শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



বর্ণিল উৎসবে খুললো স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দুয়ার



বিজ্ঞাপন

লাতু ডেস্ক:: স্বপ্ন আর বাস্তবতা মিলিত হলো এক বিন্দুতে। খুলল দখিনা দুয়ার। পদ্মা সেতুর দুয়ার খুললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু চালুর মধ্য দিয়ে রাজধানীর সঙ্গে সংযোগ ঘটল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার। খুলে গেল সংযোগ, যোগাযোগ এবং সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে উচ্চারিত হলো, ‘অনেক বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে, ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে আজ পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে। এই সেতু শুধু সেতু শুধু ইট-সিমেন্ট-কংক্রিটের কাঠামো নয়; এই সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব। সক্ষমতার প্রতীক, মর্যাদার প্রতীক।’

রবিবার ভোর ৬টা থেকে সর্বসাধারণের যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে স্বপ্নের সেতু। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের ঐতিহাসিক দিনে যার যার অবস্থান থেকে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে মাওয়া প্রান্তে আয়োজন করা হয় সুধী সমাবেশ। সকাল ৯টার আগ থেকেই সুধী সমাবেশে আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করেন। ১০টার আগেই আসন গ্রহণ করেন তারা। সুধী সমাবেশে সরকারের মন্ত্রী, স্পিকার, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদসহ বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। সকাল ১০টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে জ্বলজ্বল করছিল ‘আমার টাকায় আমার সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু’ কিংবা ‘পদ্মা সেতু নির্মাণ, শেখ হাসিনার অবদান’-এর মতো নানা স্লোগান। ১৯৯৮ সালে প্রাক-সমীক্ষা শুরুর পর পদে পদে বাধার শিকার হয় এ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ। সমস্ত বাধার দেয়াল ডিঙিয়ে তৈরি করা বিস্ময়ের প্রতীক পদ্মা সেতু।

শনিবার দুপুর ১২টার একটু আগে সুইচ টিপে সেতুর ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেতু উদ্বোধনের আগে মাওয়া প্রান্তে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন তিনি। এরপর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর মাওয়া প্রান্তের সেতুর ফলকের দিকে এগোতে থাকে। সেখানে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রীসহ অতিথিরা গাড়ি থেকে নামেন। সেখানে প্রথমে মোনাজাত করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম মোনাজাত পরিচালনা করেন।

সেতু উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। প্রধানমন্ত্রী মেয়ে সায়মা ওয়াজেদও এ সময় সঙ্গে ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী সেতুর ফলক উন্মোচনের পাশাপাশি ফলকের স্থানে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার ম্যুরাল উদ্বোধন করেন। এ সময় আকাশে রঙিন ধোঁয়া ওড়ানো হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেন। উপস্থিত সবাই হাততালি দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর আবার সেতুতে ওঠে। সেতু পাড়ি দিয়ে তিনি জাজিরা প্রান্তে যান।

সুধী সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম পদ্মা সেতুর নির্মাণবিষয়ক সূচনা বক্তৃতা করেন। তিনি প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (কারিগরি) মো. কামরুজ্জামান, নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের ও প্রজেক্ট ম্যানেজার অ্যান্ড সুপারভিশন কনসালটেন্ট ররার্ট জন এভিসসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পদ্মা সেতুর ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর কামরুজ্জামান প্রায় এক বছর ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের তারিখ পেছাচ্ছেন। কারণ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে কাজ ফেলে তিনি কোনোমতেই যেতে চান না।

দেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের জমকালো উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী স্মারক ডাকটিকিট, স্যুভেনির শিট, উদ্বোধনী খাম এবং বিশেষ সিলমোহর উন্মোচন করেন। এ সময় মঞ্চে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, ডাকসচিব খলিলুর রহমান এবং ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফয়জুল আজিম উপস্থিত ছিলেন। এরপর পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০০ টাকার বিশেষ স্মারক নোট উন্মোচন করেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে সেতুসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তোলেন। পদ্মা সেতুর নির্মাণকারক কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে পদ্মা সেতুর একটি রেপ্লিকাও উপহার দেওয়া হয়।

এরপরই প্রধানমন্ত্রী প্রথম ব্যক্তি হিসেবে টোল দিয়ে সেতুর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচন করেন এবং মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা এবং বাংলাদেশের অটিজম আন্দোলনের পথিকৃৎ সায়মা ওয়াজেদ এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার গাড়িবহর নিয়ে অতিক্রমের সময় সেতুটির মাঝ বরাবর নেমে সেতু এবং প্রমত্ত পদ্মার উত্তাল তরঙ্গ প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় তিনি বিমানবাহিনীর একটি মনোজ্ঞ ডিসপ্লেও উপভোগ করেন।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, ‘মানুষের শক্তি বড় শক্তি, সেই শক্তি নিয়েই পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করেছিলাম। জনগণই আমার সাহসের ঠিকানা। পদ্মা সেতু সফলভাবে নির্মাণের জন্য জনগণকে স্যালুট জানাই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের কারণে এই সেতু নির্মাণ দুই বছর বিলম্বিত হয়। কিন্তু আমরা কখনো হতোদ্যম হইনি, হতাশ হইনি। এবং শেষ পর্যন্ত সব অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর পথে যাত্রা করতে সক্ষম হয়েছি। আজকে পদ্মার বুকে লাল-নীল আলোর ঝলকানি। ৪২টি স্তম্ভ, এই স্তম্ভ যেন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।’

প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ যারা মারা গেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত এবং আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকের মন্তব্য ছিল, নিজস্ব অর্থায়নে আবার কিভাবে করব? ধারণা ছিল এই বাংলাদেশ সারাজীবন পরনির্ভরশীল থাকবে, আর অন্যের দয়ার ওপরই চলতে হবে। জাতির পিতা আমাদের শিখিয়েছেন আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশের জনগণের প্রতি। সেদিন তারা শুধু আমার পাশে দাঁড়াননি, অনেকে অর্থ পর্যন্ত দিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, আমরা বাজেট থেকে করতে পারব, ওটাও তো জনগণেরই টাকা। আল্লাহর রহমতে আমরা সেটাই করেছি।’

১৯৯৭ সালে জাপান সফরকালে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তার পরই প্রাক-সমীক্ষার কাজ শুরু। নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর উদ্বোধন হলো গতকাল। এ উপলক্ষে মাওয়া থেকে জাজিরা দুই প্রান্তেই আয়োজন করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠানের। মাওয়া প্রান্তের সুধী সমাবেশ দিয়ে শুরু, মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা এবং শিবচরের কাঁঠালবাড়ীতে জনসমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উদ্বোধনী পর্ব। সমাবেশে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন।