শনিবার, ৮ মে ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



সিলেটে ত্রিমুখী লড়াই, উত্তেজনা



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: সিলেটে ব্যবসায়ী, হেফাজত কর্মী ও যুবলীগ-ছাত্রলীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পরে পুলিশ সংঘর্ষস্থল থেকে অন্তত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ দাবি করেছে- গ্রেপ্তারকৃতরা শিবিরকর্মী। এদিকে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরে সিলেট নগরীর বন্দরবাজারের ডাকঘর, করিমউল্লাহ মার্কেটের সামনে ও লালদিঘীর পাড় গলির মুখে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর নগরীতে বিজিবি, পুলিশসহ বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। হেফাজতে ইসলামের ডাকে সকাল সন্ধ্যা হরতালে গতকাল ভোর থেকে উত্তেজনা দেখা দেয় সিলেট নগরীতে।


ফজরের নামাজের পরপরই হেফাজতের কর্মীরা নগরীতে পিকেটিং শুরু করেন। তারা নগরীর কোর্ট পয়েন্ট, বন্দরবাজার পয়েন্ট, সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, টিলাগড়, শিবগঞ্জ, মদিনা মার্কেট, আম্বরখানা, দক্ষিণ সুরমার কিন ব্রিজের মুখ, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থান নেয়। অনেক হেফাজত কর্মীর হাতে ছিল লাঠিসোটা। এর বাইরে অন্তত অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে তারা নগরীতে মহড়া দেয়। হেফাজত কর্মীরা পিকেটিং করলেও পুলিশ তাতে বাধা দেয়নি। তবে, সকাল ৯টার দিকে নগরীর কিন ব্রিজের দক্ষিণ প্রান্তে হেফাজত কর্মীরা লাঠি হাতে পিকেটিং করার সময় পুলিশ বাধা দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ হেফাজত কর্মীদের হাতে থাকা লাঠি নিয়ে নেয়।

পুলিশের বাধায় পড়ে হেফাজত কর্মীরা মিছিল নিয়ে কিন ব্রিজ পাড়ি দিয়ে কোর্ট পয়েন্টে চলে আসে। একই সময় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ দক্ষিণ সুরমার কয়েকটি স্থানে তারা বিক্ষোভ করে। ভোর থেকে সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট এলাকা ছিল হেফাজত নেতাকর্মীদের দখলে। দুপুর পর্যন্ত তারা কোর্ট পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে পিকেটিং চালায়। এ সময় সাঁজোয়া যান নিয়ে পুলিশ কামরান চত্বর এলাকায় অবস্থান করছিল। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হেফাজত নেতারা সিলেটে পিকেটিং চালায়। হেফাজত নেতারা সক্রিয় থাকার কারণে সিলেটের রাজপথে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা ছিল কম। হালকা যানবাহন চলাচল করে। দোকানপাট ছিল বন্ধ। সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি। এদিকে, বেলা পৌনে ১২টার দিকে সিলেটে সক্রিয় ওঠে বিজিবি ও পুলিশ। তারা নগরীর কামরান চত্বর এলাকায় অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে কোর্ট পয়েন্টে গিয়ে তারা হেফাজত কর্মীদের সরিয়ে দেয়। দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জেলা পরিষদের সামনে থেকে হরতাল বিরোধী মিছিল বের করে। মিছিলে যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীরা অংশ নেয়।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খানের নেতৃত্বে মিছিলটি নগরীর জিন্দাবাজার এলাকা পরিদর্শন করে কামরান চত্বরে অবস্থান নেয়। এ সময় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাংশ নগরীর বন্দরবাজার এলাকা দিয়ে মিছিল নিয়ে যায়। ডাকঘর, করিমউল্লাহ মার্কেট ও লালদিঘীর পাড় গলির মুখে এ সময় দাঁড়িয়েছিল হেফাজত কর্মীরা। একপর্যায়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা হেফাজত কর্মীদের ধাওয়া দিলে তারা মিউনিসিপ্যালিটি মার্কেটের গলিসহ কয়েকটি গলি দিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় হেফাজত কর্মীদের নামে বিক্ষোভকারীরা এক ব্যবসায়ীকে মারধর করলে ব্যবসায়ীরাও পাল্টা ধাওয়া করে। এতে বন্দরবাজার এলাকায় ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষকালে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় পরপর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রায় ১০ মিনিট সংঘর্ষের পর বিজিবি ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় ওই এলাকা থেকে ৫ জনকে আটক করা হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি এসএম আবু ফরহাদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সংঘর্ষস্থল থেকে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা জামায়াত ও শিবিরের কর্মী বলে জানান তিনি। সংঘর্ষের পর বিজিবি ও র‌্যাব ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েছে বলে জানান তিনি।

হেফাজত নেতারাও জানিয়েছেন, হরতালের সময় তারা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেন। কারো সঙ্গে সংঘর্ষে হেফাজত কর্মীরা জড়ায়নি। হেফাজতে ইসলামের কোনো কর্মীকে আটক করা হয়নি বলে জানান তারা। এদিকে, সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুই ছাত্রলীগ কর্মীও রয়েছে। সংঘর্ষের পর নগরীতে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সতর্ক অবস্থান ছিল। বিকাল ৪টার দিকে সিলেটের সাংবাদিক ফারুক আহমদের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। দৈনিক জৈন্তাবার্তার সম্পাদক ফারুক আহমদ জানিয়েছেন, নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে তিনি নগরীর জিন্দাবাজারে আসছিলেন। এ সময় শিবগঞ্জের ফরহাদ খাঁ পুলের কাছে তার গাড়িতে কয়েকজন যুবক হামলা করে ভাঙচুর চালায়। তিনি সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও তার গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয় বলে জানান ফারুক আহমদ। বিকালে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে নগরীতে হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করা হয়। জিন্দাবাজার এলাকা প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় গিয়ে সমাবেশ করেছে।


হেফাজতে ইসলাম কেন্দ্রীয় নায়বে আমীর ও সিলেট জেলার সভাপতি মাওলানা মুফতি মুহিব্বুল হক গাছবাড়ির সভাপতিত্বে মহানগর হেফাজত নেতা মাওলানা সামিউর রহমান মুসা ও মাওলানা নজরুল ইসলামের যৌথ পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রিন্সিপাল মজদুদ উদ্দিন, মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, জেলা হেফাজত নেতা মাওলানা ফয়জুল হাসান খাদিমানী, মহানগর হেফাজতের সহ-সভাপতি মাওলানা খলিলুর রহমান, মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদ, মহানগর হেফাজত নেতা অধ্যক্ষ হাফিজ আব্দুর রহমান সিদ্দিকী, হাফিজ তাজুল ইসলাম হাসান, মাওলানা সামসুদ্দিন মো. ইলিয়াছ, মাওলানা আতিকুর রহমান, মাওলানা মুহিবুর রহমান, মাওলানা ক্বারী সিরাজুল ইসলাম, মাওলানা সৈয়দ সলিম ক্বাসেমী, মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী, মাওলানা নিয়ামত উল্লাহ, মাওলানা আসলাম রহমানী, মাওলানা মাহবুবুল হক, মাওলানা ছদরুল আমীন, মাওলানা আখতারুজ্জামান তালুকদার, মাওলানা সালেহ আহমদ শাহবাগী, মাওলানা মুশফিকুর রহমান মামুন, মাওলানা ফাহাদ আমান, মাওলানা আমিন আহমদ রাজু, মাওলানা হাফিজ কবির আহমদ, মাওলানা হারুন রশিদ, মাওলানা লুৎফুর রহমান, হাফিজ কবির আহমদ, মাওলানা আসিকুর রহমান, হাজী আব্বাস জালালী, আবু সুফিয়ান, আবু বক্কর সিদ্দিক, আবুল খয়ের, আব্দুল করিম দিলদার, হাফিজ কয়েছ আহমদ, মাওলানা একরামুল হক জুনেদ, হাফিজ শাহিদ হাতিমি প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, সিলেটবাসী সফল হরতাল পালনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে আলেম ওলামা ও ইসলাম বিদ্বেষী সরকারকে মানুষ ক্ষমতায় দেখতে চায় না। বক্তরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজও দেশব্যাপী হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ হরতালে দেশের বিভিন্নস্থানে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা নিরীহ হেফাজত নেতাকর্মীদের উপর হামলা করেছে।

আলেম ওলামাদের উপর হামলা-মামলা করে হেফাজত নেতাকর্মীদের আন্দোলন থেকে সরাতে পারবে না। সিলেটে হরতাল সফলভাবে পালন করায় ব্যবসায়ী ও বাস মালিক সমিতি নেতৃবৃন্দসহ সিলেটের আপামর তৌহিদি জনতাকে ধন্যবাদ জানান।

আওয়ামী লীগ: সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান বলেছেন, দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে হেফাজত, জামাত-শিবির ও বিএনপি উঠেপড়ে লেগেছে। যারা জ্বালাও পোড়াও, দোকানপাট ভাঙচুর করে তারা দেশের মানুষের শান্তি চায় না। তিনি গতকাল সিলেট আওয়ামী লীগের হরতাল বিরোধী সমাবেশে এ কথা বলেন।


জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ শফিকুর রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন- জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ সুজাত আলী রফিক, জেলা যুবলীগ সভাপতি শামীম আহমদ ভিপি, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি আফছর আজিজ, জেলা তাঁতী লীগ সভাপতি আলমগীর হোসেন, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এডভোকেট শাহ ফরিদ আহমদ, এডভোকেট মো. নিজাম উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম কামাল প্রমুখ।