বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



মৌলভীবাজারের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতি সংকটে সেবা বঞ্চিত রোগীরা



বিজ্ঞাপন

রিপন দে :: যন্ত্রপাতির অভাব, চিকিৎসক নার্সসহ বিভিন্ন পদে লোকবল সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে মৌলভীবাজারের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিকিৎসাসেবাও।

জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ভর্তি হয় ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী। তবে চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির সংকটে সেবা বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে রোগীদের।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা নিতে আসা উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের রতন বৈদ্য বলেন, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। রোগীকে ভালো করে দেখার আগেই সদর হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয়।

তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সংকটের মধ্যেও আমরা রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। জনবল চেয়ে সিভিল সার্জন অফিসে চিঠি পাঠিয়েছি। ৫০ শয্যার জনবল নিয়োগ হলে রোগীরা আরও ভালো সেবা পাবেন।’

কমলগঞ্জ উপজেলায় ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি তিন বছর আগে ৫০ শয্যায় উত্তীর্ণ হয়। তবে এখানকার ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, সনোলজি মেশিন থাকলেও তা বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। সনোলজিস্ট, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো খালি।

এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৯ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১২ জন। মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ১২ জনের জায়গায় আছেন ৯ জন। ফার্মাসিস্ট পদে ৩ জনের স্থলে কেউই নেই। প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে ২ জনের জায়গায় কাজ করছেন ১ জন।

কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘চিকিৎসকের চারটি পদ শূন্য আছে। গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া কনসালট্যান্ট নেই। লোকবলের অভাবে ডিজিটাল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন চালানো যাচ্ছে না। কোনো ফার্মাসিস্ট নেই।

রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের পদ আছে ১০টি। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চারটি পদ শল্যচিকিৎসক (সার্জারি), দন্ত চিকিৎসক, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং গাইনি চিকিৎসকের পদ অনেক দিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। এখানে ৬ জন মেডিক্যাল চিকিৎসক পদের মধ্যে বর্তমানে ৪ জন কর্মরত আছেন।

১৫ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের বিপরীতে আছেন ৮ জন। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো ল্যাব নেই। এক্স-রে মেশিন থাকলেও অপরারেটর না থাকায় ২০১১ সাল থেকে এটি অব্যহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটারও। হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি অচল।

রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বর্ণালী দাস বলেন, ‘লোকবল যা আছে, তা দিয়েই আমরা চালাচ্ছি। নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে অনেক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।’

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯৯৫ সালে এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয়। তবে ১৯৯৮ সালে এক্স-রে মেশিন পরিচালনার জন্য রেডিওলজিস্ট পদটি শূন্য হয়ে যায়। এরপর থেকে এক্স-রে মেশিন বন্ধ থাকে। ১০ বছর আগে আসা ইসিজি যন্ত্রটিও টেকনোলজিস্টের অভাবে এখনও প্যাকেটবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মী জানান, ২০১৯ সালের জুলাই মাসে উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এক্স-রে মেশিনটি মেরামত করে অস্থায়ী একজন রেডিওলজিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম চালু করা হবে। পরে টেকনিশিয়ানরা মেশিনটি পর্যবেক্ষণ করে জানান, এটি আর সচল করা সম্ভব নয়।

তিনি জানান, ‘২০২০ সালের নভেম্বর মাসে স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভায় নতুন এক্স-রে মেশিন সংযোজনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। পুরাতন অ্যাম্বুলেন্সটি মেরামতের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালী টেমো (গাড়ি মেরামত) কার্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। সেখানকার বিশেষজ্ঞ একটি টিম কয়েক মাস আগে অ্যাম্বুলেন্সটি দেখে গিয়েছেন। এখনও সেটি মেরামতের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌস আকতার বলেন, ‘আমি মাস তিনেক হলো এখানে এসেছি। লোকবলসহ এক্স-রে মেশিন নতুন সংযোজনের জন্য কর্তৃপক্ষকে জানানো আছে। এ ছাড়া অন্যান্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সচল করতে প্রতি মাসেই লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।’

বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০১৮ সালে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছিল; কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি সেবার মান। বাড়েনি লোকবলও।

এমনকি ৩১ শয্যার জনবলের মধ্যে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) পদটি ১৫ বছর ধরে শূন্য। এতে রোগীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সুবিধা পাচ্ছেন না। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) দুটি পদের একটি শূন্য। এতে সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের ছুটতে হয় বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

অন্যদিকে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ও আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) পদটি শূন্য আছে। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারের (স্যাকমো) ১৩টি পদের মধ্যে ৮টি পদ শূন্য, নার্সের ১৪টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য, নার্সিং সুপারভাইজারের ২টি পদের মধ্যে একটি শূন্য, মিডওয়াইফের ৫টি পদের মধ্যে ২টি পদ শূন্য, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের সাতটি পদের মধ্যে ৬টি পদ শূন্য, স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ২টি পদের ২টিই শূন্য, অফিস সহকারীর ৩টি পদের মধ্যে ২টি পদ শূন্য, ক্লিনারের ৫টি পদের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য, নিরাপত্তা প্রহরীর ২টি পদের মধ্যে ১টি পদ শূন্য রয়েছে।

বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রত্নদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, ‘৩১ শয্যার জনবল দিয়েই ৫০ শয্যার কার্যক্রম চলছে। ৩১ শয্যার জনবলেও বেশ কিছু পদ শূন্য ছিল। এই সীমিত জনবল নিয়েও আমরা সাধ্যমতো জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছি। জনবল নিয়োগের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। জনবল বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।’

মৌলভীবাজার জেলা সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ মোবাইলে বলেন, ‘সব কটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অত্যাধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন সংযোজন করছে সরকার। মৌলভীবাজারের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তা চালু হবে। এ ছাড়া বন্ধ থাকা যন্ত্রগুলো সচল করা ও লোকবল নিয়োগের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করব।’