শনিবার, ৮ মে ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



সিলেটে বেসামাল শংকু রানী



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: তিনি শিক্ষক, মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় জড়িত থাকা স্বত্বেও, ভরা এজলাসে বিচারককে হুমকি, পুলিশ সদস্যদের উপর হামলার মতো ঘটনার জন্ম দিয়েছেন তিনি আগেই। এবার আদালত প্রাঙ্গণে এক নিরীহ গৃহকর্মীকে মারধর এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ‘বাঁশ’ দেওয়ার হুমকি দিয়ে আলোচনায় এসেছেন শংকু রানী সরকার লিলি (৩৬)। ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় সিলেটের আদালতপাড়ায়। ‘প্রতারণা’ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সিলেট জজ কোর্টের বার হল নং-২ এর আইনজীবীদের হাতে আটক হওয়ার পর গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে হুংকার ছাড়েন শংকু রানী। নিজেকে ক্রাইম রিপোর্টার, আয়কর আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীসহ একাধিক পরিচয় দিয়েও রক্ষা হয়নি। অবশেষে ক্ষমা প্রার্থনা করে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন তিনি। শংকু রাণী সরকার নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার কেশবপুর গ্রামের অপূর্ব কান্তি তালুকদারের স্ত্রী। শংকু রানী সরকারের বাবার নাম মহারাজ সরকার। বর্তমানে সপরিবারে সিলেট শহরতলীর খাদিমনগর এলাকার বহর মনিপুরীপাড়ার নিপবন এলাকায় থাকেন। তিনি বিশ্বনাথ সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক। খবর: একাত্তরের কথা।


জানা গেছে, চলতি বছরের ১৩ মার্চ বিকেল ৪টার দিকে দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ শনিবার দক্ষিণ সুরমার কদমতলি এলাকার মুক্তিযোদ্ধা চত্বর থেকে মালামাল বহনকারী সন্দেহজনক প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-গ-১২-২০৭৩) আটক করে। পরে সেটি তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য জব্দ করে। এসময় প্রাইভেটকারের চালক মেহেরাজ আহমদ, যাত্রী মো. মুর্শেদ, মুন্না আহমেদ এবং মো. আলী আজগর নামে চারজনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। সেই থেকে কারাগারেই রয়েছে গাড়িচালক মেহেরাজ।

মূল বাড়ি জকিগঞ্জের রতনগঞ্জ গ্রামে হলেও, বর্তমানে নগরীর মিরাবাজার এলাকার বাসিন্দা মেহেরাজ আহমদের দিনমজুর বাবা পারভেজ আহমদ ও গৃহকর্মী মা শিল্পী বেগম অভাব অনটনের মধ্যেও অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে এবং সহায় সম্বল সব বিক্রি দরে মাত্র কিছুদিন আগে ছেলেকে সেকেন্ড হ্যান্ড প্রাইভেটকারটি কিনে দেন। তরুণ মেহেরাজের ড্রাইভিং লাইসেন্সও ইস্যু হয়নি। এমনকি গাড়ির পূর্বের মালিকের কাছ থেকে নাম ট্রান্সফারও করা হয়নি। তার আগেই পুলিশের হাতে গাড়িসহ ধরা পড়েন মেহেরাজ। তার পরিবারের দাবি, মেহেরাজের গাড়িতে মালগুলো পাওয়া গেলেও, মেহেরাজ চোরাচালানের সাথে জড়িত নন। চট্টগ্রামের বাসিন্দা ও সিলেট নগরীর দরগাহ গেইট এলাকার ব্যবসায়ী আলী আজগর জাফলং এলাকায় যাতায়াতের জন্য প্রাইভেটকারটি ভাড়া নেন এবং আলী আজগরের মালামাল নিয়ে ফেরার পথেই পুলিশ আটক করে তাদের।

এদিকে, মেহেরাজ আটক হওয়ার পর তার বাবা পারভেজ ও মা শিল্পী তাদের পূর্বপরিচিত মেজরটিলা এলাকার দুলাল মিয়া নামে এক দালালের মাধ্যমে প্রথমবার শহরতলীর খাদিমনগর বহর মনিপুরিপাড়ায় নিপবন আবাসিক এলাকায় শংকু রানী সরকারের বাসায় যান। সেখানে দুলাল শংকু রানীকে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পারভেজ ও শিল্পীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় শংকু রানী মেহেরাজের জামিন এবং প্রইভেটকারটি আদালত থেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য ১৪ হাজার টাকা নেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪৫ হাজার টাকা নেন ‘কথিত আইনজীবী’ শংকু রানী। শিল্পী বেগম মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে টাকা জমিয়ে শংকু রানীর হাতে তুলে দেন।

কিছুদিন আগে শংকু রানী শিল্পীকে জানান, বুধবার তার ছেলের জামিন হয়ে যাবে। ওই দিন ছিলো মামলার শুনানী। কিন্তু বুধবার সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত আদালত প্রাঙ্গনে অপেক্ষা করার পরও মেহেরাজের জামিন না হওয়ায় শংকু রানী সরকারের কাছে এর কারণ জানতে চান শিল্পী বেগম, ফেরত চান ৪৫ হাজার টাকা। তাতেই চটে যান শংকু। বার হল নং-২ এর সামনে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে শিল্পীর উপর চড়াও হন তিনি। মারধরের একপর্যায়ে আইনজীবীরা এগিয়ে এসে উদ্ধার করেন শিল্পীকে। এ সময় আটক করা হয় ভুয়া আয়কর আইনজীবী শংকু রানী সরকারকেও। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে। এ সময় শংকুর গলায় ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস্ ক্রাইম রিপোর্টার্স ফাউন্ডেশন (আইএইচসিআরএফ) নামের একটি মানবাধিকার সংস্থার কার্ড ঝুলছিলো। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে শংকু রানী সরকার লিলির একটি ভিজিটিং কার্ড পাওয়া যায়। নিজেকে আয়কর আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করে ভুয়া কার্ডটি বানিয়েছিলেন তিনি। সেখানে দেওয়া বাসার ঠিকানা শহরতলীর মেজরটিলা এলাকার ৩৫/২ নম্বর এন আর টাওয়ারে যোগাযোগ করা হলে শংকু রানী বা অপূর্ব কান্তি তালুকদার নামে কেউ সেখানে থাকেন না বলে জানা গেছে।


এদিকে শংকু রানীকে আটকের পর গণমাধ্যমকর্মীরা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি নিজেকে বিশ্বনাথ সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে পরিচয় দেন। এতেও কাজ হচ্ছিল না দেখে সাংবাদিকদের উপর ক্ষেপে যান শংকু রানী। তিনি বলেন, তোদের বাঁশ দিবো বাঁশ। আমি ক্রাইম রিপোর্টার। সব সাংবাদিকদের বাঁশ দিবো। একটা নয়, ৯টা বাঁশ দিবো।’ এ সময় তিনি ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস্ ক্রাইম রিপোর্টার্স ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম হুমায়ুন কবির নামে এক ব্যক্তির কাছে ফোন করে সিলেটের স্থানীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নালিশ করেন। পরবর্তীতে শংকু রানীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন উপস্থিত আইনজীবীরা।

অবস্থা বেগতিক দেখে নিজের ভুল স্বীকার করে নেন শংকু রানী। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দর কাছে স্বীকার করেন যে তিনি আয়কর আইনজীবী নন। শুরু করেন কান্নাকাটি। তার কাকুতি-মিনতিতে মন গলে যায় সিলেটের আইনজীবীদের। অবশেষে বুধবার বিকেলে ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দিয়ে পরবর্তীতে কখনো এরকম প্রতারণা করবেন না মর্মে লিখিত মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান শংকু রানী সরকার লিলি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান বলেন, তিনি একজন কলেজের প্রভাষক বলে শুনেছি। কিন্তু কেন এ ধরণের কাজে লিপ্ত হলেন সেটা চিন্তার বিষয়। শংকু রানী কোনো আইনজীবী নন। তার ভিজিটিং কার্ডটিও ভুয়া। বার কাউন্সিল সনদ তো দূরের কথা, তিনি আইন বিষয়ে অধ্যয়নও করেন নি। পরবর্তীতে কখনো এ ধরণের কাজ করবেনা মর্মে মুচলেকা দিয়ে শংকু রানীকে এবারের মতো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ২০০৬ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) অধীনে ২য় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় (রোল নং-৫২১২০০৬৪, রেজিস্ট্রেশন নং-৬৪০৭৩৯৭/২০০৬) উত্তীর্ণ হন শংকু রানী সরকার লিলি। বর্তমানে তিনি বিশ্বনাথ সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিষয়ের প্রভাষক। দীর্ঘদিন ধরে এই কলেজে কর্মরত আছেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্বনাথ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ তাপসী চক্রবর্তী লিপি।

শংকু রানী রাজস্ব বোর্ডের অধীনে আয়কর উপদেষ্টা বা ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার (ইটিপি) হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে ‘আয়কর পেশাজীবী’ হিসেবে সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সদস্যও হন। কিন্তু তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ২০১৩ সালে তাকে সমিতি থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমদাদুল হক।
তিনি জানান, শংকু রানী সরকার একজন প্রতারক এবং বিতর্কিত নারী। তিনি আইনজীবী নন। একসময় আয়কর পেশাজীবী ছিলেন। কমার্সের শিক্ষার্থীরা রাজস্ব বোর্ডের অধীনে একটি কোর্স সম্পন্ন করে আয়কর পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে নিবন্ধিত করে কর আইনজীবী সমিতিতে সদস্য হতে পারেন। তাদের কাজ ক্লায়েন্টদের আয়কর সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান করা। তারা ক্লায়েন্টদের আয়কর সংক্রান্ত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে থাকেন। কিন্তু শংকু রানী সরকার আইনজীবী তো দূরের কথা জেলা কর আইনজীবী সমিতির সদস্যও নন। তাকে ২০১৩ সালেই বের করে দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৩ মে সকাল পৌনে ১১টার দিকে সিলেট তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান হিরোর আদালতে শুনানিতে আসেন ১৫৭৪/২০১৭ নং মামলার বাদি শংকু রাণী সরকার। কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে শংকু রাণী সরকার আদালতের ভেতরে প্রবেশ করে আইনজীবীদের আসনে বসেন। কার্যক্রম শুরু হলে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তাকে আদালত কক্ষ থেকে বের হয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে শংকু রানী নিজেকে কর আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও আওয়ামী যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী দাবি করে বির্তকে জড়ান। ওই সময় উপস্থিত আইনজীবীরা তার পরিচয়পত্র দেখাতে বললে তিনি তাদের সঙ্গেও বাগবিতণ্ডায় জড়ান। তিনি বিচারককে জুতা প্রদর্শন করেন এবং পুলিশ সদস্যদের উপর হামলা চালিয়ে কিলঘুষি মারতে থাকেন শংকু। এ সময় আহত হন পুলিশ সদস্য রাহাত, শিউলি ও লিজা। পরবর্তীতে কনস্টেবল শিউলি বাদি হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় শংকু রানীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এরপর আদালত থেকে সোজা কারাগারে ঠাই হয় শংকু রানীর। সে সময় বেশ কিছুদিন কারাগারে ছিলেন তিনি।


তবে নিজের উপর অর্পিত সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবি করলেন শংকু রানী সরকার লিলি। তিনি বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, আমি আয়কর আইনজীবী ছিলাম। আমার প্রতিপক্ষ একটি গ্রুপ ষড়যন্ত্র করে আমাকে বহিষ্কার করেছে। আমি একজন কলেজের শিক্ষিকা। সাংবাদিকতাও করি। মানবাধিকারকর্মীও।

শিল্পী বেগমের কাছ থেকে তার ছেলের জামিন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, তবে আমি ৪৫ হাজার টাকা নেইনি। ২৫ হাজার টাকা নিয়েছি। ৪৫ হাজার টাকা নেয়ার কথা মিথ্যা। তবে এই ২৫ হাজার টাকা মামলার পেছনে খরচ হয়ে গেছে। আমি পরিমল বাবু নামের এক আইনজীবীকে শিল্পী বেগমের ছেলের মামলায় নির্ধারিত করেছি। ছেলের জামিন হলে আমাকে আরও ২০ হাজার টাকা দেয়ার কথা। এরই মধ্যে আজ (বুধবার) তারা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে এবং আমাকে চিটার-বাটপার বলেছে।

তবে শংকু রানী সরকার নামে কাউকে চেনেন না বলে বুধবার রাতে জানিয়ে অ্যাডভোকেট পরিমল বলেন, মামলাটি আমাদের ক্লার্কের মাধ্যমে এসেছে।