বুধবার, ২৯ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



সিলেটে কমছে পানি, বাড়ছে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি



বিজ্ঞাপন

লাতু ডেস্ক:: সিলেটে বন্যার পানি কমেছে, ঘরে ফিরছে মানুষ। কিন্তু স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ার সুযোগ কোথাও নেই তাদের। কয়েকদিন ধরে জমে থাকা বন্যার পানি আর ময়লা-আবর্জনা মিলেমিশে পচে গিয়ে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বানভাসির। এদিকে নগরে পানি কিছুটা কমলেও কমেনি বন্যাকবলিতদের দুর্ভোগ। বিদ্যুৎ ও গ্যাসহীনতা, খাবার পানির সংকটের পাশাপাশি উপদ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ। বেড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। এসব রোগীদের সেবায় ১৪০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সিলেটে বন্যায় মারা গেছেন ৬ জন।

চলতি মাসের ১০ তারিখ থেকে সিলেটে শুরু হয় ভারী বর্ষণ। একই সময়ে ভারতের মেঘালয়, আসাম প্রভৃতি রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয়ও প্রবল বর্ষণ হয়। টানা বৃষ্টি আর ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে নেমে আসা ঢলে সিলেটে দেখা দেয় বন্যা। শুরুতে সিলেট সদর, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। ধীরে ধীরে ভয়াল রূপ নেয় বন্যা। প্রায় পুরো সিলেট জেলাতেই ছড়িয়ে পড়ে বন্যার পানি। ভরা যৌবনে ফুঁসতে থাকে সিলেটে নদ-নদীগুলো। সুরমা ও কুশিয়ারার পানি উপচেপড়ে তীরবর্তী সব এলাকায়। সুরমার পানিতে ঢুকে পড়ে সিলেট নগরে। গত মঙ্গলবার থেকে তলিয়ে যেতে থাকে নগরের বিভিন্ন এলাকা। এসব এলাকার অসংখ্য মানুষ আশ্রয় নেন নিজেদের নিকটাত্মীয়ের বাসায় কিংবা সিটি করপোরেশনের আশ্রয়কেন্দ্রে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টি কমে আসায় ও উজানের ঢলের বেগ কমে যাওয়ায় গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে বন্যার পানি। শনিবার ও রবিবার মিলে নগরের সিংহভাগ এলাকা থেকেই পানি নেমে যায়। তবে অনেক পাড়া-মহল্লায় গলি-ঘুপচিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত না থাকায় কিছু পানি জমে আছে। পানি নেমে যাওয়ায় নিজেদের বাসা-বাড়িতে ফিরছেন নগরবাসী। কিন্তু বাসা-বাড়িতে গিয়ে স্বস্তি নেই তাদের। কয়েকদিন বন্যার পানির সাথে ময়লা-আবর্জনা জমে থেকে পচে গেছে। অনেক স্থানে খানাখন্দ বা ড্রেনে জমে থাকা পানি পচে গিয়ে কালো রং ধারণ করেছে। পচে যাওয়া আবর্জনা ও পানি থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।

নগরের বন্যা কবলিত এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ব্লিচিং পাউডার দিয়ে তারা এখন নিজেদের বাসা-বাড়ি পরিষ্কার করছেন। আসবাবপত্র ধোঁয়ামোছার কাজও চলছে। যাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছিল, তারাও এখন পরিষ্কারকরণে ব্যস্ত।

নগরের ঘাসিটুলার বাসিন্দা বাদশা মিয়াসহ বেশ কয়েকজন সিসিকের কাছে দাবি করে বলেন, যেসব এলাকায় বন্যার পানি ছিল সেসব এলাকার ড্রেনগুলো দ্রুত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একইসাথে এসব এলাকার সড়কে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে পরিষ্কার করলে দুর্গন্ধ কমবে। সে ব্যাপারে সিসিকের নজর দেয়া উচিত।

তারা আরও বলেন এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন আমাদের কোনে ধরনের সহায়তা করেনি। যদিও আমাদের কাউন্সিলর নিজ উদ্যোগে কিছুটা করেছেন।

এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমরা সরকার থেকে কোনো বরাদ্দ পাইনি। তবে যাঁরা ত্রাণ পাওয়ার যোগ্য তাদের চিহৃিত করে সহযোগিতা করা হবে।

সিসিক মেয়র আরও বলেন, ‘নগরের যেসব এলাকায় পানি উঠেছে সেসব এলাকায় জীবাণুনাশক স্প্রে ও ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দেব। এজন্য আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামবো।’

এদিকে, বন্যাকবলিত লোকজনের মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগের লক্ষ্মণ দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে সিলেট জেলা ও মহানগরে ১১৪ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আর ৬ জনের শরীরে চর্ম রোগ সনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও বন্যায় ৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ৫ জন পানিতে ডুবে ১ জন মাটিচাপায় মারা যান। পানিবাহিত রোগ যাতে ছড়িয়ে না যায় তারজন্য সিলেট জেলা ও মহানগরে ১৪০ টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহ শহরের বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প তৈরি করে সেবা দিচ্ছে। এছাড়া বন্যাকবলিতদের মধ্যে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ করছেন।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে সিলেট জেলার সিভিল সার্জন ডা. এস এম শাহরিয়ার রোববার বিকেল পৌনে পাঁচটায় বলেন, ‘বন্যার কারণে পানিবাহিত রোগ বেড়েছে। শতাধিক লোক ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ৬ জন চর্ম রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মেডিকেল টিম ইউনিয়ন পর্যায় থেকে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে। যাতে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে না পরে।’

অপরদিকে, সিলেটের নদনদীর পানি দ্রুত কমছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জানিয়েছে। পাউবো জানায়, সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে শনিবার বিকেল ৩টায় ছিল ১৩.৫৮ মিটার, রোববার দুপুর ১২টায় ১৩.৪৬ মিটার। এ নদীর পানি সিলেট পয়েন্টে শনিবার বিকাল ৩টায় ছিল ১০.৯৭ মিটার, আর রোববার দুপুর ১২টায় ১০.৯১ মিটার। সুরমার এই দুই পয়েন্টে পানি কমলেও এখনও বিপদসীমার উপরে রয়েছে।

কুশিয়ারা নদীর আমলশিদ পয়েন্টে শনিবার বিকেল ৩টায় পানিসীমা ছিল ১৬.৯১ মিটার, আর রোববার দুপুর ১২টায় ১৬.৭২ মিটার। এ নদীর পানি কমেছে শেওলা পয়েন্টেও। এখানে শনিবার বিকেল ৩টায় ছিল ১৩.৫৯ মিটার, রোববার দুপুর ১২টায় ১৩.৫১ মিটার। এখনও এ নদীর পানি দুই পয়েন্টে বিপদসীমার উপরে রয়েছে। তবে কুশিয়ারা নদীর শেরপুর ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বেড়েছে। শেরপুরে শনিবার বিকেলে ছিল ৭.৯৪ মিটার, রোববার দুপুর ১২টায় সেখানের পানিসীমা ৮.০০ মিটার। ফেঞ্চুগঞ্জে শনিবার বিকেলে ছিল ৯.৮৩ মিটার আর রোববার দুপুর ১২টায় ৯.৯৪ মিটার।

লোভা নদীর পানি শনিবার বিকেলে ছিল ১৩.৮৬ মিটার, রোববার তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩.৭২ মিটারে। সারি নদীর পানি শনিবারে বিকেলে ছিল ১০.৯১ মিটার, রোববার দুপুর ১২টায় সেখানের পানিসীমা কমে দাঁড়িয়েছে ১০.৬৫ মিটারে। এছাড়া ধলাই নদীর পানিও কমেছে। এ নদীর পানিসীমা শনিবার বিকেলে ছিল ১০.৬৬ মিটার, রোববার দুপুর ১২টায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০.৩৯ পয়েন্টে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমদ বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। পানি দ্রুত নেমে যেতে শুরু করেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুতই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।’