বুধবার, ১ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



অনলাইনে প্রেম-প্রতারণা : সিলেটে পারুলচক্রের টার্গেট লন্ডনপ্রবাসী



বিজ্ঞাপন

ফয়সল মাহমুদ :: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা চলছে। এসব প্রতারণার সিংহভাগ শিকার হচ্ছেন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে বসবাসকারি বাংলাদেশীরা। ফেসবুকে পরিচয় থেকে ভুয়া প্রেম, রোমাঞ্চ অতঃপর প্রতারকচক্রের জালে পা দিয়ে হাজার হাজার পাউণ্ড খোয়ানোর ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ আবার প্রতারকদের জালে আটকা পড়ে মাসের পর মাস মাসোহারা গুনছেন। নিজের মান সম্মান ও পরিবারের কথা চিন্তা করে অনেকে মুখ খুলতে নারাজ। তবে সামাজিক মর্যাদার ভয়ে অনেকে আইনের আশ্রয় না নেওয়ায় ক্রমেই এই অপরাধের সংখ্যা বেড়েই চলেছে বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তরুণী ও যুবতীদের নামে ফেসবুকে ফেইক আইডি খুলে প্রতারণা করে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রতারকচক্র। প্রতিটি চক্রের সাথে অন্তত একজন করে কলেজ কিংবা বিশ্ববদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণী রয়েছে। স্মার্ট ও সুন্দরি মেয়েদের মিষ্টি কথার আড়ালে থাকে মাস্টার মাইন্ড প্রভাবশালী প্রতারকটক্র। এসব অপরাধীচক্রের ওপর রয়েছে দেশের প্রশাসনের আর্শিবাদ তাই প্রতারিত প্রবাসীরা তাদের বিষয়ে মুখ খুলতে ভয় পান। তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তিদেরকেও তাদের ফাঁদে ফেলছে প্রতারকেরা। তারা প্রথমে পারিবারিকভাবে যেসকল পুরুষ সুখি নয় কিংবা নানা কারণে অশান্তিতে রয়েছেন এমন ব্যক্তিদের তথ্য তাদের ঘনিষ্ট বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। এক্ষেত্রে যারা প্রযুক্তিতে বেশি দক্ষ নয়, এমন ব্যক্তিদের বেশি টার্গেট করে। তারা মধ্যবয়স্ক সহজ সরল পুুরুষদের ‘বল্লা’ আর তরুণদের ‘মোরগা’ বলে থাকে। আর একেকজন ব্যক্তিকে তারা একেটটা প্রজেক্ট হিসেবে আখ্যা দেয়। ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, ইনবক্সে ম্যাসেজ প্রেরণ ও ভিডিও কলের মাধ্যমেই শুরু হয় প্রতারণা।

ইলফোর্ডের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আহমেদ হোসেন দীর্ঘ দিন পর ২০১৯ সালে ছুটিতে বাংলাদেশে যান। দেশে যাওয়ার পর তাঁর ফেসবুকে মাসুমা আলি নামের এক আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে। প্রথমে তিনি তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরে তার ইনবক্সে বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদে বার্তা আসতে থাকে। এমনকি তার একান্ত বিষয় নিয়ে মেয়েটি তাকে বার্তা প্রেরণ করলে তিনি উত্তর দিতে গিয়ে তাঁর সাথে আলাপে (ইনবক্স চ্যাট) জড়িয়ে পড়েন। এরপর নিয়মিত টুকটাক কথা হলেও একদিন মেয়েটি তাকে সিলেটের একটি রিসোর্টে দেখা করার জন্য পিড়াপিড়ি শুরু করে। কয়েকদিন পর মেয়েটির সাথে তিনি ওই রিসোর্টে দেখা করেন। এরপর মেয়েটির অনুরোধে তিনি আবার একটি রেস্টুরেন্টে যান দেখা করতে এবং মেয়েটি তাকে একা এবং সন্ধ্যার পর দেখা করার কথা বলে। সেখানে যাওয়ার পর তাদের কেবিনে যোগ দেয় মেয়েটির কয়েকজন ছেলেবন্ধু। এরপর তাকে ড্রিংকসের সাথে কিছু খাইয়ে অচেতন করে আপত্তিকর ভিডিও ও ছবি তোলা হয়-যা তিনি পরবর্তীতে বুঝতে পারেন। এরপর থেকে মেয়েটি তার কাছে নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা চাইতো। তিনি দিয়েছেনও। কিন্তু পরবর্তীতে মেয়েটি তাঁর কাছে রীতিমতো চাঁদা দাবি শুরু করে। না দিলে ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।

সাপ্তাহিক দেশকে তিনি জানান, পরবর্তীকে আমি অনুসন্ধান করে জানতে পারি মেয়েটির আসল নাম পারুল বেগম (৩৩)। বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারিবাজার ইউনিয়নে। বর্তমানে গোলাপগঞ্জ পৌরসভার অত্যাধুনিক একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। মেয়েটির আচার ব্যবহার খারাপ হওয়ায় তার স্বামী তাকে তালাক দেন। এরপর বিবাহের নামে একাধিক পুরুষকে ফাঁদে ফেলছে পারুল নামের এই মেয়েটি। একা অত্যাধুনিক ফ্ল্যাটে বিলাসী জীবনযাপন দেখলে মনে হবে মেয়েটি বিত্তশালী পরিবারের। মেয়েটির সাথে একাধিক পুরুষ সদস্য রয়েছেন।

জানা যায়, শুধু আহমেদ হোসেনই নয়, মেয়েটির প্রতারণার শিকার হয়েছেন একাধিক যুক্তরাজ্য প্রবাসী। বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে ভিডিও কলে কথা বলে তাদের ফাঁদে ফেলেছে। সবার কাছ থেকে মেয়েটি মাসোহারা হিসেবে মোটা অংকের টাকা নিচ্ছে। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ভিকটিমের স্ত্রী কিংবা পরিবারে অন্য সদস্যদের কাছে আপত্তিকর ছবি পাঠাচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, রিয়া মানি ট্রান্সফার এর মাধ্যমে ৬৪৪৩৬৪৬৭৯৮ পিন নাম্বারে পারুল বেগমকে ৫৬২ পাউন্ড পাঠান লুটনের এক প্রতারিত ব্যক্তি। স্মল ওয়ার্লডের মাধ্যমে সাউথ ইস্ট ব্যাংক বিয়ানীবাজার শাখায় পারুল বেগমের কাছে ২৩২ পাউন্ড পাঠান ইস্ট লন্ডনের আরেক ব্যক্তি। পরবর্তীতে একই ব্যাংকে আরো ১শ’ পাউন্ড পাঠান তিনি।

এছাড়াও গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়ন মানি ট্রান্সফারের মাধ্যমে ড্রাটফোর্ডের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২,৩১৪ পাউন্ড (২ লাখ ৬৩ হাজার ৫শত ৩৭ টাকা) নিতে সক্ষম হয় পারুল বেগম। আল-আরাফাহ ব্যাংক সিলেট লালদিঘী শাখায় পারুল বেগমের নামে আরো এক ব্যক্তি ৮২৪ পাউন্ড প্রেরণ করতে বাধ্য হন। এছাড়া অনেকে প্রতিমাসে পারুলচক্রকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়।

এ ব্যাপারে পূর্ব লন্ডনের কিংডম সলিসিটর্স এর প্রিন্সিপাল ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের আরো সচেতন হওয়া উচিত। বিশেষ করে অপরিচিত কারো সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে, সর্তক থাকা প্রয়োজন। একটি ভূলে মানুুষের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাই ভুল হলেও আইনের আশ্রয় নেয়া প্রয়োজন- যাতে অপরাধীরা আরো অপরাধ না করতে পারে।