বুধবার, ২৩ জুন ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



প্রবাসীদের ফিরতে যত ভোগান্তি



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: তিন মাসের ছুটিতে সৌদি আরব থেকে দেশে এসেছিলেন মুন্সীগঞ্জের আহসানুল্লাহ। ২৬শে মে তার ফিরে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু সৌদি সরকারের নতুন নিয়মের কারণে বাংলাদেশ- সৌদির ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় তার ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। এখন ফ্লাইট শুরু হলেও কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত তিনি সৌদি ফ্লাইট শিডিউল পাননি। অন্যদিকে নতুন নিয়মের কারণে তাকে সৌদি ফিরে ৭ দিন নিজের খরচে হোটেলে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। বাংলাদেশ থেকে একবার করোনা টেস্ট করে কোয়ারেন্টিনে থাকার পরও সৌদিতে দু’বার করোনা টেস্ট করাতে হবে। এর জন্য দিতে হবে অতিরিক্ত খরচ।


সব মিলিয়ে সৌদি যাত্রায় তাকে বাড়তি গুনতে হবে অন্তত ৭০ হাজার টাকা। একদিকে বাড়তি খরচের বোঝা, অন্যদিকে ফ্লাইটের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। এ অবস্থায় কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তিনি। শুধু আহসানুল্লাহ নন, সৌদি, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতারসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এমনকি বিদেশে পৌঁছেও পড়তে হচ্ছে বিপদে।

গতকাল কাওরান বাজারে সৌদি এয়ারলাইন্স অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অন্যদিনের মতোই এখানে হাজারো প্রবাসী কর্মস্থলে ফেরার জটিলতা নিয়ে ভিড় করছেন। কারো ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, কারো বা হোটেল বুকিং নিশ্চিত না হওয়ায় বিপদে পড়েছেন। এ অবস্থায় এয়ারলাইন্স অফিস বন্ধ থাকায় কোনো উপায়ও পাচ্ছেন না। কয়েকজন সৌদি প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে যেমন হোটেল বুকিংসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে, তেমনি সৌদি পৌঁছেও পড়তে হচ্ছে বিপদে। মোমিনুল নামে একজন সৌদি প্রবাসী জানান, সেখানে পৌঁছে সাতদিন হোটেলে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হচ্ছে তাদের। করতে হচ্ছে দু’দফায় করোনা পরীক্ষাও। দুইবার নেগেটিভ এলে সপ্তম দিনে হোটেল ছেড়ে কর্মস্থলে ফেরা যাবে। এমন পরিস্থিতিতে দেখা দিয়েছে নতুন বিপদ। কোয়ারেন্টিন শেষ হওয়ার পরও কোনো কোনো হোটেল করোনা পরীক্ষা করাচ্ছে না। আবার কোথাও নমুনা নিলেও রিপোর্ট ছাড়াই বের করে দেয়া হচ্ছে প্রবাসীদের। ফলে একদিকে দ্বিতীয় দফার টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া নিয়ে চিন্তা, অন্যদিকে রিপোর্ট ছাড়া হোটেল থেকে বের হলে সৌদি সরকারের জরিমানা বা শাস্তির আতঙ্কেও রয়েছেন প্রবাসীরা। কারণ সম্প্রতি সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউশন নতুন নিয়ম করেছে, কেউ যদি করোনাভাইরাস ছড়ায় তাকে ৫ বছরের জেল এবং সর্বোচ্চ ৫ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করা হবে। যদি ওই ব্যক্তি প্রবাসী হয়, তবে তাকে শাস্তির পর সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত করা হবে এবং তিনি আর কোনো দিন দেশটিতে যেতে পারবেন না।

গত ১০ই মে সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে জানিয়ে দেয়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যারা ভ্যাকসিন নেননি, তারা সৌদি আরবে প্রবেশ করলে সাতদিনের বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। ২০শে মে থেকে কার্যকর হওয়া এই নিয়ম অনুযায়ী হোটেলের খরচ বহন করতে হবে যাত্রীকেই। হোটেলে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে থাকতে গুনতে হবে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। জানা গেছে, সৌদি এয়ারলাইন্স জেদ্দার জন্য ন্যূনতম ৫৫ হাজার এবং রিয়াদের জন্য ন্যূনতম ৬৫ হাজার টাকা খরচ হিসেবে নিচ্ছে। সাতদিন হোটেলে থাকার পাশাপাশি এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার গাড়ি, খাবার, করোনা পরীক্ষার খরচ সেখানে অন্তর্ভুক্ত। প্রবাসীদের অভিযোগ, হোটেলের মান অনুযায়ী খাবার ও সেবা সেভাবে দেয়া হচ্ছে না। সিঙ্গেল রুম বুক করলেও হোটেলে গিয়ে রুম শেয়ার করতে হচ্ছে অন্যদের সঙ্গে।

মুন্সীগঞ্জের আহসানুল্লাহ জানান, গত ২৬শে মে তার ফ্লাইট থাকলেও তা স্থগিত হওয়ায় এখন পর্যন্ত তিনি সৌদি যেতে পারেননি। নতুন করে শিডিউল নিতে গিয়ে সৌদি এয়ারলাইন্সের কাছে কোনো ধরনের তথ্য পাননি বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, এজেন্সির সঙ্গে কথা হয়েছে যে ফ্লাইটের ডেট পেলে তারা ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সৌদি এয়ারলাইন্সে গিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কাওরান বাজারে গিয়ে সব সময় তাদের অফিস বন্ধ পাই। কারো কাছে কোনো তথ্যও পাওয়া যায় না। আমার মতো এমন হাজার হাজার প্রবাসী আছেন যারা এই সমস্যায় পড়েছেন। কবে আমরা যেতে পারবো, কবেই বা কাজে যোগ দিতে পারবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

সৌদি থেকে তিন মাসের ছুটিতে এসেছিলেন নাটোরের মারুফ। তার ফেরার ফ্লাইট আগামী ২রা জুন। কিন্তু এখনো হোটেল কোয়ারেন্টিন বুকিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হতে না পারায় কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি। কয়েক দফা সৌদি এয়ারলাইন্সে গিয়ে কোনো ধরনের তথ্য পাননি তিনি। সৌদি এয়ারলাইন্স অনলাইনে ৭২ ঘণ্টা আগে বুকিংয়ের কথা বললেও চেষ্টা করে কোনো কাজ হয়নি। এ অবস্থায় সরাসরি তিনি সৌদির একজন পরিচিতজনের মাধ্যমে হোটেল বুকিং দেয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু এর জন্য তাকে গুনতে হবে ৭৪ হাজার টাকা। মারুফ বলেন, এখন হোটেল বুকিং নিয়ে শঙ্কায় আছি। যদি বুকিং দিতে না পারি তাহলে তো ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাবে। হাতে সময়ও কম তাই সৌদিতে আমার পরিচত একজন আছে, ঢাকায় তার বড় ভায়ের মাধ্যমে সৌদির হলিডে হোটেল বুকিং দেয়ার ব্যাপারে কথা হয়েছে। কিন্তু টাকা লাগবে ৭৪ হাজার। আবার করোনা টেস্টে যদি পজেটিভ আসে তখন টাকাও আর ফেরত দেয়া হবে না। এমন শর্তে টাকা বেশি লাগলেও বুকিং দেয়ার চিন্তা করছেন মারুফ। তবুও কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে যেন শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ সৌদিতে পৌঁছেও অনেক ধরনের বিপদের কথা শোনা যাচ্ছে।


শুধু সৌদি নয়, জানা যায় করোনাকালে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখ লাখ প্রবাসী কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। ছুটিতে দেশে এসে গত দেড় বছরে অন্তত ২৫ হাজার মালয়েশিয়া প্রবাসী আটকে আছেন। করোনার কারণে বিভিন্ন জটিলতায় তারা এখনো ফিরতে পারেননি। এ ছাড়া কুয়েত, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরাও একই সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে ফ্লাইটের নির্ধারিত সময় আগে করোনা টেস্ট নিয়েও অনেকে বিপাকে পড়ছেন। কারণ অনেক জেলায় আরটিপিসিআর ল্যাবে করোনা পরীক্ষার সুযোগ নেই। তাই তারা বাধ্য হয়ে পাশের জেলা বা রাজধানীতে আসছেন পরীক্ষা করাতে।