সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



রেমা-কালেঙ্গায় কমে গেছে শকুন



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: নানা সংকটে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের ময়নাবিলে ৩৮ পরিবার (৭৬টি) মহাবিপন্ন বাংলা শকুন কমে এখন ৫২ থেকে ৬০ নেমে এসেছে।

পর্যাপ্ত খাবারের সংকট, আশ্রয়স্থল ধ্বংস হওয়া এবং প্রাণীর ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন ব্যবহারের কারণে এ বাংলা শকুন হারিয়ে যেতে চলেছে। তাদের টিকিয়ে রাখতে বনবিভাগ ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন ফর নেচার (আইইউসিএন) গত ৮ বছর ধরে কাজ করছে।

আশার কথা মহাবিপন্ন এই বাংলা শকুন রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দেশে কিটোপ্রোফেন জাতীয় ঔষধ উৎপাদন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অবশ্য এর আগে ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

আজ শনিবার (৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালন হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে শুক্রবার রেমা বনে শকুনের আবাসস্থলে শকুনদের জন্য খাবার (আস্ত গরু) দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পালিত হচ্ছে শকুন দিবস।

আন্তর্জাতিক শকুন শুমারি মতে, গত দুই দশকে পৃথিবী থেকে ৯৯.৯৯ শতাংশ বাংলা শকুন মারা গেছে। শকুনকে বলা হয় প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

পশু-পাখিসহ নানা প্রাণীর মৃতদেহ খেয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ প্রাণী। কিন্তু পরিবেশের জন্য অপরিহার্য এই প্রাণী মানবসৃষ্ট কারণে এখন মহাবিপন্নের পথে।

পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে ৬ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা শকুন অতিবিপন্ন একটি প্রজাতি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশু চিকিৎসায় ব্যবহার্য ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেন শকুনের বিলুপ্তির মূল কারণ।

বন বিভাগের মতে, সারা দেশে বাংলা শকুনের সংখ্যা ২৬০টি।

সিলেট বিভাগের একমাত্র হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের রেমা-কালেঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৩৮ পরিবার বা ৭৬টি বাংলা শকুন রয়েছে। তবে ৫২ থেকে ৬০টি শকুন এখন দেখা যায়। এসব শকুন রক্ষায় সরকারের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা পরিবেশ ও প্রকৃতিপ্রেমিকদের মধ্যে বেশ আশাও জাগালেও দিন দিন শকুন বাড়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবে কমছে।

হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিলুপ্তপ্রায় শকুনের জন্য ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ‘নিরাপদ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। ওই নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করে সেখানে শকুন সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, যেখানে শকুন নিরাপদে প্রজনন ও বিশ্রামের সুযোগ সুযোগ করে দেওয়া হয়।

সরকারের বন বিভাগ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন ফর নেচার (আইইউসিএন) বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে একটি প্রকল্পের আওতায় শকুন সংরক্ষণের এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।

আইইউসিএর সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সীমান্ত দিপু জানান, রেমার ময়নাবিলে ৩৮ পরিবার শকুন রয়েছে। তবে প্রতিবারই ৫২ থেকে ৬০টি শকুন দেখা যায়।

তিনি জানান, প্রতি বছর শকুন একটি করে ডিম পাড়ে, তবে তাদের মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ ডিম থেকে বাচ্চা হয়। সেই হিসেবে রেমায় ৭/৮টি বেশি বাচ্চা দেখা যায় না। সিলেট বিভাগে ৭০ থেকে ৮০টি শকুন রয়েছে। এর মধ্যে রেমায় ৭৬টি শকুন। প্রতিমাসে তারা এসব শকুনের জন্য ২/৩টি গরু খাবার হিসেবে দেন। বিশেষ করে শকুনের প্রজনন সময় সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এসব খাবার দেওয়া হয়। এবারও ২৮টি গরু দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তিনি জানান।

বাংলা শকুন রক্ষার জন্য ময়নাবিলে ২০০ উঁচু গাছকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু গত ৭ বছর বন বিভাগ ও আইইউসিএন এসব শকুন রক্ষায় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

সম্প্রতি সরজমিনে রেমা কালেঙ্গা বনে গেলে দেখা যায়, শকুনের খাবার দেওয়ার জন্য তৈরি মাচায় (উঁচু টেবিল) গরুর হাড়গোড় পড়ে আছে। শুক্রবারও সেখানে একটি গরু শকুনের খাবার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, গত বছর আমি সেখানে ১৬ জোড়া শকুন দেখেছি, দেখেছি তাদের আবাসস্থল ও বাচ্চাসহ বাসা।

তিনি বলেন, এসব শকুন রক্ষায় সরকার আন্তরিক এবং আমাদের সব সুযোগ সুবিধা দিয়ে আসছেন বন মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রী।

আইইউসিএন এর সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সীমান্ত দিপু জানান, দেশে মহাবিপন্ন ২৬০টি বাংলা শকুনের মধ্যে রেমায় রয়েছে ৭৬টি বাংলা শকুন। আইইউসিএন এর মাধ্যমে ৭ বছর ধরে এসব শকুন রক্ষায় কাজ করছি আমরা। প্রতিমাসে শকুনের জন্য সেখানে ২/৩টি গরু দেওয়া হয়। আশার খবর হলো প্রধানমন্ত্রী শকুনের সবচেয়ে ক্ষতিকর কিটোপ্রোফেন চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি উৎপাদন নিষিদ্ধ করেছেন। এর আগে ২০১০ সালে ডাইক্লোফেনাক উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়। একমাত্র ডাইপ্রোফেন ও কিটোপ্রোফেন ওষুধের কারণেই পৃথিবীতে ৯৯.৯৯ শতাংশ শকুন হারিয়ে গেছে।