সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



আফগানিস্তানে খেল খতম



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: আফগানিস্তানে সরকারের পতন হয়েছে। তালেবানের কাছে অসহায় ‘আত্মসমর্পণ’ করে রোববার পদত্যাগ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি। এর পরেই তিনি তাজিকিস্তানে আশ্রয় নেন। এরইমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন একটি সরকার গঠন করেছে তালেবানরা। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, তালেবানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এর আগে আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত আফগান সরকার। তালেবানদের দাবি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা চলছে। এসবের আগে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে তালেবানরা।

২০ বছর আগে তালেবানের ‘শত্রু’রা আফগানিস্তান যেভাবে তাদের দখলে নিয়েছিল, ২০ বছর পর এসে অনেকটা সেভাবেই একের পর এক আফগানিস্তানের একেকটি অঞ্চল পুনরায় দখলে নিয়ে শেষে গোটা দেশই দখলে নিয়ে নিয়েছে তালেবানরা। হলিউড মুভির মতো এর নাম দেয়া যায় ‘দ্য রিটার্ন অফ দ্য তালেবান’ বা ‘তালেবানের ফিরে আসা’।

আজ থেকে বিশ বছর আগে, ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান দিয়ে হামলা চালানো হয়, যে ঘটনায় নিহত হন প্রায় তিন হাজার মানুষ। দেশটির রাজধানী ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে অবস্থিত প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগন ভবনেও বিমান হামলা চালানো হয়। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং অভিনব ওই হামলায় সারা দুনিয়া তাজ্জব বনে যায়।

জানা যায়, ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন উগ্র মতাদর্শের ইসলামপন্থি সংগঠন আল-কায়েদা আফগানিস্তান থেকে ওই হামলার পরিকল্পনা করেছিল। মুসলিম বিশ্বে সংঘাত সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোকে দায়ী করে আল-কায়েদা হামলার দায় স্বীকারও করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করেন। ওই হামলার এক মাসেরও কম সময় পর প্রেসিডেন্ট বুশ আল-কায়েদাকে নিশ্চিহ্ন করতে এবং ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করতে যুক্তরাজ্য সহ অন্য মিত্রদের নিয়ে আফগানিস্তান আক্রমণ করেন। কারণ, ওসামা বিন লাদেন তখন আফগানিস্তানে তালেবানের আশ্রয়ে ছিলেন। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার লাদেনকে ‘হস্তান্তরে’ অস্বীকৃতি জানালে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায়। তখন বিভিন্ন জরিপে অংশগ্রহণ করা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘সঠিক’ বলে মত দেন। ওই যুদ্ধের নাম দেয়া হয় ‘ওয়ার অন টেরর’ বা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। কিন্তু যুদ্ধের পক্ষে ধীরে ধীরে জনসমর্থন কমতে থাকলেও যুদ্ধ থেমে থাকেনি।

১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর আলোচনায় ওঠে আসা সংগঠন তালেবান মাত্র দুই বছরের মধ্যে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশটির অধিকাংশ এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এরপর দেশটিতে কড়া শরিয়া আইন চালু করা হয়। পশ্চিমারা তখন থেকেই এগুলোকে ‘মানবাধিকারের লঙ্ঘন’ বলে তালেবানের ব্যাপক সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছিল। মূলত, আফগানিস্তানে এক দশকব্যাপী সোভিয়েত দখলদারিত্বের অবসানের পর সেখানে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই যুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল তালেবানরা। সব সময়ই তালেবানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং নেতৃত্ব ছিল গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা।

যাই হোক, ওই বছর অর্থাৎ ২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর আফগানিস্তানে সামরিক হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক বাহিনী। আগেই বলা হয়েছে, তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় তালেবান। তালেবানদের উপর স্থল, আকাশপথে হামলা চালিয়ে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে ন্যাটো।

কিন্তু, খুব দ্রুত আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে তালেবানকে অপসারণ করা হলেও দেশটিতে থেকে যায় বিদেশি সৈন্যরা। যুক্তরাষ্ট্রের মদতে ২০০৪ সালে সেখানে এক নতুন আফগান সরকার দায়িত্ব নেয়। হামিদ কারজাই প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হলেও পরে (২০১০ সালে) ‘নির্বাচিত’ প্রেসিডেন্ট হন। ওদিকে আফগানিস্তানের পাশাপাশি তালেবানদের ধ্বংস করার জন্য পাকিস্তানেও বিমান হামলা চালানো হয়। ২০১১ সালে লাদেনকে পাকিস্তানে অভিযান চালিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৩ সালে আফগান সরকার জানায়, পাকিস্তানের করাচিতে শারীরিকভাবে অসুস্থ তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমর মারা গেছেন। অবশ্য পাকিস্তান মোল্লা ওমর তাদের দেশে থাকার কথা অস্বীকার করেছিল।

বিচ্ছিন্নভাবে তালেবানরা আত্মঘাতী থেকে শুরু করে সব রকমের হামলা চালাতেই থাকে। ন্যাটোও ছেড়ে কথা বলেনি। চলতে থাকে হামলা, পাল্টা হামলা ও রক্তপাত। দুই পক্ষেরই বহু সেনা হতাহতের বাইরে অনেক বেসামরিক নারী-পুরুষ, শিশুর করুণ মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালে, ন্যাটো আফগানিস্তানে তাদের সরাসরি লড়াইয়ের সমাপ্তি টানে। যুক্তরাষ্ট্রও তাদের হাজার হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করা শুরু করে। অবশিষ্ট সেনাদের মূলত আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দেয়ার কাজে লাগানো হয়।

এদিকে, তালেবানের সহিংস হামলা অব্যাহত থাকে। ইতিমধ্যেই তারা পালিয়ে গিয়ে নতুন করে সংগঠিত হয়েছিল। ন্যাটোর সরাসরি লড়াইয়ের অবসানের সুযোগে তারা একের পর এক হামলা চালাতে থেকে। আইএস জঙ্গিরাও আফগানিস্তানে হামলা চালাতে শুরু করে বলে মনে করা হয়।

ওদিকে, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সেখান থেকে যেনো আর কোনো সন্ত্রাসবাদী হুমকি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার করে যুক্তরাষ্ট্র। তবু, বিক্ষিপ্তভাবে হামলা চালাতেই থাকে তালেবানরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর উপর্যুপরি হামলার মুখে তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তালেবানদের সঙ্গে কাতারের সহযোগিতায় আলোচনা শুরু করে। ২০২০ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি, কাতারের রাজধানী দোহায় আফগানিস্তানে ‘শান্তি ফিরিয়ে আনতে’ চুক্তিতে সই করে যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবান। তালেবান ওই চুক্তি মেনে চললে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো ১৪ মাসের মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহারে রাজি হয়।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হয়ে সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। তিনি ওয়ান-ইলেভেনের ২০ বছর পূর্তি অর্থাৎ ২০২১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের আগেই ন্যাটোভুক্ত সব সৈন্যকে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে বলেন, ‘নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলায় জড়িতদের ও ওসামা বিন লাদেনের বিচারের মধ্য দিয়ে’ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। ‘আফগানিস্তানকে গড়ার জন্য’ আমরা সেখানে যাইনি। নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং দেশ কীভাবে চলবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব আফগান জনগণের। ৩১শে আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে চূড়ান্ত ধাপে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। সে অনুযায়ী চলতি বছরের মে মাস থেকেই আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। এখন নামমাত্র কিছু বিদেশি সেনা রয়েছে দেশটিতে।
এদিকে, সেনা সরিয়ে নেয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে একের পর এক হামলা চালায় তালেবানরা। এ বছরের শুরু থেকেই তালেবানরা দেশব্যাপী তাদের অবস্থান অনেক শক্ত করে বিভিন্ন এলাকা নিজেদের দখলে নেয়।

মূলত, গত বছর ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করার পর তালেবানরা এলাকা দখলের লড়াই জোরদার করে। আর তখন থেকেই তালেবানের সামনে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্বলতা নগ্ন হতে শুরু করে। বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে যত অর্থ ব্যয় করেছে তার শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি খরচ করেছে আফগান সেনা এবং নিরাপত্তা বাহিনী গঠনে। কিন্তু বিদেশি সেনারা চলে যাওয়ার পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে আফগান সরকারি বাহিনী। বন্যার পানির মতো নতুন নতুন এলাকায় ঢুকে পড়ে তালেবানরা। একের পর এক এলাকা আর শহর দখল করে শেষে চতুর্দিক থেকে এসে রাজধানী দখলে নেয় তালেবানরা। পতন হয় সরকারের। এর মধ্য দিয়ে, ফাঁস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য সময়ের অনেক আগেই আফগান সরকারের পতন হলো।