মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:: মৌলভীবাজার জেলার চা বাগানে পর্যটকের ঢল নেমেছে। ঈদ-উল-ফিতরের টানা ছুটিতে এসেছেন হাজারও পর্যটক। দেশি-বিদেশি মিলে মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৯৩টি চা-বাগান ও শতাধিক পর্যটন স্পট।
ঈদ-উল-ফিতরের দিন থেকেই মৌলভীবাজার জেলায় পর্যটক আসতে শুরু করে। জেলায় দুইশ হোটেল-মোটেল ও কটেজে কোনো কক্ষই খালি নেই। ফলে রাত্রিযাপনে পর্যটকদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
বুধবার (২ এপ্রিল) সারাদিন বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা মোহাম্মদ জাকারিয়া কাঞ্চন ও সাদিয়া সিকদার (নিশি কাঞ্চন) বলেন, ঢাকা শহরের কোলাহল ছেড়ে এ রকম সুন্দর জায়গায় আসা। আসলে প্রকৃতিকে কাছে পাই না রাজধানী ঢাকায়। তাই মাঝে মধ্যে সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসি।
সাইফুল আলম ও এ্যানি বেগম দম্পতি বলেন, এখানে ঘুরতে আসার মজাই আলাদা। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল চা বাগানের সৌন্দর্য আমাদের কাছে অন্যরকম প্রশান্তি।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রীমঙ্গলে ঈদের দিন থেকে হাজারও পর্যটক আসায় হোটেল, রেস্টুরেন্ট আর চা বাগান লোকে লোকারণ্য। পুরো এলাকা জুড়ে পর্যটকের বিচরণ। যারা হোটেলের কক্ষ বুকিং না দিয়ে এসেছেন, তাদেরই কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
পর্যটকরা বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলে হৈ-হুল্লোড় করে ছুটে চলেছেন বিভিন্ন স্পটে।
বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসেছেন শহিদুল ইসলাম ও রিপন মিয়া । তারা বলেন, এই প্রথম মাধকুণ্ডে এসেছি। এখানকার পরিবেশ খুবই সুন্দর। অন্য এলাকার চেয়ে সিলেট ও মৌলভীবাজারে অনেক সুন্দর সুন্দর পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে।
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের প্রধান ফটকের কাউন্টারে থাকা জলপ্রপাত ইজারাদার কর্তৃপক্ষের কর্মচারী সাজু আহমদ বলেন, “এবার পর্যটক কিছুটা কম। ঈদের দিন ২,৫০০ জন, পরদিন মঙ্গলবার ১,৫০০ জন আর বুধবার ২,০০০ একটু বেশি পর্যটক এসেছেন। তবে ছুটি আরও আছে। তাই পর্যটক সমাগম বাড়বে বলে আশা করছি।”
হাওর,পাহাড়, নদী, টিলায় ঘেরা মৌলভীবাজার জেলায় প্রকৃতি একেক ঋতুতে একেক রূপের জানান দেয়। চা গাছে নতুন কুঁড়িতে সৌন্দর্যের মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সবুজ গালিচা মোড়ানো চা-বাগান। প্রকৃতির এমন সান্নিধ্য পেতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারও পর্যটক। বিশেষ করে জেলার শ্রীমঙ্গলে সবুজের বিশাল এই বিস্তারে ঘেরা সারি সারি চা বাগানের একটি পাতা দু’টি কুঁড়ির অপূর্ব সম্মিলন। দৃষ্টি সীমানা জুড়ে কেবলই প্রশান্তি।
শ্রীমঙ্গলে পুরো এলাকা জুড়ে চা বাগান। আর চা বাগানের মাঝ দিয়ে পিচঢালা পথটি যেন আরও কয়েকগুণ সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। সবুজ গালিচা মোড়ানো আশেপাশের পাহাড় আর মনকাড়া পাহাড়ি ঢালু পথ। এই পথ মাড়িয়ে যেদিকে চোখ যাবে শুধু সবুজ আর সবুজ। সেইসঙ্গে পাহাড়ি পথ বেয়ে চা বাগানের ভেতর দিয়ে নেমে এসেছে ক্ষীণ স্বচ্ছ জলের ছড়া।
জেলায় পর্যটন স্পটগুলোতে নেমেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের ঢল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পর পর্যটকদের কেনাকাটার জন্য রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ পাহাড়ি ত্রিপুরা-মনিপুরী সম্প্রদায়ের হাতের তৈরি কাপড়ের একাধিক স্টল।
মৌলভীবাজার জেলায় পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওর ও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাইক্কা বিল হাইল হাওর, বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডশন, বধ্যভূমি ৭১, বিটিআরআই চা বাগান এলাকা, রাবার বাগান, সাত লেয়ারের চা, মনিপুরি পাড়া ও পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ, টি বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন টি রিসোর্ট অ্যান্ড টি মিউজিয়াম, কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, হাম হাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক, আনারস ও লেবু বাগান এই জেলায় পর্যটকের প্রধান আকর্ষণ।
বন বিভাগের বড়লেখা রেঞ্জের সহযোগী রেঞ্জ কর্মকর্তা রবীন্দ্র কুমার সিংহ বলেন, “পর্যটকরা নির্বিঘ্নে মাধবকুণ্ডে আনন্দ উপভোগ করছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য পর্যটন পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি বন বিভাগ ও ইজারাদার পক্ষের লোকজন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।”
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে র্যাব, সাদাপোশাকে ট্যুরিস্ট পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। পর্যটকরা যেন নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পারেন, সেভাবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি আমরা।”