শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



নদীতে বাড়ছে পানি, আশঙ্কা বড় বন্যার
খবর: পিবিডি

খবর: পিবিডি



বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বন্যা অন্যতম। প্রতি বছরেই বন্যায় আত্রান্ত হয় নদী অঞ্চলগুলো। এ বছরও আগে থেকেই বন্যার আশঙ্কা ছিল আবহাওয়াবিদদের। এবার সেই আশঙ্কা সত্যি হতে শুরু করেছে। হঠাৎ করেই ফুঁসে উঠেছে বাংলাদেশের নদীগুলো। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে নদী অঞ্চলে। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন নদী অঞ্চলের মানুষ।

ফুঁসে উঠেছে পদ্মা
ভয়ঙ্কর রূপ দেখাচ্ছে পদ্মা। রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার। এতে বিপদ সীমার মাত্র ১ দশমিক ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মা। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এখনই পদ্মার বুকের জেগে ওঠা বেশিরভাগ চর তলিয়ে গেছে। এরই মধ্যে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চর বয়ারমারী আমিন পাড়া গ্রামের ৩৫টি বাড়ি-ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া ১৫টির অধিক বাড়ি-ঘর আংশিক ভাঙনের কবলে পড়েছে। যে কোনো সময় এসবও বিলীন হতে পারে। এতে ওই গ্রামের লোকজন ভাঙন আতঙ্কে দিন-রাত যাপন করছে। গরু-ছাগল, হাস-মুরগিসহ বিভিন্ন গবাদি পশু সরাতে পারলেও অনেকে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। এতে বেড়েছে দুর্ভোগ।

রাজশাহী পবা উপজেলা হরিয়ান মধ্যচরে বসবাস করে ১০০টির মত পরিবার। চরখিদিরপুর ও খানপুরে রয়েছে প্রায় ৪০০টি পরিবার। প্রতিবারই মধ্যচর ডুবে আর চরখিদিরপুরে ভাঙ্গে পাড়। এতে পদ্মার নদীগর্ভে বিলিন হয় ক্ষেত, গাছপালা ও বাড়িঘর। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। বৃষ্টিপাত না হলেও উজানের পাহাড়ি ঢলে ভাঙ্গতে শুরু করেছে পদ্মা নদীর পাড়া। বিশেষ করে পদ্মার নদীর ওপারে চরখিদিরপুর, খানপুর ও চরমাঝারদিয়াড়ে পাড় ভাঙ্গায় এলাকাবাসির মধ্যে দেখা দিয়েছে অজানা আতংক। এরই মধ্যে নদীতে নেমে গেছে কয়েকশ’ বিঘা আবাদি জমি এবং অনেক গাছপালা। প্রতি মুহূর্তে কাটছে আবাস হারানোর আতঙ্কে।

মাদারীপুরে ভাঙনের কান্না
পদ্মা নদীর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদারীপুরে শিবচরের পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে ৩টি ইউনিয়নে ব্যাপক নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের শিকার হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি। অনেকে আবার ভাঙনের ভয়ে ঘরবাড়ি নিয়ে অন্যত্রে চলে যাচ্ছেন। এ নিয়ে চলতি বছর তিন-চার সপ্তাহের ব্যবধানে এই তিন ইউনিয়নে ৪টি স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে গ্রামীনফোনের টাওয়ারসহ শত শত ঘরবাড়ি, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

গত ৩-৪ সপ্তহে ৪টি বিদ্যালয় ভবন, ৫ শতাধিক ঘরবাড়িসহ চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, খাসেরহাটের অর্ধশত দোকান ক্ষতিগ্রস্থ হলো। চরজানাজাত ইউনিয়নের মাধ্যমিক স্কুল চরজানাজাত ইলিয়াছ আহম্মেদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, আ. মালেক তালুকদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মজিদ সরকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বন্দরখোলার ৭২নং নারিকেল বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়। এতে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্কুলগুলো অন্যত্র সরিয়ে কোনোমতে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

তিস্তার পানি বিপদ সীমার উপর
উজান থেকে নেমে আসা আসা ঢল ও বৃষ্টির কারণে লালমনিরহাটে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার(৫২.৭৫) উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধির কারণে তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় রাস্তা ঘাট ভেঙে লোকালায়ে ঢুকে পড়ছে নদীর পানি। ফলে মানুষজনের মাঝে আতংক বিরাজ করছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। সেই সাথে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তার পানি বাড়তে থাকে। সোমবার বিকেল ৬ টায় ওই পানি বিপদসীমার কিছুটা নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যার পর থেকে তা হু হু করে বাড়তে থাকে। এই অবস্থায় সোমবার রাত ৯ টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে ওই পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এতে করে হাতীবান্ধার তিস্তা তীরবর্তী ৬ টি ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে হাতীবান্ধার সিংঙ্গীমারী ইউনিয়নের ধুবনী গ্রামের কৃষক শাহীনুর রহমান জানান, সন্ধ্যা থেকে হঠাৎ করেই নদীর পানি বাড়তে থাকে। পরে রাত ১০ টার দিকে ওই পানি রাস্তা, ঘাট ভেঙে ঘর-বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এনিয়ে এলাকার লোকজনের মাঝে আতংক দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার বিকেলে ৬ টায় তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার প্রায় ৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু সন্ধ্যা থেকে ওই পানি বেড়ে গিয়ে রাত ৯ টায় বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে তা প্রবাহিত হতে থাকে।

ধরলায় হঠাৎ পানি বৃদ্ধি
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ধরলা নদীর ভাঙন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্মাণাধীন ধরলা সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে নদীর স্রোতে সোজাসুজি সোনাইকাজী গ্রামের ভূখণ্ডে আঘাত করার কারণে দুই দিনে ধরলার ভাঙনে নদী নিকটবর্তী সোনাইকাজী গ্রামের বেড়িবাঁধ, আবাদি জমি, বাগান, বাঁশঝাড়, বসতভিটাসহ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন ধরলা সেতুর এক কিলোমিটার দক্ষিণে সোনাইকাজী এলাকায় ধরলা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নির্মাণাধীন সেতুর এ্যাপ্রোচ সড়কে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে নদীর তীব্র স্রোতে সোজাসুজি এই এলাকায় আছড়ে পড়ছে। ফলে অব্যাহত ভাঙনের ফলে সোনাইকাজীর ১৫টি পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। মারাত্মক ভাঙনে হুমকির মুখে রয়েছে সোনাইকাজী মসজিদ, রামপ্রসাদ ও প্রাণকৃষ্ণ গ্রাম, মরানদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ধরলাসহ কুড়িগ্রামের বেশ কয়টি নদ-নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনও বিপদসীমা অতিক্রম করেনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবেন্দ্র নাথ উরাও জানান, ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন বৃদ্ধির খবর পেয়েছি। পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কুড়িগ্রামে বন্যার আশঙ্কা
বৃ‌ষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বাড়তে শুরু করেছে দুধকুমার ন‌দের পা‌নি। গত ক‌য়েক‌দিন ধ‌রে কুড়িগ্রাম জেলার নদ-নদীগু‌লোর পা‌নির প‌রিমাণ কমলেও সোমবার (১০ সে‌প্টেম্বর) বিকাল ৩টার পর থে‌কে দুধকুমার নদের পা‌নি অস্বাভা‌বিকভা‌বে বাড়‌তে থা‌কে। এ‌তে ক‌রে এ দু‌টি নদ-নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লা‌বিত হ‌য়ে বন্যা প‌রি‌স্থি‌তির সৃ‌ষ্টির আশঙ্কা কর‌ছেন সং‌শ্লিষ্ট এলাকাবাসী।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী মঙ্গলবার (১১সে‌প্টেম্বর) সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ১২ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পা‌নি সেতু প‌য়ে‌ন্টে (ফে‌রিঘাট প‌য়েন্ট) ৯৭ সে‌ন্টি‌মিটার বৃ‌দ্ধি পে‌য়ে বিপদ সীমার ২৮ সে‌ন্টি‌মিটার নিচ দিয়ে প্রবা‌হিত হ‌চ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া প‌য়ে‌ন্টে ২০ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ১৫ সে‌ন্টি‌মিটার ক‌রে বৃ‌দ্ধি পে‌য়ে‌ছে।

ত‌বে কু‌ড়িগ্রাম সদর উপ‌জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ‌মিন আল পার‌ভেজ জানান, নদীর পা‌নি বৃ‌দ্ধি‌তে উদ্ভুত প‌রি‌স্থি‌তির ওপর নজর রাখা হ‌চ্ছে। প্র‌য়োজ‌নে নদী তীরবর্তী এলাকার লোকজন‌দের ‌নিরাপদ স্থা‌নে স‌রি‌য়ে আনা যা‌বে।

কু‌ড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, আগামী কয়েকদিন জেলার সবক’টি নদ-নদীর পা‌নি বৃদ্ধি পে‌তে পা‌রে। বন্যা প‌রি‌স্থি‌তি সৃ‌ষ্টি হ‌তে পা‌রে কিনা-এমন প্র‌শ্নের জবা‌বে তিনি জানান, ভারী বর্ষণ ও উজা‌নের ঢল অব্যাহত থাক‌লে জেলায় বন্যা প‌রি‌স্থি‌তি সৃ‌ষ্টি হতে পারে।

ভারতের অগ্রিম সতর্কতা
কিছুদিন আগেই বাংলাদেশে প্রবল বন্যার সতর্কবার্তা দিয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত। সম্প্রতি চীন ব্রহ্মপুত্র নদের উজানের নদীগুলোতে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে এ সতর্কবার্তা পাঠায় ভারত।

ওই সতর্কবার্তায় ভারত জানিয়েছিল, চীনে অতি বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্রের উজানে থাকা সাংপো নদীতে পানি প্রবাহ অতি মাত্রায় বেড়ে গেছে। এ কারণে চীন সাংপোর অতিরিক্ত পানি প্রবল মাত্রায় ভাটির দিকে ছেড়ে দেয়। এর প্রভাবে ভারতের অরুণাচল ও আসাম প্রদেশের নদীগুলোতে পানি বাড়তে শুরু করে। এ অবস্থায় ভারত দু’টি প্রদেশে উচ্চ বন্যা সতর্কতা জারি করে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশকেও সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।