শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



হাকালুকির টর্নেডো: এ ধরনের টর্নেডো সামনে আরও বাড়বে, ভূমিতে আঘাত হানলে বিপদ



বিজ্ঞাপন

লাতু ডেস্ক:: হাকালুকি হাওরের বিস্ময়কর টর্নেডো নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে সর্বত্র। আবহাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, এমন ঘটনা আগামীতে আরো বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমনটি হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

শনিবার হাকালুকি হাওরের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পরে ফেসবুকে। ভিডিও দেখে মনে হচ্ছে, হাওর থেকে পাইপ দিয়ে পানি উঠে যাচ্ছে আকাশে।

এই ভিডিও শেয়ার দিয়ে অনেকেই এমন ঘটনাটে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃিত বলছেন। তবে আবহাওয়া অফিস বলছে- টর্ণেডোর কারণে এমনটি ঘটেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান। দুই যুগ ধরে ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, টর্নেডো ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অবশ্যই একটি শক্তিশালী টর্নেডো ছিল। আমরা সাধারণত স্থলভাগে টর্নেডোর কথা শুনে অভ্যস্ত। কিন্তু আমাদের জলাভূমিগুলোয় এ ধরনের টর্নেডো আঘাত হেনে থাকে। দেশের উপকূলীয় এলাকা, বঙ্গোপসাগর ও জলাভূমিগুলোয় প্রায় প্রতিবছর ছোট ছোট টর্নেডো আঘাত হানার তথ্য আমরা পাই। তবে অন্য টর্নেডোর তুলনায় হাকালুকির টর্নেডোটি বেশ ব্যতিক্রম ছিল। এর ফানেলটির দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ৫০০ মিটার বা আধা কিলোমিটার বলে মনে হয়েছে।

একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাতকারে আব্দুল মান্নান আরও বলেন, এমনিতেই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাব আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাচ্ছি। গত জুন মাসে আমরা ভারতের চেরাপুঞ্জিতে এক দিনে প্রায় এক হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত দেখেছি। দেশের ভেতরেও অনেক স্থানে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। এরপর আমরা দেখলাম ভরা বর্ষা মৌসুমে টানা দাবদাহ। তার মানে, আবহাওয়ায় অস্বাভাবিক সব ঘটনা ঘটছে। এ টর্নেডোও তার একটি উদাহরণ। দাবদাহের কারণে সিলেটের হাওর এলাকাগুলোয় এমনিতেই তাপমাত্রা বেশি ছিল। এ কারণে জলীয় বাষ্প দ্রুত ওপরের দিকে উঠে গিয়ে শূন্যতা তৈরি হয়। আর আকাশে মেঘ থাকায় প্রচুর জলীয় বাষ্প নিয়ে টর্নেডোটি আঘাত হানে।

পানিতেই এই টর্নেডোর অবস্থান সম্পর্কে আবদুল মান্নান বলেন,এ টর্নেডো মূলত পানিতে আঘাত হেনে প্রায় তিন মিনিট স্থায়ী হয়ে তারপর দুর্বল হয়ে যায়। ভূমিতে না ওঠার কারণ হচ্ছে হাওরের বিশেষ ধরনের ভূপ্রকৃতি। এখানে পানির গভীরতা কম থাকে। পানির সামান্য নিচে কাদামাটির স্তর ছিল। যে কারণে পানিতে আঘাত হেনে তা ওই কাদামাটি পর্যন্ত পৌঁছানোর পর সেখানে সম্ভবত গর্ত করে শক্তি ক্ষয় করে ফেলে। যে কারণে টর্নেডোটি একটি নির্দিষ্ট স্থানে ছিল বলে মনে হয়েছে। বাতাসের ওই ঘূর্ণির সঙ্গে তৃণ, মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী টানেল দিয়ে ওপরের দিকে উঠে পড়ার কথা। তবে এটি দুর্বল হওয়ার পর সেগুলো আবারও নিচে নেমে যায়।

এটি ভূমিতে আঘাত করলে কী হতে পারত এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল মান্নান বলেন, এটি ভূমিতে আঘাত হানলে জীবন ও সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় ১৯৮৯ সালে ২৬ এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়ংকর টর্নেডো আঘাত হানে। সেখানে হাজারখানেক মানুষ প্রাণ হারায়। লাখখানেক মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস হয়। এরপর আমরা ২০১৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ২০১৪ সালে নেত্রকোনায় টর্নেডো আঘাত হানতে দেখেছি। এ কারণে ভূমিতে আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হতো।

তিনি বলেন, গত এক যুগে দেশে টর্নেডোর আঘাত হানার প্রবণতা বেড়েছে। আগে সাধারণত আমরা চার থেকে পাঁচ বছর পরপর টর্নেডো আঘাত হানতে দেখেছি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমরা দেখছি, প্রায় প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো টর্নেডো আঘাত হানছে। এতে স্থানীয়ভাবে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে জলজ টর্নেডোর পরিমাণ বেড়ে যেতে দেখছি। আর টর্নেডোর পূর্বাভাস এখনো সঠিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আমাদের টর্নেডোর ক্ষতি মোকাবিলার উপযোগী করে বাড়িঘর নির্মাণ করতে হবে। আর কোথাও টর্নেডো শুরু হলে পাকা ভবন ও শক্তিশালী কোনো অবকাঠামোর মধ্যে আশ্রয় নিতে হবে। সূত্র: প্রথম আলো