বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



সিলেটে উপহারের ঘরে ফাটল, দেওয়া হচ্ছে জোড়াতালি



বিজ্ঞাপন

তুহিনুল হক তুহিন :: সিলেটে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত ঘরে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন উপকারভোগীরা। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় কয়েকটি ঘরে ধরেছে ফাটল। নিজ খরচে এসব ঘর মেরামত করছেন উপকারভোগীরা। খবর: বাংলা ট্রিবিউন

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকারমূলক এই প্রকল্পে সিলেটে গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারকে ঘর দেওয়ার লক্ষ্যে গত বছর কাজ শুরু হয়। সিলেটের চার হাজার ২৯৩ গৃহহীন পরিবার পাচ্ছেন উপহারের ঘর। এরইমধ্যে অর্ধেকের বেশি ঘরের দলিল উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। চলতি বছর বাকিগুলোও হস্তান্তরের কথা রয়েছে। ৩৯৪ বর্গফুটের এসব ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে। প্রতিটি ঘরে রয়েছে দুটি কক্ষ। সেই সঙ্গে রয়েছে রান্নাঘর এবং বাথরুম।

ইতোমধ্যে দুই দফা ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিলেটের ১৩ উপজেলায় দুই হাজার ২৫৯টি ঘরের দলিল উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সিলেট সদর উপজেলায় ৭৫টি, দক্ষিণ সুরমায় ৬৪টি, বিশ্বনাথে ১৮৫টি, ওসমানীনগরে ৩৩৪টি, বালাগঞ্জে ২০৭টি, গোলাপগঞ্জে ৯৬টি, বিয়ানীবাজারে ১০৪টি, জকিগঞ্জে ৭৬টি, কানাইঘাটে ১৯৩টি, গোয়াইনঘাটে ৩১০টি, কোম্পানীগঞ্জে ২৫০টি, জৈন্তাপুরে ২৩৫টি ও ফেঞ্চুগঞ্জে ১৩০টি।

তবে ঘরগুলো নির্মাণে অপরিকল্পিত, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন উপকারভোগীরা। সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের সাহেবের বাজার এলাকার চাঁদপুর গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মুখলেছুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়ে আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন ভয় হয় কখন ভেঙে পড়ে। ঘরে রড দেওয়া হয়নি। বাতাস এলে ঘর নড়ে। আমরা আতঙ্কে আছি।’

এদিকে নতুন ঘরের দেয়াল ফেটে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরও কয়েকজন বাসিন্দা।

বিয়ানীবাজারের কটুখালিরপার গ্রামের ফয়জুর রহমান বলেন, ‘ভূমিহীন বলেই ঘর পেয়েছিলাম। কিন্তু টয়লেট ভাঙা। নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। টিউবওয়েলের ব্যবস্থা নেই। ঘরের দেয়ালের একাধিক স্থানে ফাটল ধরেছে। বাধ্য হয়ে মিস্ত্রি ডেকে টয়লেট ঠিক করেছি। পাশাপাশি ঘরের দেয়ালের পলেস্তারা মেরামত ও রঙ করেছি। নিজ উদ্যোগে বিদ্যুতের মিটার স্থাপন করেছি। যদি সবই নিজেদের জোড়াতালি দিতে হয় তাহলে তারা কেমন কাজ করলেন।’

বিশ্বনাথ ও বিয়ানীবাজারের ঘরগুলো পরিদর্শন করে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে সিলেটে আসা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধি দল। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল গত ১০ জুলাই বিশ্বনাথ ও গোলাপগঞ্জে ঘরগুলো ঘুরে দেখেন। ঘরগুলোর ত্রুটি নিয়ে উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আসলাম উদ্দিন বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ঘর তদারকি করে বড় ধরনের কোনও দুর্নীতি পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসনের টিম বিভিন্ন উপজেলা পরিদর্শন করে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি পেয়ে ঘরগুলো মেরামত করেছে। বড় ধরনের কোনও ত্রুটি পাইনি আমরা। অনেকেই বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যার কথা জানিয়েছেন। যেটি বেশি জরুরি সেটি করে দিচ্ছি আমরা।’

তিনি বলেন, ‘নতুন ঘর নির্মাণের পর বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। এসব ছোটখাটো সমস্যা নিজেদের সুবিধার্থে মেরামত করে নেওয়া প্রয়োজন। বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সমাধান করে দেওয়া হচ্ছে। সিলেটের কিছু কিছু এলাকা বন্যাকবলিত। এসব এলাকার মাটি সব সময় নরম থাকে। ফলে এখানে ঘর নির্মাণের পর একটু সমস্যা দেখা দেয়। এখানেও তাই হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের তদন্ত দল বড় কোনও দুর্নীতির সত্যতা পায়নি।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘তদারকির সময় অনেক উপকারভোগী বলেছেন, ঘর দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু দরজা ভালোভাবে লাগানো যায় না। আমরা বলেছি, ঘরে যেহেতু নিজেরাই বসবাস করছেন, সেহেতু ছোট কাজগুলো নিজেদের সমাধান করে নেওয়া ভালো। বড় সমস্যা দেখা দিলে আমাদের নজরে আসার পরপরই সমাধান করে দিচ্ছি। প্রথম প্রকল্পে সিলেট জেলায় ঘর নির্মাণের জন্য এক লাখ ৭১ হাজার ও পরিবহনের জন্য আরও চার হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। এজন্য প্রতিটি ঘরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা। দ্বিতীয় প্রকল্পের আওতায় সিলেটের কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাটে এক লাখ ৯০ হাজার টাকা খরচ করে ১১৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।’

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিভাগ সিলেটের উপ-পরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। তবে এই প্রকল্পের আওতায় সিলেটের চার হাজার ২৯৩ গৃহহীন পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারের ঘর পাচ্ছেন- এইটুকু জানি।