সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



চল্লিশ বছর আগে ইমাম হত্যা, আজও বাড়ি ঘিরে রেখেছে কাকের দল!



বিজ্ঞাপন

সাইফুল্লাহ হাসান :: বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা। সূর্য তখন ডুব দিচ্ছে পশ্চিম আকাশে। ঠিক তখনই সুনসান নীরবতার মাঝে কা-কা শব্দে প্রাণচঞ্চল বাড়িটি। অন্ধকার হয়ে আসার আগে কাকের ঝাঁক বাড়িটির গাছ ও বাঁশঝাড় ঘিরে ফেলে। তখন সন্ধ্যা হওয়ার আগেই কাকে কালো হয় পুরো বাড়ি। মনে হয় এটি যেন তাদের রাজকীয় বাড়ি।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের মেদেনিমহল গ্রামে এই বাড়ি। সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে জানা যায়, খুব ভোরে কাক দল বেধে খাবারের সন্ধানে তাদের আবাসস্থল ছাড়ে। উপজেলার শহরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা ছুটে বেড়ায়। দিন শেষে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা ঝাঁক বেধে আবারও চলে আসে গন্তব্যে।

এলাকাবাসী জানান, চল্লিশ বছর আগে এই বাড়িতে বসবাস করতেন এখলাস নামের একজন ইমাম। কিন্তু একটি বিরোধের জেরে ইমামকে গলা কেটে হত্যা করে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি। এরপর থেকে ওই ইমামের বাড়ির চারপাশ ঘিরে রেখেছে কাকের দল। এখনো তারা রয়েছে। ধীরে ধীরে কাকদের সংখ্যাও বাড়ছে। সেজন্য এরপর থেকেই এলাকার লোকজন ‘কাকের বাড়ি’ নামে ডাক শুরু করেন।

জেলা শহর থেকে অনেকটা আড়ালে হওয়ায় মেদেনিমহল গ্রামটির এই বাড়িটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা বলেন, আমাদের গ্রামের এই বাড়িতে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে কাক পাখি বসবাস করে। অনেক পাখি দেখে আমার এলাকার মানুষ আনন্দিত। সবাই বাড়ির নাম দিয়েছে কাকের বাড়ি। সরকারের কাছে অনুরোধ করছি এগুলো সংরক্ষণ করার জন্য। আমাদের গ্রামেও বিভিন্ন সময়ে অনেক ধরনের পাখি আসে। অতিথি পাখিরা এখানে আসে আবার সময় হলে চলে যায়।

এলাকার মসজিদের ইমাম আবু তোরাব বলেন, এই ‘কাকের বাড়ি’ আমাদের এলাকার সৌন্দর্য। পাখিগুলো দেখে দর্শকদের মনের মধ্যে আনন্দ জাগে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই পরিবেশ যদি আমরা ধরে রাখতে পারি, তবে আমাদের মনের আনন্দ প্রেরণা ও উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে।

জানা যায়, কাক পাখি বিচরণ করে যত্রতত্র। শুধু তাই নয়, মানুষের সান্নিধ্য পেতে এরা বাড়ির আশেপাশে থাকে। উচ্ছিষ্ট, পচাগলা খেয়ে মানুষের যথেষ্ট উপকারও করে এই পাখি। দলের কেউ অন্যায় করলে নিজেদের ভেতর বোঝাপড়া করে। মানুষ বা অন্য কারো দ্বারা আক্রান্ত হলে দলের সবাই মিলে একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ জানায়। দেশে পাতি কাক ও দাঁড় কাক, এই প্রজাতির কাক দেখা যায়।

বলা যায়, সর্বভূক পাখি এরা। প্রজনন মৌসুম মার্চ থেকে জুন। বাসা বাঁধে গাছের উঁচু শাখায়। অথবা বাড়ির কার্নিসে এবং বিদ্যুতের খুঁটিতেও। উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে সরুডাল, ঘাস, লতাপাতা ইত্যাদি। ডিম পাড়ে ৪-৬টি।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী কামরান আহমদ বলেন, পাখিরা সাধারণত গাছে, ডাল পালায় ও লতাপাতায় বসে। কিন্তু বৃক্ষ নিধনের ফলে পাখিরা আজ বিলুপ্তির দিকে। একসময় রাজনগর উপজেলায় পাখি বাড়ি ছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অযত্নের কারণে পাখিরা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। আমি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো, তারা যেন এই কাকের বাড়ি সংরক্ষণে তৎপর থাকে। এটা আমাদের এলাকার সৌন্দর্য, এই কাকগুলো এলাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রেজাউল ইসলাম রেজা বলেন, হাজার হাজার কাক পাখি এখানে বসবাস করে। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। আমি কাক পাখি, বক পাখিসহ আমাদের এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবাইকে মেদিনিমহল গ্রামে স্বাগত জানাই।

রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল বলেন, এই বাড়ি সম্পর্কে আগে জানতাম না। আমরা বন বিভাগের মাধ্যমে এই জায়গা পরিদর্শন করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবো।