সোমবার, ২৩ মে ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



কেমন ছিল ভাগ্যবঞ্চিতদের ইউরোপ যাত্রা



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: যুদ্ধ, দারিদ্র্যকবলিত দেশগুলোর ভাগ্যবঞ্চিত মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে পাড়ি জমাচ্ছে উন্নত বিশ্বে। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান টার্গেট ইউরোপ। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো কি তাদেরকে সাদরে বরণ করে নিচ্ছে! তারা নিজেদের দরজাকে বন্ধ করে দিচ্ছে। শরণার্থী হয়ে যাওয়া মানুষগুলো অবর্ণনীয় অবস্থায় বনে-জঙ্গলে, অসহনীয় ঠাণ্ডায় দিনাতিপাত করছে। এসব মানুষকে তাদের সীমান্তে প্রবেশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন আইন করছে। এখানে এ বছর ইউরোপে অভিবাসী ইস্যুতে কি কি ঘটেছে তার ওপর আলোকপাত করা হলো।

মার্চ: গ্রিস, সাইপ্রাস, মাল্টা, ইতালি এবং স্পেনের অভিবাসন বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা এথেন্সে বৈঠকে মিলিত হন। তারা সীমান্ত কড়াকড়ি করার আহ্বান জানালেন।

একই সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে এমন একটি মেকানিজম গ্রহণ করতে বললেন, যাতে অভিবাসী ও শরণার্থীদের তাদের স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানো যায়। ২৯ ও ৩০শে মার্চ ইউরোপিয়ান স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিশনার ইলভা জনসন প্রথমবারের মতো সামোস এবং লেসবসে অবস্থিত রিসেফশন অ্যান্ড আইডেন্টিফিকেশন সেন্টার পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি লেসবস এবং চিওসে নতুন নতুন শরণার্থী ক্যাম্প নির্মাণের জন্য ১৫ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুমোদন দেন। উপরন্তু ২০২০ সালে সামোস, লেরোস, কোসে নতুন শিবির নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১২ কোটি ১০ লাখ ইউরো। একই সঙ্গে তুরস্ক সীমান্তের কাছে ফাইলাকিওতে রিসেপশন সেন্টার বিস্তৃতকরণে ২ কোটি ২০ লাখ ইউরো অনুমোদন দেয়া হয়।

এপ্রিল: ২২শে এপ্রিল লিবিয়া উপকূলে একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়। এতে মারা যান ১৩০ জন। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী জাহাজ ওসিন ভাইকিং পানি থেকে উদ্ধার করে আরও কয়েক ডজন মৃতদেহ। লেসবোসে কারা টেপে শরণার্থী শিবির ২৪শে এপ্রিল বন্ধ করে দেয় গ্রিস। সেখানে থাকা কয়েক শত শরণার্থীকে নিয়ে রাখা হয় তাঁবুর শহর হিসেবে পরিচিত মাভরোভুনিওতে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে মোরিয়া শিবির পুড়ে যায়। এরপর ওই দ্বীপে মাভরোভনিও হয়ে ওঠে একমাত্র বৃহৎ শরণার্থী শিবির। এখান থেকে নতুন বছরে ক্যাম্প সরিয়ে নেয়া হবে।

মে: ইউরোপমুখী অভিবাসীদের ঢল প্রতিরোধ করতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জলসীমার বাইরে অভিযান চালাতে ১১ই মে ফ্রন্টেক্স নামের এজেন্সিকে অনুমোদন দেয়ার প্রস্তাব করে গ্রিস। ফ্রন্টেক্স হলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্মিলিত সীমান্ত ও কোস্টগার্ড বিষয়ক এজেন্সি। এর ফলে তারা সুনির্দিষ্টভাবেম তুরস্কের জলসীমায় টগল দিতে পারে। ১৮ই মে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কয়েক হাজার অভিবাসী ও শরণার্থী সাঁতরে মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতা’তে পৌঁছার চেষ্টা করে। এর ফলে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, জীবিত উদ্ধার করা শরণার্থীদের আবার কর্তৃপক্ষ সমুদ্রের পানিতে নিক্ষেপ করছে। কিন্তু এ বিষয়ে নীরব থাকে ইউরোপিয়ান কমিশন। কয়েক ডজন অভিবাসী এবং শরণার্থী স্পেনের ভূখণ্ড মেলিলা’তে প্রবেশের চেষ্টা করে। ২৪শে মে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিটসোতাকিস রাজধানী এথেন্সে সাগত জানান ফ্রন্টেক্স প্রধান ফ্যাব্রিসে লেগেরি’কে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সীমান্তে বেআইনিভাবে পুশব্যাক করার বিষয়ে চোখ বন্ধ রাখার কারণে ফরাসি নেতাকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের যে তৎপরতা তাতে বহু প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন প্রস্তাব করা হয়। ২৬শে মে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অভিবাসী এবং মাদকের প্রবাহ অনুমোদন দেয়ার হুমকি দেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্দার লুকাশেঙ্কো। সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেলারুশ থেকে বিপুলসংখ্যক ইরাকি শরণার্থী লিথিয়ানিয়ায় প্রবেশ করেন। তাদের সংখ্যা ৪১০০। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৫৫ গুণ বেশি।

জুন: ৭ই জুন গ্রিসের মন্ত্রিপরিষদ একটি সিদ্ধান্ত নেয়। তাতে বাংলাদেশি, আফগান, পাকিস্তানি, সিরিয়ান এবং সোমালি শরণার্থীদের জন্য তুরস্ককে নিরাপদ তৃতীয় দেশ হিসেবে মনে করা হয়। গ্রিসে যে পরিমাণ মানুষ আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন তার মধ্যে শতকরা ৬৭ ভাগই এসব দেশের। এসব দেশের নাগরিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, তুরস্কের জন্য আবেদন না করার কোনো কারণ তাদের আছে কিনা। ২৯শে জুন ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম সাপোর্ট অফিস আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বিষয়ক একটি এজেন্সি পুনঃস্থাপনের একটি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। এক্ষেত্রে অধিক স্বায়ত্তশাসন এবং তহবিল দেয়া হয়। এর ফলে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি এবং সামাজিক সক্ষমতার ভিত্তিতে শরণার্থীদের আবেদন পুনর্বিন্যাস করার কাজ পায় তারা। ২০১৫ সালে প্রথম একটি কোটা ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু অভিবাসন বিরোধী রাষ্ট্রগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে।

জুলাই: খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে কিউবার রাজধানী হাভানায় ১১ই জুলাই বড় বিক্ষোভ হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা দমন করে। এর পরে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালায় পুলিশ। ভিডিও ফুটেজ দেখে ওই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে থাকে। এর ফলে হাজার হাজার নাগরিক মস্কো, মিনস্ক, ইস্তাম্বুল ও বেলগ্রেডের দিকে পা বাড়ান। এসব সদস্য দেশ থেকে পরে তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাজ্যগুলোতে প্রবেশ করেন বা করার চেষ্টা করেন। ১৯শে জুলাই লেসবসের পুলিশ একটি সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করে যে, গুপ্তচরবৃত্তি এবং পাচার কাজের জন্য জড়িত এমন বেসরকারি সংগঠনের ১০ জনকে তারা শনাক্ত করতে পেরেছে। বার্লিনে ২১শে জুলাই একটি যৌথ ঘোষণা দেয় গ্রিস ও জার্মানি। তাতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনপত্রের সুষ্ঠু বণ্টন করার আহ্বান জানানো হয়।

বছরের সবচেয়ে বিয়োগান্তক একটি ঘটনা ২৫শে জুলাই ঘটে লিবিয়া উপকূলে। একটি জাহাজ ডুবে সেখানে কমপক্ষে ১৫০ জন মারা যান। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডি ওই ভয়াবহতার শিকার মানুষদের উদ্ধারে সদস্য দেশগুলোকে তাদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। ২৫শে জুলাই গ্রিস সরকার গৃহহীন কয়েক হাজার শরণার্থীরবিরুদ্ধে অভিযান চালায়। তাদেরকে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পের ভিতরে নিয়ে ঢুকিয়ে দেয়।

আগস্ট: ১৫ই আগস্ট তালেবানরা আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করে। আর তখনকার বেসামরিক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন মাসের অভিযানে পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তালেবানরা। দেশ ছাড়তে আতঙ্কিত আফগানরা রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যান কাবুল বিমানবন্দরে। ফলে যতটা সম্ভব আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের মাধ্যমে তাদেরকে উদ্ধার করা হয়। নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত ৮১৯ জন আফগানকে গ্রহণ করে গ্রিস। ১৯শে আগস্ট লিবিয়ার উত্তরে শিশুসহ ৪৫ জন মানুষকে বহনকারী বোট বিস্ফোরিত হয়। এতে তারা ডুবে মারা যান।

সেপ্টেম্বর: ভ্যাথি শহর থেকে শরণার্থীদের গ্রহণ করা শুরু করে সামোস ক্লোজড কন্ট্রোলড অ্যাক্সেস সেন্টার। কাবুল পতনের পরে প্রথম উদ্ধার করা আফগানদের গ্রহণ করে গ্রিস। এর মধ্যে পার্লামেন্টের সাতজন নারী সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আছেন। ২৮ ও ২৯শে সেপ্টেম্বর প্রায় ৩০০ আফ্রিকান অভিবাসী ও শরণার্থী সেউতা’য় প্রবেশের চেষ্টা করেন। গুজব শোনা গিয়েছিল যে, সীমান্তে নিরাপত্তা শিথিল করা হয়েছে। ফলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়।

অক্টোবর: ১লা অক্টোবর গ্রিসের অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রণায় শরণার্থীদের মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণের ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু ক্ষুধা এবং চলাচলের জটিলতার কারণে তা বিলম্বিত হয়। বেলারুশের সঙ্গে ৫০০ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখে লিথুয়ানিয়া। তখন থেকে বেলারুশের সঙ্গে লাতভিয়া ও পোল্যান্ড সীমান্তে অভিবাসীদের ঢল নামে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন বলে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্দার লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

নভেম্বর: ১২ই নভেম্বর শরণার্থী বোঝাই একটি বোট লিবিয়া উপকূলে ডুবে যায়। উদ্ধার করা হয় ৬৬ জনকে এবং ৩০টি মৃতদেহ। আশঙ্কা করা হয় এদিন ডুবে মারা গেছেন ৭৪ জন। তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। ২৪শে নভেম্বর ইংলিশ চ্যানেলে ডুবে যান ২৭ জন অভিবাসী। তারা ফ্রান্স থেকে বৃটেনে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। ২৭শে নভেম্বর লেরোস এবং কোস ক্লোজড কন্ট্রোলড অ্যাক্সেস সেন্টার উদ্বোধন করা হয়। বেলারুশ থেকে শরণার্থীবাহী ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় ইউরোপিয়ান কমিশন।

ডিসেম্বর: বেলারুশের সঙ্গে লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ড সীমান্তে ১লা ডিসেম্বর অস্থায়ী আশ্রয় প্রক্রিয়া শুরু করে ইউরোপিয়ান কমিশন। এর ফলে তারা আশ্রয়প্রার্থীদের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে। আবেদন সহজ ও দ্রুততর করা হয়। যাদেরকে বের করে দেয়া হবে, তাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। গ্রিসের অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সরকারি তালিকায় নিরাপদ তৃতীয় দেশ হিসেবে আলবেনিয়া এবং নর্থ মেসিডোনিয়াকে তালিকাভুক্ত করা হয় ২০শে ডিসেম্বর। ২৩ থেকে ২৫শে ডিসেম্বর অতিরিক্ত শরণার্থীবাহী তিনটি বোট অ্যাজিয়ান সাগরের বিভিন্ন অংশে ডুবে যায়। এতে কমপক্ষে ৩১ জন মারা যান। নিখোঁজ হন অনেকে। ২০১৫ সালের অক্টোবরের পর থেকে অ্যাজিয়ান সাগরে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা।