বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



মৌলভীবাজারে গাড়িতে স্টিকার বাণিজ্য রমরমা



বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক :: মৌলভীবাজারে মাসোয়ারা স্টিকার বাণিজ্যে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ট্রাফিক বিভাগ, সিএনজি অটোরিকশার শো-রুম ও শ্রমিক নেতারা। গাড়ির লাইসেন্স থাকুক বা না থাকুক, মাসোয়ারা স্টিকার থাকলে গাড়ি রোডে চালানো যাচ্ছে।

গাড়ির কাগজপত্র কিংবা চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও ট্রাফিক পুলিশ সিএনজি অটোরিকশা কিংবা টমটমে স্টিকার দেখলে ছেড়ে দেয়। এতে বিশৃঙ্খল হয়ে উঠেছেন ড্রাইভাররা। বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনা। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।

অধিকাংশ স্টিকার শো-রুম ও শ্রমিক নেতারা বিক্রি করছে। জেলার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, পরোক্ষভাবে ট্রাফিক পুলিশ স্টিকার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। প্রতি মাসে দুর্ঘটনার বড় অংশ সিএনজি অটোরিকশার কারণে হয়ে থাকে।

জেলা বিআরটিএ অফিস থেকে জানা যায়, এ যাবত জেলায় ২৪ হাজার সিএনজি অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে কাগজ আপডেট আছে ১০ থেকে ১২ হাজারের। ১ হাজার ৫০০ টমটমের রেজিস্ট্রেশন দিলেও এখন কোনোটারই কাগজ আপডেট নেই। রেজিস্ট্রেশনের বাইরেও ৪ থেকে ৫ হাজার (অনটেস্ট গাড়ি) গাড়ি রয়েছে। লাইসেন্স না নিয়েও স্টিকার দিয়ে গাড়ি চালাতে পারায় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশেষ করে স্টিকারের আওতায় আনা হয়েছে জেলার প্রায় ১৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশা, অটোরিকশা ও টমটমকে। প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে গাড়ির সামনের গ্লাসে লাগাতে হয় শো-রুম, ট্রাফিক পুলিশ ও সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে সরবরাহকৃত নির্ধারিত মাসোয়ারা স্টিকার।

স্টিকারে লেখা থাকে সাংকেতিক বিভিন্ন স্লোগান। আবার কোনো কোনো শো-রুম মাসের নাম কিংবা নম্বর লিখে স্টিকার ছাড়ে। ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা গাড়ির কাগজ অনিয়মিত এবং সদর উপজেলার মধ্যে গাড়ি চললে ২৫০ টাকা; অনটেস্ট এবং পুরো জেলায় চললে ১ হাজার টাকা মূল্যের স্টিকার কিনতে হয় চালকদের। তবে টমটমের জন্য ২০০ টাকার স্টিকার নির্ধারিত।

সরেজমিন দেখা যায়, মৌলভীবাজার সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড, মৌলভীবাজার সিএনজি ইউনিট কমিটি ও মক্কা-মদিনাসহ বিভিন্ন স্লোগান ও সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে গাড়ির সামনে স্টিকার লাগানো। সেপ্টেম্বর মাসের স্লোগান ছিল ‘স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মৃত্যুঝুঁকি আছে’, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, নিরাপদে পথ চলুন’।

টমটমে রয়েছে চৌমুহনা অটো টমটম গ্রুপ পরিচালনা কমিটি, ডিবি, বিএস, কেএস ও সিএসসহ বিভিন্ন সংগঠন। ওই সকল স্ট্যান্ড থেকে স্টিকার সরবরাহ করা হয়। মাসের শুরুতে স্ট্যান্ডের দায়িত্বরত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো হয় স্টিকার। চালকরা মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে কিনে গাড়িতে লাগাতে হয়। অন্যথায় রোডে গাড়ি চালানো যায় না।

পৌর শহরের মাছের আড়ৎ, ভুজবল, ভৈরববাজার, শ্রীমঙ্গল, শেরপুর, সরকারবাজার, খলিলপুর, ঘয়গড়, কাগাবালা, দিঘীরপাড়, আটঘর, বাহারমর্দন, মোহাম্মদপুর, সমসেরগঞ্জ, নতুনবাজার, রাজনগর, মুন্সিবারজার, টেংরাবাজার ও অফিসবাজারসহ বিভিন্ন সিএনজি স্ট্যান্ড ঘুরে পরিচয় গোপন রেখে চালক ও ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোডে স্টিকার ছাড়া কোনো গাড়ি চলাচল করলে ট্রাফিক পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয়। স্টিকার থাকলে গাড়ির লাইসেন্স অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও আটকানো হয় না।

শমশেরনগর স্ট্যান্ডের চালক রাজা মিয়া বলেন, মাসের শুরুতে স্ট্যান্ডের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মিয়ার কাছ থেকে ২৫০ টাকার স্টিকার লাগাতে হয়। কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার স্ট্যান্ডের চালক হাসান বলেন, চৌমুহনী ট্রাফিক পুলিশের কাছ থেকে মাসের শুরুতে স্টিকার কেনেন তিনি। আগামী মাসের জন্য ৫টা স্টিকারের অর্ডার করেছেন।

শমশেরনগর রোডের মেসার্স এম এফ ফিলিং এন্ড সিএনজি স্টেশনে ১০ থেকে ১২ জন চালকের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, স্টিকার ছাড়া কোনো সিএনজি অটোরিকশা রাস্তায় চালানো যায় না। যে অবস্থা শুরু হয়েছে, কয়েকদিন পরে ড্রাইভিং ছেড়ে কৃষি কাজে লাগতে হবে তাদের।

অভিযোগের বিষয়ে জেলা অটো টেম্পু, অটোরিকশা, মিশুক ও সিএনজি পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি পাবেল মিয়া বলেন, স্টিকার দিয়ে গাড়ি চালানো যাবে এমন চুক্তি করে শো-রুমের মালিকরা অনটেস্ট গাড়ি বিক্রি করে। নম্বর আছে এমন গাড়িতেও স্টিকার লাগাতে হয়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমিও শুনেছি কিন্তু কোনো শ্রমিক আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি।’

সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতি সদর উপজেলা শাখার সভাপতি শেখ জহির আহমদ বলেন, ‘আমরা কেবল গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্টিকার দেই। তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি।’ চালকরা বলছেন ১ হাজার টাকা দিয়ে আপনাদের কাছ থেকে স্টিকার কেনে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো আমরা এখন বাদ দিয়ে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে জেলা ট্রাফিক সার্জেন্ট মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বলেন, ‘শো-রুমের লোক সিন্ডিকেট করে এ টাকা আদায় করে।’

জেলা পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়া বলেন, ‘স্টিকার বাণিজ্যের বিষয়টি নানা দিক থেকে আমার কাছেও এসেছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন ট্রাফিক সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। তদন্ত করে জড়িত ট্রাফিক সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘তবে অনটেস্ট গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই নানা দিক থেকে অনুরোধ আসে। নাগরিকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে আমরা অনটেস্ট গাড়ি চলার সুযোগ দিয়েছি।’