বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



ভুয়া ভিসা টিকিটের জমজমাট কারবার



বিজ্ঞাপন

চক্রের মূলহোতা আসাদ

নিউজ ডেস্ক: রাজা মিয়া বিদেশে যাবেন। আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র মরিশাসে। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা হয়েছে। স্বজনরা ভিড় করেছেন বাড়িতে। গ্রামের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে এসেছেন রাজধানী ঢাকায়। বিকাল থেকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিছুক্ষণ পরই বিমান উড়বে আকাশে। রাজা মিয়া একা না। খবর মানবজমিন।

এসেছেন আরও অনেকে। মরিশাসে একই কোম্পানির ভিসা তাদের। স্বজনদের সঙ্গে বিদায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের বোর্ডিং পাস করাতে গিয়ে ঘটে বিপত্তি। বিমানের টিকিট ভুয়া। বিমর্ষ হয়ে যায় চেহারা। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে এবার ভিসা যাচাই করেন। সেটা ভুয়া। এজেন্সির ফোন নম্বর বন্ধ। হাওয়া হয়ে গেছে রাজধানীর কুড়িল এলাকার এজেন্সির সেই অফিস। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। অন্ধকার দেখতে পান দু’চোখে। নিরুপায় হয়ে ছুটে যান র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে। অবশেষে গোয়েন্দা সূত্র ও তথ্য প্রযুক্তির ভিত্তিতে এই চক্রের মূলহোতা আসাদুজ্জামান আসাদকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। মামলাটি তদন্ত করছে ভাটারা থানা পুলিশ। ভয়ঙ্কর এই চক্রে জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

প্রতারণার শুরুটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ‘বাংলাদেশ থেকে মরিশাসে শ্রমিক নেয়া হবে। নিয়োগদাতা একুয়ারেল গ্রুপ। এতে পোশাক শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। স্বল্প খরচে বিদেশে যেতে আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন।’ এভাবেই একটি বিজ্ঞাপন বুস্ট করে ছড়িয়ে দেয়া হয়। যোগাযোগের জন্য কুড়িল ভাটারার ‘গ্লোবাল ভিসা কনসালটেন্সি ফার্ম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ও এর মালিক আসাদুজ্জামান আসাদের ফোন নম্বর দেয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিজ্ঞাপন দেখে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে যোগাযোগ করেন শত শত মানুষ। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ করে দফায় দফায় প্রতারক চক্র হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। বিশ্বাস ও আস্থা বাড়াতে যথাসময়ে দেয়া হয় ভিসা। এমনকি বিমানের টিকিটও। শেষ পর্যন্ত জানা গেছে, সবই ভুয়া। এমনকি কনসালটেন্সি ফার্মের নিবন্ধন নম্বরটিও ভুয়া। এই চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন শত শত মানুষ। এরমধ্যে প্রায় ৩০ জন রয়েছেন সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লার। তারা প্রত্যেকেই আশুলিয়া, টঙ্গী এলাকায় বিভিন্ন কারখানায় পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, ঘটনার সূত্রপাত গত ফেব্রুয়ারিতে। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে ভাটারার প্রগতি সরণির জেবুন্নেছা প্লাজার এজেন্সির তৃতীয় তলার অফিসে যোগাযোগ করেন রাজা মিয়া, পিয়ার আহমেদ, মোস্তাকিম ও আবুল কালামরা। এই গ্রুপে ভুক্তভোগী রয়েছে প্রায় ৩০ জন। ভিসা প্রতি তাদের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা করে নেবে বলে কথা চূড়ান্ত হয়। এ ছাড়াও পাসপোর্ট করার জন্য তারা প্রত্যেকে আসাদকে ১১ হাজার টাকা করে দেন। মেডিকেলের জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে নেয়া হয় ৬ হাজার টাকা। গত ১লা জুলাই ফোনে তাদের জানানো হয় ভিসা চলে এসেছে। এবার ভিসা ও টিকিটের টাকা দিতে হবে।

এবার প্রত্যেকের কাছ থেকে বিমানের টিকিটের টাকা আদায় করা হয়। গত ৮ই জুলাই অফিসে ডেকে নিয়ে হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় টিকিট ও ভিসা সংবলিত পাসপোর্ট। জানানো হয়, ৩রা সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাদের ফ্লাইট। তারপর বিদেশে যেতে প্রস্তুতি নেন সবাই। কিন্তু আর মরিশাসে যাওয়া হয়নি। ততক্ষণে চক্রের সদস্যদের ফোন বন্ধ। অফিস স্থানান্তর করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানান র‌্যাবে। এবার তদন্তে নামে র‌্যাব সদস্যরা। গত ৬ই অক্টোবর খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ-২ এর ১/ডি রোডের ৩১ নম্বর ‘হাসেম ভিলা’য় অভিযান চালিয়ে আসাদুজ্জামান আসাদকে আটক করে র‌্যাব। জব্দ করা হয় বিপুল পাসপোর্ট।

ভুক্তভোগী পেয়ার আহমেদ জানান, প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কুমিল্লার লাকসামের ইরুয়াইন গ্রামের রফিকুল ইসলামের পুত্র পেয়ার আহমেদ বাদী হয়ে ভাটারা থানায় একটি মামলা করেছেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আসাদুজ্জামান আসাদ টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের পুষ্টকামুরী গ্রামের মৃত আবু নাসিরের পুত্র। এ বিষয়ে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, সাজেদুর রহমান জানান, এই মামলায় আসাদকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে। জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানান তিনি।