সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



সিলেটে সুফল নেই গরিবের ঘরে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: দেখভালের অভাবে সিলেটে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না কম আয়ের মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া সরকারের সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প। কোথাও কোথাও জ্বলছে না আলো। কোথাও স্বজনপ্রীতি করে বিত্তশালীদের ঘরে লেগেছে এ সোলার প্যানেল। ৩ বছর পর্যন্ত দেখভালের কথা থাকলেও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের আচরণও দায়সারা। কত প্যানেল স্থাপন হয়েছে ও কত বিকল হয়েছে সে তথ্যও নেই তাদের কাছে। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাতাকুড়ি বলছে, বাড়ি কিংবা রাস্তায় স্থাপন করা সোলার প্যানেলগুলো দেখভাল করতে প্রতি উপজেলায় তাদের একজন প্রকৌশলী রয়েছেন। আর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা বলছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলাতেই সব সুফল ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের এ প্রকল্পের। খবর: যুগান্তর।

জানা গেছে, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী উপজেলাগুলোতে সরকারি ও সংসদ-সদস্যের বিশেষ বরাদ্দ টিআর ও কাবিখার ৫০ শতাংশ দিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে অসচ্ছল মানুষের ঘরে সৌর বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। সে বছর থেকেই সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ শুরু করে মন্ত্রণালয় নির্ধারিত পাতাকুড়িসহ আরও কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্প চলমান থাকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত।

সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী ও আয়তনে সবচেয়ে বড় গোয়াইনঘাট উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে গত তিন বছরে এখানে চার হাজার ৭৭৯টি হোম সিস্টেম সোলার প্যানেল ও ৩৫০টি স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়। স্থাপনের পরবর্তী ৩ বছর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দেখভালের কথা থাকলেও অনেকেই পাননি সেই সেবা। এর মধ্যে কিছু নষ্ট হয়েছে প্রথম বছরেই। আবার কিছু নিজেরাই ব্যাটারি পরিবর্তন করে চালানোর চেষ্টা করেছেন। এরই মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে স্থাপনকৃত সিস্টেমগুলোতে আর দায় নেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। নতুন লাগানো সিস্টেমগুলোর জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ মানুষের। গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লাতু গ্রামের হানিয়া বেগম জানান, তাদের ঘরে সরকারি সোলার স্থাপনের এক মাস পর থেকে একটি বাতিও জ্বলছে না। পাতাকুড়ি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি। একই অভিযোগ উপজেলার পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের এখলাছ মিয়ার। এখলাছ মিয়া জানান, খুব বেশি তাপ হলে মিটমিট করে একটি বাতি জ্বলে।

এ ব্যাপারে সিলেটের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নুরুল হক জানান, ইতোমধ্যেই তিনি সব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। কত সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, কত নষ্ট হয়েছে সেই তথ্য চাওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

হবিগঞ্জেও বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত সোলার প্যানেলগুলো কয়েক মাস যেতেই বিকল হয়ে পড়েছে। সরকারি সুবিধা পেয়েও প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। তবে বিষয়টিকে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা বলে মনে করছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যে কোম্পানি কাজটি করেছে তারা আর দেখছে না। মাল সাপ্লাই দিয়ে টাকা পেয়ে গেছে। এখন আর গুরুত্ব দেয় না।

জানা গেছে, জেলার প্রায় সবগুলো উপজেলাতেই স্থাপিত সোলার প্যানেলগুলোর বেশির ভাগই কয়েক মাস ঝিরঝির করে বাতি জ্বললেও অনেক বাড়িতেই এখন আলো জ্বলছে না। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সোলার প্যানেল বোর্ড, ব্যাটারি ও বাতি। ফলে সরকার নির্ধারিত সোলার প্যানেল সরবারহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এরই মধ্যে এলজিএসপি প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পর্যায়েও জনসাধারণের মাঝে সোলার প্যানেল বিতরণ করা হচ্ছে। প্রত্যন্তঞ্চলে সরকারের এ যুগান্তকারী উদ্যোগ পৌঁছে গেলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। ফলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই হচ্ছে বেশি। নবীগঞ্জ উপজেলায় নিম্নমানের মালামালের কারণেই সোলার প্যানেলগুলো অল্পদিনে বিকল হয়ে পড়ছে। এমন ঘটনায় সরকারকে সোলার প্যানেল সরবারহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সচেতন মহল। এ প্রসঙ্গে সুবিধাভোগী নবীগঞ্জ উপজেলার বড় ভাকৈর পশ্চিম ইউনিয়নের হলিমপুর গ্রামের মুনসেফ আলম জানান, আমাদের বাল্লারহাট বাজারে একটি সোলার লাইট স্থাপন করা হয়েছিল। অল্পদিনের মধ্যেই তা বিকল হয়ে যায়। একইভাবে দীঘলবাক, পানিউমদা ইউনিয়নের বাজারে লাগানো স্ট্রিট সোলার লাইটগুলো আর জ্বলছে না। খোঁজখবরও নিচ্ছে না কেউ।

নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) উত্তম কুমার দাশ বলেন, লিখিত অভিযোগ করলে আমরা সোলার প্যানেল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনব। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মৌলভীবাজারে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা-সোলার) কর্মসূচির আওতায় মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ-সদস্য নেছার আহমদ ৩৫২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সোলার প্যানেল বরাদ্দ দেন। সদর উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এ তথ্য জানা গেছে। তবে এসব প্যানেল বিতরণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। সচ্ছল ও যাদের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে এমন ব্যক্তির নামেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বরাদ্দের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের। বঞ্চিত হয়েছেন জেলার নিম্ন আয়ের মানুষ। ওই তালিকায় থাকা চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের বাঁশতলা গ্রামের আব্দুল ওয়াহিদ মিয়ার এক ভাই ইউরোপে রয়েছেন এবং শহরের সমশেরনগর রোডে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভাড়ায় চালিত কয়েকটি সিএনজি গাড়ি রয়েছে। বর্ষিজোড়া গ্রামের আবুল কালাম খানও সচ্ছল ও এক ভাই আমেরিকা প্রবাসী। মাতারকাপন গ্রামের মির্জা নজরুল বেগ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী থাকার পরেও তার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা আজাদের রহমান বলেন, সংসদ-সদস্যের তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে আমাদের কাটছাঁট করার কোনো সুযোগ নেই।

দেখভাল না করার অভিযোগ সম্পর্কে পাতাকুড়ির প্রকল্প পরিচালক রমেন কুমার জানান, যেসব সিস্টেম ৩ বছর পেরিয়ে গেছে সেগুলো এখন আর তারা দেখভাল করেন না। তিন বছরের মধ্যে যেসব সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে সেগুলো দেখাশোনার জন্য প্রতি উপজেলাতেই তাদের জনবল রয়েছে।