নুরুল হক শিপু::গত দুই দিনে হিসাব করে চার ঘণ্টাও ঘুমাইনি। রাত এগারোটার দিকে বিছানায় এলাম। হঠাৎ মনে হলো কানের পাশটা ভেজা। চোখ মেলে হাত দিতেই দেখি- শুধু ডানপাশ না, বাম কানের পাশেও পানি জমে আছে। আমি বুঝতে পারলাম না- এ পানি কীসের? ঘাম? না কি চোখের জল?
আমার একটা বাজে অভ্যাস আছে, গভীর ঘুমেও কেউ ফোন করলে রিসিভ করি। আশফাক জুনেদ মিনিট ত্রিশেক আগে ফোন করেছিল। ঘুমের ঘরেই। কণ্ঠটা কাঁপছিল। মনে হলো সে কাঁদছে। বললো- সুমন ভাইয়ের দাফনের কথা। এতোটুকু মনে আছে, আমি বলেছিলাম- “রাগ করিস না ভাই… দুই দিন ঘুমাইনি।” এরপর আবার গভীর ঘুম। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙতেই দেখি কানের পাশটা আবার ভেজা ভেজা। এবার আর সন্দেহ নেই অনর্গল পানি পড়ছে। কীসের জল? কার জন্য? আশফাকের ফোন সুমন ভাইয়ের দাফন! তাই তো- এখন তিনি অন্ধকার কবরে শুয়ে আছেন? ভাবতেই শরীরটা শিরশির করে উঠলো আমার! অন্ধকার কবরে একা একা কী করছেন সুমন ভাই? তাঁকে তো সাদা কাপড়ে মোড়ানো হয়েছে…আচ্ছা, তিনি কি ভয় পাচ্ছেন? বিদায়ের দিন তো হাজার হাজার মানুষ তাঁর সাথে গিয়েছিল। সম্মান দিয়ে কাঁধে করে তাঁকে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু যারা গিয়েছিল, তারা সবাই কীভাবে এত স্বার্থপর হয়ে এই মানুষটাকে একা একটি অন্ধকার ঘরে রেখে চলে এলো? সুমন ভাই কি একা থাকার মানুষ ছিলেন? নানা প্রশ্ন! আমাদের অনেকের ঘুম কেড়ে নিয়ে, আপনি কি খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন সুমন ভাই?
একটা গল্প বলে শেষ করি।
সুমন ভাই মাঝে মাঝেই আমার ঘরে আসতেন। যেদিন সময় পেতেন, আমাকে নিয়ে রাতে বের হতেন। বার্মিংহাম শহর ঘুরতাম, নির্ভেজাল আড্ডা, গল্প, হাসি। তিনি আমার স্ত্রী ইমাকে খুব পছন্দ করতেন। ছোটবোনের মতো ‘তুই’ বলে ডাকতেন। সুমন ভাই তেমন চা-পাগল মানুষ ছিলেন না, কিন্তু সিগারেট একটু বেশিই খেতেন। গাড়ি চালাতে চালাতেও সিগারেট টানতেন। গাড়ির ভেতরে কেউ সিগারেট খেলে আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। একদিন বলেই ফেললাম- আপনি এত সিগারেট খান, আমি আর আপনার সাথে বের হবো না। রাগারাগি হলো। রাত প্রায় দুইটার দিকে তিনি ঘরে এলেন। আমি ভাবলাম! ইমা নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে। নিচে এসেই ডাক- “ও ইমা… ইমা… নিচে আয় গো বইন। বেজার অইছ না? ভাইয়ে তোর ঘুম ভাঙাইলাইছি।” ইমার সোজাসাপটা উত্তর? জি না ভাই, আমি তো হজাগ আছলাম। চা দেই?” আমার ডান পাশে বসে তিনি চা খেলেন। হেসে বললেন, “ওই দেখ, আমার বইন মনের কথা বুঝিলাইছে।” আমি অবাক। তাহলে সুমন ভাই ইমার হাতের চা খেতে আসছেন!
আমার আরেকটা বাজে স্বভাব আছে! কারো ওপর খুব রাগ হলে ব্লক মেরে দেই। সুমন ভাই আসার আগে ফোন করে আসতেন। একদিন দুপুরে হঠাৎ সুমন ভাই এলেন। অনেক কথা হচ্ছিল। ইমা ভাত রেডি করছে। সুমন ভাই খাবেন না, আর ইমা না খাইয়ে ছাড়বে না। বললেন- “এখন একটা কাজে যাবো, এখন খেলে কাজ করতে পারবো না। আমি তো শুধু আমার বইনরে দেখাত আইছি, চা খাইয়া যাইমু।” কথা ঘুরে গেল আমার নেগেটিভ সাইডে। সুমন ভাই আর ইমা, দুজন মিলে আমাকে তুলোধুনা করলেন। আমি ভেতরে ভেতরে ফুসছিলাম। রাগে দুজনকেই ব্লক মেরে দিলাম। তিন দিন ফোনে না পেয়ে সুমন ভাই সোজা ঘরে চলে এলেন। দুজন আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছেন। আর সেই হাসিই আমার রাগ বাড়াচ্ছে। হঠাৎ তিনি জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, সবই পরিকল্পনা। সব সমাধান হলো। গল্প হলো। খাওয়া-দাওয়া হলো। ফোনও আনব্লক হলো।
সুমন ভাই দেশ থেকে ফিরলে, আমি, ইমা, আমার মেয়ে, সিআইপি কায়সার ভাই- একসাথে রেস্টুরেন্টে খাবো! এই কথা ছিল সুমন ভাইয়ের। আমরা বেঁচে থাকলে রেস্টুরেন্টে আরো অনেক খাবো। কিন্তু সুমন ভাই তো আর ফিরবেন না। তিনি যেদেশে গেছেন, সেই দেশে যাওয়া যায়, কিন্তু সেখান থেকে আর ফেরা যায় না।
ঘুম ভাঙার পর এই লেখা লিখছি। আর ভাবছি! একদিন কি সুমন ভাইকে ভুলে যাব? না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বেঁচে থাকলে কখনো ভুলবো না তাঁকে। সুমন ভাই আমাকে যে ফ্রিজটা গিফট করেছিলেন, সেটা আজও আমার ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। যতোদিন ব্রিটেনে থাকবো, যদি বেঁচে থাকি, এই ফ্রিজটি আমি সংরক্ষণ করে রাখবো। ফ্রিজটার কাছে গেলেই মনে হবে, এই তো… আমার সুমন ভাইয়ের স্মৃতি দাঁড়িয়ে আছে। যে স্মৃতির গায়ে আজও লেগে আছে সুমন ভাইয়ের পরশ। কথা দিলাম- যতোদিন বেঁচে থাকবো, ততোদিন মনে রাখবো সুমন ভাই।
নুরুল হক শিপু
যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক




