আশফাক জুনেদ:: ইন্টারভিউ নেওয়ার আগের রাতে প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় আমাদের কথা হয়। সুমন ভাই ভীষণ ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। আমি বলেছিলাম, “ভাই, আপনাকে নিয়ে একটা এপিসোড করবো।” তিনি রাজি হলেন। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাকে কথায় থামিয়ে রাখা যেত না।
ইন্টারভিউর আগে আমি তাকে জানাইনি কোন বিষয়ে কথা হবে। কিন্তু সুমন ভাই অনর্গল কথা বলে গেলেন। আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনছিলাম। ব্রিটেনে হাতে গোনা কয়েকজন টিভি সাংবাদিকের মধ্যে সুমন ভাই ছিলেন একজন। কথা ছিল, তিনি আমাকে ব্রিটেনের সেরা টিভি সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলবেন। দেশ থেকে ফিরে আমাকে আর শিপু ভাইকে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবেন। ব্রিটেনের আমাদের প্রতিষ্ঠিত করবেন।
কিন্তু সেই কথা আর রাখা হলো না। সুমন ভাই চলে গেলেন জীবনের ওপারে—যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না।
সুমন ভাই ছিলেন স্পষ্টবাদী মানুষ। আমাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। রাজনীতি ও সমাজনীতি নিয়ে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি ছিলেন মুক্তমনের মানুষ। আমাকে পছন্দ করার কারণ হিসেবে বলতেন আমিও নাকি তার মতো মুক্তমনের। প্রতিটি কাজে আমাকে উৎসাহ দিতেন। বলতেন, “তুমি শুরু করো, তুমি পারবে। নিজের ভিতরের জড়তা দূর করে শুরু করো—দেখবে কেউ তোমাকে আটকাতে পারবে না।”
যুক্তরাজ্যে আসার পরই তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। প্রথম দেখা হওয়ার পরই তিনি আমাকে বাসায় নিয়ে যান। ভাবিসহ আমরা রেস্টুরেন্টে যাই। এরপর অনেকবার তার বাসায় গেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছি। সুমন ভাই খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতেন।
বার্মিংহাম কমিউনিটির সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেন তিনিই। এরপর ধীরে ধীরে সবার সাথে সখ্য গড়ে ওঠে। সুমন ভাইকে এতো মানুষ ভালোবাসতেন—তা তার মৃত্যুর পর বুঝতে পেরেছি। আমি ভাবতাম, তার স্পষ্টবাদিতা হয়তো তাকে অনেকের অপছন্দের মানুষ বানিয়েছে। কিন্তু না—তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে পুরো ব্রিটেনজুড়ে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া।
আমাকে নিয়ে একদিন পুরো বার্মিংহাম ঘুরবেন—এই কথা ছিল তার। প্রথম যেদিন আমাকে বাসায় নামিয়ে দিচ্ছিলেন, বললেন, “কিছু ঝামেলা আছে, শেষ করে নেই। তারপর তোমাকে নিয়ে একদিন পুরো বার্মিংহাম ঘুরবো।” কিন্তু সেই দিন আর আসেনি। ঝটিকা আড্ডা হয়েছে বহুবার, কিন্তু পুরোদিন একসাথে ঘোরা হয়নি।
একদিন রাত দুইটায় তার ফোন। কথা বলতে বলতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, শেক্সপিয়ারের বাড়ি কীভাবে যাওয়া যায়?”
তিনি বললেন, “আমার কিছু কাজ আছে, শেষ করি। তোমাকে নিয়ে আমি নিজেই যাবো।”
এরপর কেটে গেল কয়েক মাস।
দেশে যাওয়ার দুইদিন আগে আবার কথা হয়। আমি বললাম, “ভাই, শেক্সপিয়ারের বাড়ি যাওয়া তো হলো না।”
তিনি হেসে বললেন, “এবার দেশ থেকে ফিরেই তোমাকে নিয়ে যাবো।”
কিন্তু তিনি আর ফিরলেন না।
এখন আমাকে শেক্সপিয়ারের বাড়ি কে নিয়ে যাবে? হয়তো জীবনে কোনোদিন সেখানে যাওয়া হবে, কিন্তু সুমন ভাইয়ের সাথে আর যাওয়া হবে না।
সারা জীবন সাংবাদিকতায় কাটালেও জীবনের শেষ সময়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন। মৌলভীবাজার-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাসির উদ্দীন মিঠুকে জয়ী করাতে দেশে গেলেন। যাওয়ার আগে আমাকে বললেন,
“আশফাক, দেশে গিয়ে একটা মোটর শোডাউন দিবো। তুমি কী বলো?”
আমি বললাম, “ভাই, দেন।”
বড়লেখা ও সেখানকার রাজনীতি নিয়ে আমাদের নিয়মিত কথা হতো। তিনি বিএনপির সমালোচনাও করতেন। দলের অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। তবে মিঠু ভাইয়ের প্রশংসা করতেন খুব। কেন বড়লেখায় মিঠু ভাই দরকার তা বুঝিয়ে বলতেন। আমি কখনও তার নেতিবাচক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুললে, খুব সহজ ভাষায় উত্তর দিতেন। তাকে কথায় হারানো যেত না।
সুমন ভাইয়ের সাথে হাজারো স্মৃতি, হাজারো কথা সব আজ স্মৃতির ভাঁজে। আমাদের সুমন ভাই চলে গেছেন তার শেষ ঠিকানায়। তিনি আর ফিরবেন না।
তার জন্য বুকের ভেতর এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে যা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
সুমন ভাই বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।
নীরবে, গভীরভাবে।
ভালো থাকুন, সুমন ভাই।
আপনার জন্য অনেক অনেক শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
লেখক
যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক





