বুধবার, ১ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল জকিগঞ্জ আজও স্বীকৃতি পায়নি



বিজ্ঞাপন

বিশেষ প্রতিবেদক :: স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দিতে বাংলাদেশের। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী লগ্নে এসেও স্বীকৃতি পেলো না দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল জকিগঞ্জ। ২১ নভেম্বর জকিগঞ্জ মুক্ত দিবস।

যুগ যুগ ধরে দিনটি ঘুরে আসলেও ‘জকিগঞ্জ মুক্তাঞ্চল’ স্বীকৃতি পেতে স্থানীয়দের দাবি বাস্তবায়ন আজও অধরায় থেকে গেল।

দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল দিবস হিসেবে দিনটি ঘোষণা করার স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ জকিগঞ্জবাসীর প্রাণের দাবি। প্রত্যেক বছর ২১ নভেম্বর স্থানীয়ভাবে দিনটি উদযাপন করা হলেও জাতীয়ভাবে দিনটি স্বীকৃতির আক্ষেপ রয়ে এ অঞ্চলের মানুষের।

স্থানীয়দের মতে, জকিগঞ্জ মুক্তাঞ্চল ঘোষণার বিষয়টি একটি এলাকার জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনবে। যে কারণে স্বাধীনতার পর থেকে এ দাবি বাস্তবায়নের আশা বুকে বেধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে পরপারে চলে গেছেন। তারপরও প্রয়াতদের আকাঙ্খা বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের কাছে দাবি তুলে ধরা হচ্ছে।

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে জকিগঞ্জে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিত অভিযানে ঈদের দিন সন্ধ্যার পূর্বেই পাক হানাদার বাহিনী পরাজয় বরণ করে। ফলে শত্রু মুক্ত হয় জকিগঞ্জ, আর মুক্ত বাতাসে পতপত করে ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কথায়, ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ঈদের দিন রাতে মিত্র বাহিনীসহ এক সাঁড়াশি অভিযানে ২১ নভেম্বর ভোরে মুক্ত হয় সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ জকিগঞ্জ।

যুদ্ধকালীন সময়ে এই অঞ্চল ছিল ৪ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভক্ত। মেজর চিত্ত রঞ্জন দত্তের অধিনায়কত্বে এই সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ছিলেন প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী এমপি দেওয়ান ফরিদ গাজী। ৬টি সাব সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মাহবুব রব সাদী, লেফটেন্যান্ট জহির উদ্দিন ও ক্যাপ্টেন এম এ রব।

একাত্তরে পাক হানাদার কর্তৃক অত্যাচারের মাত্রা যখন ক্রমশ বাড়ছে তখন প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী ১১টি সেক্টরেই আক্রমণের তীব্রতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। খবর আসে ৪ নম্বর সেক্টরেও। জকিগঞ্জকে শত্রু মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে বৈঠকে বসেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে শুরু হয় আক্রমণের প্রস্তুতি।

২০ নভেম্বর গভীর রাত। জন্মমাটিকে স্বাধীনতার সুবাস এনে দিতে জীবন বাজি রেখে অপারেশন শুরু হয়।

মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ৩টি দলের সমন্বয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু। প্রথম দল লোহার মহল, দ্বিতীয় দল আমলসীদ এবং মূল দল জকিগঞ্জের কাস্টমস ঘাট বরাবর করিমগঞ্জ কাস্টমস ঘাটে অবস্থান নেন।

প্রথম ও দ্বিতীয় দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে কুশিয়ারা নদী অতিক্রম করে জকিগঞ্জের দিকে অগ্রসর হলে পাক বাহিনী টের পেয়ে যায়, শুরু হয় ছোটাছুটি।

মূলত এই দুটি দল দুই দিক থেকে পাক বাহিনীর সদস্যদের ব্যস্ত করে রাখে। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে ভেবে তারা আটগ্রাম-জকিগঞ্জ সড়ক দিয়ে পালাতে থাকে। এর মধ্যেই প্রথম ও দ্বিতীয় দল জকিগঞ্জ পৌঁছে যায়।

এদিকে, মূল দল রাবারের বালিশ দিয়ে সেতু তৈরি করে কুশিয়ারা নদী পার হয়ে প্রবেশ করে জকিগঞ্জ শহরে। নদী পার হয়ে তীরে উঠতেই লুকিয়ে থাকা এক পাক সেনার বুলেটে প্রাণ হারান ভারতীয় বাহিনীর মেজর চমন লাল ও তার দুই সহযোগী।

তবে মুক্তিবাহিনীর সমর দক্ষতায় হার মেনে আটক হয় ৭-৮ জন শত্রু বাহিনীর সদস্য। প্রধান ডাকঘরের দোতলা থেকে ভারী মেশিনসহ বন্দী করা হয় এক সেনা অফিসারকে। অতঃপর শোষকের নাগপাশ ছিন্ন করে বিজয় হাতের মুঠোয় পুরে বীরের বেশে ফেরেন মুক্তিযোদ্ধারা। এভাবেই প্রথম মুক্তাঞ্চল জকিগঞ্জ দিয়ে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা।

২১ নভেম্বর ঊষালগ্নে স্লোগান দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে স্বাগত জানান জকিগঞ্জবাসী। দীর্ঘ আট মাস পর স্বজনদের কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হন মুক্তিযোদ্ধারা।

পরদিন ২২ নভেম্বর আব্দুল লতিফ এমসিএ, ইসমত আহমদ চৌধুরী, আব্দুল মঈদ চৌধুরী ও অন্যান্য নেতারা কুশিয়ারা পার হয়ে জকিগঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জকিগঞ্জে স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী লড়াই।

জকিগঞ্জকে দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফোরামে বিয়টি উত্থাপিত হলেও কোনো ফল মিলেনি।

প্রথম মুক্তাঞ্চল রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে ২০১২ সালে মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনে ২১ নভেম্বর জকিগঞ্জ প্রথম মুক্তাঞ্চল বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন করা হয়। এত বছর পরও হয়নি কাজের কাজ। দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, প্রবাসী ঐক্য পরিষদ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ জকিগঞ্জের প্রতিটি মানুষের দাবি দীর্ঘদিনের। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা অন্তত জীবদ্দশায় স্বীকৃতি যেন জুটে।