শনিবার, ৮ মে ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



কুলাউড়ায় স্কুল-মসজিদ রক্ষায় ধসে যাওয়া টিলার মাটি অপসারণ করলেন এলাকাবাসী, নোটিশ পেলেন ইউপি চেয়ারম্যান!



বিজ্ঞাপন

কুলাউড়া প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ভাটেরায় টিলার মাটি দীর্ঘদিন ধরে ধসে গিয়ে একটি স্কুল ও মসজিদের দেয়ালের উপর আছড়ে পড়ে। এতে হুমকির মুখে পড়ে স্কুল ও মসজিদসহ কয়েকটি বাড়ি। তাই ধসে যাওয়া মাটি অপসারণ করেন স্থানীয় এলাকাবাসী। আর সেই ধসে যাওয়া টিলা কাটার ও মাটি বিক্রির অভিযোগ এনে স্থানীয় ইউপি চেয়াম্যানসহ ৭ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলো পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়। এ নিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের ইসলামনগরে।

সরেজমিন গিয়ে ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের পাহাড়ি জনপদ ইসলামনগরের বাসিন্দারা একটি স্কুলের অভাবে নিজেদের সন্তানদের পড়ালেখা করাতে প্রায় ৪/৫ কিলোমিটার দূরে যেতে হতো।


স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলামকে স্থানীয় বাসিন্দারা একটি স্কুল ওই এলাকায় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবী জানালে ইউপি চেয়ারম্যান এলাকার শিক্ষার বিস্তারে প্রায় তিন বছর আগে ওই এলাকার টিলার পাদদেশে ‘ইসলামনগর সৈয়দ সাজিদ-পিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয়’টি প্রতিষ্ঠা করেন। ওই এলাকাটি টিলা ভূমি শ্রেণীর। সেখানে সমতল ভূমির সংকট। স্কুলের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে প্রায় ৩৩ শতক নিজের কেনা টিলা শ্রেণীর ভূমি দান করেন চেয়ারম্যান। ওই ৩৩ শতকের প্রায় ৪ শতক জমির উপর বিদ্যালয়ে একতলা টিনশেডের ভবন নির্মাাণ করা হয়। বাকি ২৯ শতকের প্রায় ১২ শতক খালি স্কুলের মাঠ আর বাকি ১৭ শতক টিলা ভূমি। নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে প্রায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী পাঠদান করছেন। পাশে একটি জামে মসজিদ রয়েছে। কিন্তু প্রতি বছর অতিবৃষ্টিতে টিলার মাটি ধসে গিয়ে বিদ্যালয় ও পাশে থাকা মসজিদটির দেওয়ালে আছড়ে পড়ে। এছাড়াও পাশে থাকা ৪টি বাড়ির উপরও আছড়ে পড়ে। এতে হুমকির মুখে পড়ে ঐ স্কুল, মসজিদ ও বাড়িগুলো। ধসে যাওয়া সেই মাটি স্থানীয় লোকজন অপসারণ করে অন্যত্র নিয়ে যান। দীর্ঘদিন থেকে বৃষ্টির জলে ধসে যাওয়া স্কুলের টিলা ও পাশে থাকা বেগুন বেগমের টিলাটিও ধসে যায়। কিন্তু সেই ধসে যাওয়া টিলাটির মাটি কেটে নেওয়ার খড়গ ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় কয়েকজন নিরীহ লোকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে।

সরেজমিনে ইসলামনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের সভাপতি হাজী মো. সফর উদ্দিন, স্থানীয় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাব উদ্দিন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি হাজী কমর উদ্দিন, মো. বাবুল মিয়া, রেজু মিয়া, মো. ছমসুদ্দিন, আলমগীর হোসেন, রাজা মিয়া, কামাল উদ্দিনসহ প্রায় অর্ধশতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান- এই গ্রামে টিলা থাকায় কোন স্কুল ছিলনা। ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে আমাদের দাবি ছিলো এখানে একটি স্কুল করে দিবেন। চেয়ারম্যান নিজের পৈত্রিক ভূমি স্কুলের নামে করে দেন। টিলাটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা আগে থেকেই প্রতিবছর বৃষ্টির পানিতে ধসে পড়তো। এতে স্থানীয় মসজিদটিও হুমকির মুখে পড়ে।

তাঁরা বলেন,স্কুল, মসজিদের আশেপাশে নিচু ভূমি ও একটি ছড়া টিলার ধসে যাওয়া মাটিতে ভরে গিয়েছে। প্রতিবছর অতি বৃষ্টিতে টিলা ধসে যাওয়ায় টিলার অনেক ঘর ভেঙে গিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার অন্যত্র যাওয়ার জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে দরিদ্র এসব বাসিন্দা আবারো ধসে যাওয়া টিলার নিচে ঘর পুণঃনির্মাণ করে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে আসছেন। টিলার ধসে যাওয়া মাটিতে এসব ঘর, স্কুল ও মসজিদ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ধসে যাওয়া মাটিতে স্কুলের ও মসজিদের প্রায় দেয়ালের উপর পড়ে ৪ ফুট ভরে গিয়েছিলো। এতে স্কুলের দেয়াল ফাটল দেখা দিয়েছে। আবারো বর্ষা এলে বৃষ্টির পানিতে টিলার মাটি ধসে স্কুলের ও মসজিদের ভবন ভেঙে যেতে পারে। এলাকার কয়েকজন লোক মাটিগুলো নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিয়েছেন। আর ধসে যাওয়া টিলাটি ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলামসহ এলাকার নিরীহ লোকজন কেটে নিচ্ছেন এমন অপপ্রচারমূলক অভিযোগ তুলে কুচক্রী মহল। স্কুলটি এলাকার মানুষের শিক্ষার বিস্তারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ একটি কুচক্রী মহলের ইন্দনে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এলাকায় আসেন। তাড়াহুড়ো করে এলাকার লোকজনের বক্তব্য না শুনে মনগড়া প্রতিবেদন তৈরী করেন। চেয়ারম্যানসহ এলাকার নিরীহ ৭জন লোককে টিলা কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগে নোটিশ করেন।

তাঁরা আরো বলেন, এই এলাকাটি পাহাড়ি টিলায় ভরপুর। সমতল ভূমির সংকট মারাত্মক। টিলার ধসের মাঝেও ঝুঁকি নিয়ে বাস করছি। কিন্তু একটি গোষ্ঠি তাঁদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটের জন্য ও ক্ষোভ মিটানোর জন্য ধসে যাওয়া টিলাকে কেটে ফেলার ভূয়া অভিযোগ তুলে নিরীহ মানুষকে হয়রানী করে আসছে। আগামীতেও করবে। আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাই আমাদের এলাকার একমাত্র স্কুল ও মসজিদটি রক্ষা এবং নিরীহ মানুষকে হয়রানী থেকে মুক্ত করতে সঠিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।

ইসলামনগর সৈয়দ সাজিদ-পিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে দুই বছর আগে টিলা ধসে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা বেগুন বেগম বলেন, ‘স্কুলের টিলার পাশের টিলাটিতে আমার বসত ঘর ছিলো। বৃষ্টিতে দুই বছর আগে টিলার মাটি ধসে যাওয়ায় আমার একমাত্র বসত ঘরটি বিলীন হয়ে যায়। খোলা আকাশের নিচে আমি ও আমার পরিবার থাকছি দেখে চেয়ারম্যান সাহেব উনার আরেকটি টিলায় আমাকে ঘর বানিয়ে দেন। একেতো আমার নিজের ঘর হারিয়েছি টিলা ধসের কারনে। আর উল্টো আমাকে ও আমার স্বামীকে টিলা কাটার মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানী করা হচ্ছে। সাথে চেয়ারম্যান সাহেবকেও এই মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন আমাদের মিথ্যা হয়রানী থেকে রেহাই দিতে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

আরেক নোটিশ প্রাপ্ত আব্দুছ শুকুর বলেন,‘ আমার বাড়ি এখান থেকে প্রায় তিনশ গজ দূরে। এখানে আমার কোন জায়গা নেই। কিন্তু কয়েকদিন আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোক এখানে এসে বলেন চেয়ারম্যান, স্থানীয় কয়েকজন লোকসহ আমি নাকি টিলা কেটেছি। আমাকে যে টিলাটি কেটে ঘর বানানোর অভিযোগ দেখানো হয়েছে আদৌ সেই জায়গার মালিক আমি নই। ওই জায়গার মালিক মনির মিয়া নামের একজন লোক। সেদিন পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজনকে আমি খুলে বললেও তাঁরা আমাকে ওই জায়গার মালিক এবং টিলা কাটার সাথে জড়িত দেখিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’


এ ব্যাপারে ভাটেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলাম বলেন, স্কুল করার জন্য ওই এলাকায় সমতল কোন জমি নেই। এলাকার ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার সুবিধার্থে আমার টিলার পাদদেশে আমার নিজের ভূমিতে স্কুল ও মসজিদ নির্মাণ করি। ৩৩ শতাংশ জমিটি শিক্ষা সচিবের নামে রেজিস্ট্রিও করে দিয়েছি। টিলা থেকে মাটি ধসে স্কুল ও মসজিদ এর দেয়ালে আছড়ে পড়লে জনস্বার্থে এলাকাবাসী মাটিগুলো সরিয়ে নেয়। বৃস্টি হলেই ওই টিলায় মাটি ধসে পড়ে। ধসে পড়া মাটিগুলো এলাকাবাসী সরিয়ে নেয়। মাটি বিক্রির অভিযোগ মিথ্যে। সামনে নির্বাচন তাই আমার প্রতিপক্ষ নির্বাচনী ফায়দা লুটার জন্য আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর, মৌলভীবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা মুঠোফোনে বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনে অনুমোদন ছাড়া টিলা কাটার প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় ইউপি চেয়ারম্যানসহ ওই এলাকার ৭ জনকে অধিদপ্তর থেকে নোটিশ দেয়া হয়েছে। আগামী ১১ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ে এর শুনানী অনুষ্ঠিত হবে।