শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



জুড়ীতে সংরক্ষিত বনের দুই হাজার একর জমি ইজারা দেয়ার পাঁয়তারা




ছবি: খোরশেদ আলম

রিপন দে :: মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হারারগজ সংরক্ষিত বন দেশের অন্যতম একটি বন। এই বনে প্রাকৃতিক বেত বাগান ও বাঁশ বাগানের পাশাপাশি রয়েছে নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র। বর্তমানে সংরক্ষিত এই বনটি নানা কারণে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। একটি প্রভাবশালী মহল বনটি ধ্বংসে শেষ পেরেক মারার পরিকল্পনা নিয়েছে। যার সঙ্গে কিছু সরকারি কর্মকর্তাও জড়িত।


ত্রুটিপূর্ণ ভূমি জরিপের মাধ্যমে বনের মধ্য অংশের ২১৭৪.৩৫ একর ভূমিকে প্রথমে খাস জমি দেখানো হয়েছে। পরে সেই জমিকে প্রভাবশালী ব্যক্তির চা বাগান সম্প্রাসারণের জন্য লিজ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বন বিভাগের আপত্তি এবং বনের স্বার্থ না দেখে ব্যক্তি স্বার্থকে বড় করে দেখার অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি ভুল জরিপের পর বন বিভাগের আপত্তি এবং একটি তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ আমলে না নিয়ে উল্টো তড়িঘড়ি করেই এই ভূমি ‘খাস’ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। প্রশাসনের একটি অংশ সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধমে আইনের প্যাঁচে এই কাজটি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, ২০১৩ সালে ভুল জরিপের মাধ্যমে এই বনের জায়গাকে জেলা প্রশাসনের ‘খাস’ খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এর শ্রেণি পরিবর্তন করে বনভূমির পরিবর্তে লেখা হয় ‘টিলা রকম ভূমি’। সে সময় এর প্রতিবাদে বন বিভাগ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে চিঠি পাঠায়। এ নিয়ে মামলা চলমান থাকলেও সম্প্রতি একটি চা বাগানকে মামলা নিষ্পত্তি সাপেক্ষে বনের সে ভূমি ইজারা দেয়ার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে।

ত্রুটিপূর্ণ ভূমি জরিপ এবং তা সংশোধনে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে বন বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের মধ্যেই বেশ কিছু কোম্পানি এই ২১৭৪.৩৫ একর ভূমি ইজারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিল। এরই মধ্যে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ট্রাইব্যুনালে চলতে থাকা মামলার নিষ্পত্তি সাপেক্ষে ইজারাপ্রাপ্তির গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছে।


এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি চিঠি ভূমি মন্ত্রণালয়ে গেলে সেখানে বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে নিজেদের জায়গা ফিরে পেতে কোনো চা বাগানকে তা লিজ দিতে আপত্তি জানায় বন বিভাগ। সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকা সিলেট বিভাগের উপ-বন সংরক্ষক এসএম সাজ্জাদ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে কিছু স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা অতি উৎসাহ নিয়ে ওপর মহলে ভুল তথ্য দিয়ে এই ইজারার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, ১৯২১ সালের ২৪ অক্টোবর তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার অজরিপকৃত ১২০১৯ একর বনভূমিকে ‘হারারগজ রিজার্ভ ফরেস্ট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

আসাম ফরেস্ট রেগুলেশন ১৮৯১ এর অধীনে রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরক্ষিত বন ঘোষণার পর আরও কয়েকশ একর জায়গা এ বনভূমির অধীনে সংরক্ষিত ঘোষণা করার ফলে ১৯৩৮ সাল নাগাদ এর অজরিপকৃত মোট বনভূমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭৬৮.৮০ একর।

তবে ১৯৩৩ সালে পার্শ্ববর্তী পৃথিমপাশা এস্টেটের দায়ের করা একটি স্বত্ব মামলার রায়ে ১৯৩৭ সালে ১৯৮৭.৮৫ একর বনভূমি এই সংরক্ষিত বন থেকে খারিজ করে এস্টেটকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

যদিও ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে জমিদারি প্রথা বাতিলের পর ১৯৫৬ সালে এস্টেটের সকল ভূমি রাষ্ট্রায়ত্ব হয় এবং ১৯৬০ সালে এই ১৯৮৭.৮৫ একর জায়গাসহ মোট ৫৩৩৭ একর ভূমি বন বিভাগকে হস্তান্তর করা হয়।


তবে ১৯৩৮ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে খারিজ হওয়া ১৯৮৭.৮৫ একর বনভূমি সংরক্ষিত বনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে কোনো নথি পাওয়া যায় না। তবে এই ভূমিসহ এই অঞ্চলের সকল বনাঞ্চল প্রায় এক শতক ধরে বন হিসেবেই রক্ষণাবেক্ষণ করছে বন বিভাগ।

২০১৩ সালে ডিজিটাল ভূমি জরিপের সময় বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলায় অবস্থিত এই সংরক্ষিত বনের মধ্যবর্তী ২১৭৪.৩৫ একর ভূমি জেলা প্রশাসনের ‘খাস’ খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এর শ্রেণি পরিবর্তন করে বনভূমির পরিবর্তে লেখা হয় ‘টিলা রকম ভূমি’।

এই জরিপে সংরক্ষিত বনের অজরিপকৃত ভূমির সঠিক পরিমাপ ১৩৬৪৮.০১ একর পাওয়া গেলেও জরিপে মাত্র ১১৪৭৩.৬৬ একর ভূমি রেকর্ডভুক্ত হয় বন বিভাগের নামে।

সে সময় এর প্রতিবাদে বন বিভাগ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে চিঠি পাঠায়।

সিলেট বিভাগের উপ-বন সংরক্ষক এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সম্ভাব্য সকল ভুলই এই ডিজিটাল জরিপে হয়েছে। বনের সীমা অজরিপকৃত হলেও এর চৌহদ্দি নির্ধারিত ছিল, কিন্তু তারা তা বিবেচনা করেনি। তার ওপর অসৎ উদ্দেশ্যে বনের মধ্যবর্তী ভূমিকে খাস ভূমি হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং সে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে টিলা রকম ভূমি উল্লেখ করেছে। যাতে তা ইজারা দেয়া যেতে পারে।

বিষয়টি সুরাহা করতে ২০১৪ সালে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আব্দুল মান্নান এই সংরক্ষিত বন পরিদর্শন করেন। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে তিনি বন বিভাগের দাবির পক্ষে সম্মতি জানিয়ে উল্লেখ করেন যে, ভূমি জরিপে বনের শ্রেণি ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই বনাঞ্চলে ১৯৩৩ সালের পৃথিমপাশা এস্টেটের মামলায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করা ১৯৮৭.৮৫ একর ভূমিই কেবলমাত্র খাস ভূমি হিসেবে নথিভূক্ত করা যেতে পারে, বনের মধ্যবর্তী অংশ থেকে নয়।


তবে এই বনাঞ্চলের কোনো ভূমিই ইজারা দেয়া যাবে না বলেও প্রতিবেদনে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি সিলেট জোনাল সেটেলম্যান্ট অফিসকে এই ইচ্ছাকৃত ভুলের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন।

কিন্তু তার নির্দেশনার কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। বরং এর মধ্যেই তড়িঘড়ি করে এই ভূমি ‘খাস’ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে এই রেকর্ড সংশোধনের জন্য মৌলভীবাজার ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে জেলা প্রশাসন, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর ও জুড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে বন বিভাগ।

বনবিভাগ এবং পরিবেশ আন্দোলনে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় সরকারি কার্যালয়গুলোর কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে এই বনভূমি ইজারা দেয়ায় ব্যবস্থা করছেন। যা এই বনাঞ্চলকেই ধ্বংস করে দেবে।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন জানান, বনের অংশ যদি চা-বাগান সম্প্রসারণ বা অন্য যে কোনো উদ্দেশ্যে ইজারা দেয়া হয়, তাহলে তা এক সময় এই সংরক্ষিত বন এবং এর আশপাশের বিস্তীর্ণ বনভূমিকে ধ্বংস করে দেবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ডিজিটাল জরিপে সংরক্ষিত বনের এই ভূমি খাসভূমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বাণিজ্যিক চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তা ইজারা নেয়ার আগ্রহ দেখায়।

জুড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোস্তাফিজুর রহমান রহমান জানান, এখন পর্যন্ত অন্তত ১০টি পক্ষ আবেদন করেছে।

এ দিকে সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এই ভূমি দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

এ বছর জানুয়ারির ২৯ তারিখে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি প্রেরণ করলে এর প্রেক্ষিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি ভূমি সচিব বরাবর একটি চিঠি প্রেরণ করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১৪ জসীম উদ্দীন হায়দার।

এ চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যেহেতু এ জমি নিয়ে একটি মামলা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল মৌলভীবাজারে চলমান, তাই মামলা নিষ্পত্তি সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

এর আগে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জুড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) এই ভূমির পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। পরে তিনি ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে এই ভূমি পতিত, জনবসতিহীন এবং অনাবাদি হিসেবে উল্লেখ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।


সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠির প্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় গত ৯ সেপ্টেম্বর এবং ২৩ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তাদের নিয়ে দুটি বৈঠকে বসে। তবে সে বৈঠকের রেজুলেশন প্রকাশ না করায় তার সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। বৈঠকে বনের গুরুত্বপূর্ণ এই যায়গাকে লিজ না দিতে এবং বনের জায়গা বনকে ফিরিয়ে দিতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানানো হয়। বন বিভাগের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন।

তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সেই মিটিংয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মল্লিকা দে উপস্থিত ছিলেন।

মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মল্লিকা দে বলেন, বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে, তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেভাবে নির্দেশনা দেবেন আমরা তাই পালন করবো।

এ ব্যাপারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান বলেন, বনের জায়গা খাস খতিয়ানভুক্ত করা নিয়ে এ ধরণের দ্বন্দ্ব সারাদেশেই চলছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে বনের ভূমি বন বিভাগের অধীনে বন হিসেবেই ফিরে আসে।

তিনি বলেন, হারারগজ সংরক্ষিত বনের এই ভূমি সংক্রান্ত মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে এই মুহূর্তে কিছু জানা নেই। এই জায়গা ইজারা দেয়ার কোনো উদ্যোগের বিষয়েও আমি আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত না। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেট বিভাগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, যে অংশ নিয়ে এই চক্রান্ত হচ্ছে তা বনের হার্ট। যারা এখানে অতি উৎসাহী তারা বনের নয়, নিজের স্বার্থ দেখছেন। কোনোভাবেই বনের এই অংশ লিজ নিতে দেয়া যায় না। যারা এই বনের ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন তাদের সবাইকে তদন্তের মাধ্যেম শনাক্ত করা হোক। আমরা এই বন রক্ষায় প্রয়োজনে আন্দোলন করব।