বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ আশ্বিন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ



সিলেটে এসে পদে পদে ভোগান্তিতে পর্যটকরা



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: পর্যটনে ব্র্যান্ডিং সিলেট। প্রকৃতি কন্যা সিলেটকে নিয়ে পর্যটনে আগ্রহ সবার। সরকারের তরফ থেকে সিলেটকে ব্র্যান্ডিং করার অবিরাম চেষ্টা চলছে। কিন্তু সিলেটকে পর্যটন ব্রান্ডিং করতে চাইলেও পর্যটকদের জন্য বাড়ানো হয়নি সুযোগ-সুবিধা। বরং সিলেটে এসে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। পরিবার পরিজন নিয়ে এসেও পড়ছেন বেকায়দায়। এ নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই। উত্তর সিলেটের সব উপজেলায়ই পর্যটন এলাকা।

ভারতের মেঘালয়ের সীমান্তবর্তী এসব উপজেলা আদিকাল থেকেই পর্যটনের জন্য উল্লেখযোগ্য স্থান। দিনে দিনে নতুন নতুন পর্যটন স্পট আবিষ্কার হচ্ছে। মিডিয়ার বদৌলতে এসব পর্যটন স্পটের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। করোনাকালীন দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ ছিল পর্যটনস্পট। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় এসব স্পটে কাউকেই ঢুকতে দেয়া হয়নি। দুই বছরের বিশ্রামে অনন্য রূপ নিয়েছে সিলেটের পর্যটনস্পট। যেনো প্রাণ ফিয়ে পেয়েছে সিলেটের পর্যটনস্পটগুলো। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর গত মাস থেকে খুলে দেয়া হয়েছে পর্যটন স্পটগুলো। এখন লোকে লোকারণ্য এসব এলাকা। রাজধানী ঢাকাসহ দুর-দূরান্তের পর্যটকরা ছুটে আসেন। গত এক মাসে সিলেটে কয়েক লাখ পর্যটক এসেছেন। এখনো আসছেন অনেক পর্যটক। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিন পর্যটকদের পদভাবে মুখরিত থাকে সিলেট। এই দুই দিন প্রায় ৫০-৬০ হাজার পর্যটক অবস্থান করেন সিলেটে। এর বাইরেও গোটা সপ্তাহই আসা-যাওয়া করেন পর্যটকরা। এছাড়া- প্রায় সময় প্রবাসীরাও বেড়াতে আসেন সিলেটে। সিলেটের জাফলং জিরো পয়েন্ট। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। পাহাড়, জল ও পাথরের মিতালি জাফলংয়ে।

এ কারণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পর্যটকরা ছুটে যান জাফলংয়ে। শুক্র ও শনিবার জাফলংয়ে ১৫-২০ হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কিন্তু জাফলংয়ে পর্যটকদের নেই সুযোগ সুবিধা। অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে যান জাফলংয়ে। পিয়াইনের বুকে সাঁতার কাটেন, আবার অনেকেই গা ভিজিয়ে প্রকৃতির পরশ নেন। জাফলংয়ে ইউনিয়ন পরিষদের নির্মিত একটি গণ-সৌচাগার রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে পর্যটকরা ওই সৌচাগার ব্যবহার করতে পারেন না। মহিলা ও শিশু পর্যটকদের জন্য নেই বিশ্রামাগার কিংবা কাপড় পাল্টানোর সুবিধাও। বেসরকারি উদ্যোগে স্পট এলাকায় অস্থায়ী কিছু সুবিধা গড়ে তোলা হলেও নিরাপত্তার জন্য পর্যটকরা সেটি ব্যবহার করতে পারেন না। সাম্প্রতিক সময়ে জাফলংয়ে পর্যটকদের জন্য টিকিট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে টাকা গ্রহণ করা হলেও পর্যটন স্পটে বেড়াতে আসা লোকজন পাচ্ছেন না সুবিধা। এ নিয়ে নতুন করে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ঢাকা থেকে আসা রবিউল ইসলাম, আবুল কাশেমসহ কয়েকজন পর্যটক পরিবার নিয়ে জাফলং বেড়াতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন।

তারা বলেন, দেশের পর্যটকদের মধ্যে জাফলং হচ্ছে অন্যতম ব্রান্ড। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে সুবিধা না বাড়ানো অত্যন্ত লজ্জাজনক। সুযোগ সুবিধা না থাকায় পর্যটকরা সময় নিয়ে ঘুরতে পারেন না বলে জানান তারা। গোয়াইনঘাটের আরেকটি পর্যটনস্পট রাতারগুল। সেখানে গণ সৌচাগার থাকলেও সেটিও নিম্নমানের। এছাড়া রাতারগুল যেহেতু একটি জলাবন এ কারণে এটির পরিবেশ রক্ষা করাও প্রয়োজন। কিন্তু দেখা গেছে- শুক্র ও শনিবার হাজার হাজার পর্যটক রাতারগুলে ভিড় করেন। পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন- বেশি মানুষের যাতায়াতের কারণে রাতারগুল এক সময় তার ঐতিহ্য হারাতে পারে। এজন্য প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার পর্যটকদের ঢুকতে দেয়া উচিত।

তারা জানিয়েছেন, টিকেটিং ব্যবস্থা চালু করার পর দেখা গেছে একদিনে রাতারগুলে প্রায় ৪ হাজার পর্যটক ঢুকেছেন। রাতারগুলে পর্যটকদের ধারণের জন্য সেই পরিমাণ সুযোগও নেই। এছাড়া বাথরুম, বিশ্রামাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার অনেকেই দেখা গেছে- দলবেঁধে গিয়ে রান্নাবান্না করে পিকনিক করেন। এতে করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিংয়েরও ব্যবস্থা নেই। বিছনাকান্দি সিলেটের অন্যতম পর্যটন স্পট। কিন্তু বিছনাকান্দিতে যাতায়াতে ভোগান্তির শেষ নেই। এছাড়া প্রকৃতিময় বিছনাকান্দিতে পর্যটকদের জন্য কোনো সুবিধাই রাখা হয়নি। আছে নিরাপত্তার অভাব। এজন্য চলতি মৌসুমে বাইরের পর্যটকরা বিছনাকান্দিমুখী হচ্ছেন কম।

বিছনাকান্দির স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন- শুক্র ও শনিবার অনেক পর্যটক বিছনাকান্দিতে আসেন। কিন্তু বেড়াতে এসে বিশেষ করে মহিলা পর্যটকরা বেকায়দায় পড়েন। বাথরুম ও কাপড় পরিবর্তনের কোনো অবকাঠামোগত সুবিধা এখানে গড়ে তোলা হয়নি। সিলেটের অন্যতম পর্যটন স্পট হচ্ছে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর। জাফলংয়ের পর সাদাপাথর পর্যটন স্পট মন কেড়েছে সবার। এ কারণে শুক্রবার শনিবার এলেই দুইদিনের অর্ধলক্ষাধিক পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে এ পর্যটন স্পটে। দীর্ঘ পথ জার্নি করে সাদাপাথর পর্যটন স্পটে গিয়ে বিশেষ করে সৌচাগার সংকটে পড়েন পর্যটকরা। মেঘ, পাহাড় ও পাথর বেষ্টিত সাদাপাথরে জলকেলীতে মেতে ওঠেন পর্যটকরা। পুরুষরা খোলা জায়গায় কাপড় পাল্টাতে পারলেও মহিলারা বাধ্য হয়ে ভিজা কাপড় নিয়ে সিলেটে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। নেই বিশ্রামাগারও। ফলে সাদাপাথরেও পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পর্যটকরা। স্থানীয় ভোলাগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা নোমান আহমদ জানিয়েছেন, পর্যটকদের জন্য সুবিধা বাড়াতে তারা অনেকদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্তমানে ইজারা দিয়ে এই পর্যটনস্পট থেকে সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করছে। এ কারনে এখনই পর্যটকদের সুবিধা বাড়ানো উচিত।

কোম্পানীগঞ্জের প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- সাদাপাথরে বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর কাজ হলে পর্যটকরাই বেশি সুবিধা আদায় করতে পারবেন। সিলেটের পরিবেশ আন্দোলন বাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কীম জানিয়েছেন; প্রতিটি পর্যটনস্পটেই পর্যটকদের জন্য পরিবেশবান্ধব সুবিধা বাড়ানো উচিত। বিশেষ করে সৌচাগার, বিশ্রামাগার ও কাপড় পাল্টানোর সুবিধা রাখা জরুরি। নতুবা পর্যটকদের ভোগান্তি কমবে না। এদিকে, সিলেটের জাফলং, রাতারগুলসহ কয়েকটি পর্যটনস্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম থাকলেও সাদা পাথরে নেই। এ কারণে সাদাপাথরে নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন পর্যটকরা।