারও পেয়েছেন মুজাহিদ।

সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে লেবু চাষি মুজাহিদুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানান, প্রায় ২০ বিঘা জমিতে নিজের ৩টি এবং বাবার ৬টি বাগানসহ ৯টি ছোট-বড় বাগান আছে তাদের। যে বাগানগুলোর লেবুর বেশির ভাগই বিদেশে রপ্তানি করা হত। ক্যাঙ্কার নামক এক প্রকার রোগের ফলে রপ্তানি সাময়িক বন্ধ হলেও বর্তমানে এই রোগমুক্ত বাগান থেকে আবারও বিদেশে লেবু রপ্তানি করতে পারবেন তিনি। বর্তমানে তার বাগানে ৩ থেকে ৮ কেজি ওজনের জারা লেবুর ব্যাপক ফলন হচ্ছে বলে জানান মুজাহিদুল ইসলাম।

মুজাহিদ জানান, লন্ডন, আমেরিকা, ইতালি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তাঁর বাগান থেকে লেবু রপ্তানি করা হত। ক্যাঙ্কার নামক রোগের আ্ক্রমণের গত কয়েক বছর তিনি লেবুর ফলন কম পেয়েছেন এবং রপ্তানি ব্যহত হয়েছে। সাইট্রাস রিসার্স সেন্টারের কর্মকর্তা তপন কুমারে নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তার বাগানে প্রায় ৩ বছর গবেষণা করে এই রোগ নিমূল করতে সক্ষম হন। এ সময় জৈন্তা সাইট্রাসের লুৎফুর রহমানও তাকে বিশেষ ভাবে সহযোগিতা করেন।
এছাড়াও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিসুজ্জামান সার্বক্ষণিক তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন সরকারের এই কর্মকর্তার সহযোগিতায় কৃষি সংশ্লিষ্টরা তার বাগান পরিদর্শন করে রোগমুক্ত বাগানের ঘোষণা দিবেন। সিলেট থেকে সরাসরি বিদেশে রপ্তানি ব্যবস্থা না থাকাটা পচনশীল এই পণ্য রপ্তানির প্রধান অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে মুজাহিদ বলেন, সরকার যদি এ বিষয়ে নজর দেন তাহলে এ অঞ্চলের কৃষক ব্যাপক লাভবান হবে।

মুজাহিদ দাবি করেন, বাংলাদেশে জারা লেবুর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাগান সম্প্রসারণ তাদের মাধ্যমেই হয়েছে। তার বাবা মোস্তাক আহমদ স্বাধীনতার পরের বছর অর্থাৎ ৭২ সালে আসাম থেকে জারা লেবুর বীজ নিয়ে একটি বাগান করেন। ফলন ভাল এবং লাভজনক হওয়ায় তিনি এক এক করে বাগান সম্প্রসারণ করেন। বাবার শিখিয়ে দেওয়া জ্ঞানকে পুজি করে এবং বিভিন্ন বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মুজাহিদ নিজেও এখন জারা লেবুর সফল চাষী। মুজাহিদুল ইসলামের এই সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গোয়াইনঘাটের ফতেপুর, সপ্তমখন্ড, মালগ্রামের আরো ১৫২ জন লেবু চাষী প্রায় ৭২ বিঘা জমিতে পৃথক পৃথক লেবু বাগান গড়ে তুলেছেন। সব মিলে গোয়াইন ঘাটের ফতেপুর ইউনিয়ন এখন জারা লেবুর রাজধানী হয়ে উঠেছে।

গোয়াইনঘাটের কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিসুজ্জামান জানান, মুজাহিদুল ইসলামের বাবা মোস্তাক আহমদ প্রায় ৪০/৪৫ বছর থেকে জারা লেবুর চাষ করে আসছেন। এই অঞ্চলের জারা লেবুর স্বাদ এবং ঘ্রাণ দু-ই অতুলনীয়। তিনি জানান, সিলেট অঞ্চলের এই লেবু সরকারী ভাবে এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হচ্ছে। বিদেশে প্রবাসী বাংলাদেশীরাই এর বড় ক্রেতা। বিশেষ করে সিলেটীরাই জারা লেবুটাকে বিশেষ পছন্দ করেন, তাই লন্ডন-আমেরিকায় এর চাহিদা ব্যাপক।
বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাধা কোথায় এমন প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই কর্মকর্তা জানান, সিলেট থেকে সবজি জাতীয় কাঁচা মাল সরাসরি বিদেশে পাঠানোর কোনো মাধ্যম না থাকায় এখানকার কৃষকরা লাভ বান হতে পারছেন না। যদি সিলেট থেকে কোনো কার্গো সার্ভিস চালু করা সম্ভব হয়, তবে লাভ বান হবেন কৃষক এবং সিলেটের প্রবাসীরাও দেশের টাটকা লেবুসহ বিভিন্ন ফলমুল-শাকসব্জির স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন।

কৃষি কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান আরো জানান, আমরা জারা লেবুর উৎপাদন বৃদ্ধিতে নতুন নতুন এলাকায় বাগান তৈরিতে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করছি এরই ধারাবাহিকতায় কিছু নতুন বাগান হয়েছে। ভবিষ্যতে রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিদেশি বায়ারদেরকে দিয়ে বাগান পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান।

চাহিদার কথা বিবেচনা করে জারা লেবুর চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারলে সিলেটের চা-কমলা-শীতলপাটি-সাতকরার মতো জারা লেবুও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।