বুধবার, ১ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



একদিনে তিন জনের লাশ দেখলো গোলাপগঞ্জবাসী



বিজ্ঞাপন

জাহিদ উদ্দিন, গোলাপগঞ্জ :: একদিনে তিন জনের লাশ দেখলেন গোলাপগঞ্জ উপজেলবাসী। পৃথক ঘটনায় উপজেলা জুড়ে চলছে নানা আলোচনা। আত্মহত্যা, হত্যা, আর সহপাঠীর পিটুনিতে কলেজ ছাত্র হত্যা সবই যেন উপজেলাবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন উপজেলার সচেতন মহল।

বুধবার (২৪ জুলাই) সকাল ৯টার দিকে পৌর এলাকার নুরুপাড়া গ্রামে মিনারা বেগম (৫০) নামের এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী সুন্দর খাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। এ ঘটনায় ছেলে তারেক আহমদ (২১) থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।


অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাতে নুরুপাড়া গ্রামের সুন্দর খাঁর সাথে তার স্ত্রী মিনারা বেগমের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর তারা ঘুমিয়ে পড়েন। তাদের ছেলে তারেক আহমদ সে রাতে বাড়িতে ছিলেন না।

পরদিন বুধবার সকাল বেলা তারেকের বাবা মুঠোফোনে জানান তার মা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তাৎক্ষণিক ছেলে বাড়িতে আসলে বাবার আচরণে সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিক বিষয়টি গোলাপগঞ্জ মডেল থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ মিনারা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এবং স্বামী সুন্দর খাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে।

গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটি হত্যা বলে ধারণা করছে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী সুন্দর খাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।


এদিন সকাল ১০টার দিকে উপজেলার লক্ষণাবন্দ ইউনিয়নের ফুলসাইন্দ কলাভাগ গ্রাম থেকে নাছিমা বেগম (১৯) নামের আরেক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার সকালে উপজেলা লক্ষণাবন্দ ইউনিয়নের ফুলসাইন্দ কলাভাগ গ্রামে বসতঘর থেকে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহত নাছিমা বেগিম ওই গ্রামের শাহিন আহমদের (২৪) স্ত্রী ও মোঘলবাজার থানার ঝাপা গ্রামের মাসুদ মিয়ার মেয়ে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) রাত ৩টার দিকে গৃহবধু নাছিমা বেগম (১৯) পরিবারের সবার অজান্তে ঘরের তীরের সাথে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেয়। রাতে স্বামী শাহিন ঘুম থেকে সজাগ হলে দেখতে পান স্ত্রী নাছিমা বেগম গলায় ফাঁস দিয়েছে। এ সময় তিনি তাৎক্ষণিক পরিবারের সকলকে অবগত করেন। বুধবার সকালে গোলাপগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেন।

গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, এটি আত্মহত্যা কি-না ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসলে বুঝা যাবে।


এদিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় সহপাঠীর সাথে জুতা নিয়ে ঝগড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তানভীর হোসেন তুহিন (১৯) নামে গোলাপগঞ্জের এক শিক্ষার্থী পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার (২৪ জুলাই) সকাল ১১টায় দক্ষিণ সুরমার আলমপুরস্থ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত তানভীর হোসেন তুহিন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার হেতিমগঞ্জের কোনাচর দক্ষিণভাগ পলিকাপন গ্রামের মানিক মিয়ার পুত্র।

জানা যায়, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তুহিন কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষার্থী। প্রতিদিনের ন্যায় বুধবার সকালে তুহিন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কম্পিউটার প্রশিক্ষণে যায়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্ধারিত স্থানে তার জুতা রেখে কম্পিউটার ল্যাবে প্রবেশ করে। প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে তুহিন কম্পিউটার ল্যাব থেকে বের হয়ে এসে দেখতে পায় তার জুতার স্থানে অন্য একটি জুতা রাখা। কিছুক্ষণ পর সে দেখতে পায় তার হারানো জুতা কামরান আহমদ নামের অন্য একজন প্রশিক্ষণার্থীর পায়ে। এ সময় তুহিন তাকে বলে তোমার পায়ের জুতাটা আমার। এ নিয়ে উভয়ে মধ্যে কথাকাটি হয়। এক পর্যায়ে বিষয়টি অধ্যক্ষের কানে গেলে তিনি জুতা জোড়া তুহিনের ছিল বলে বিষয়টি আপোষ মীমাংসা করে দেন।


এরপর তুহিন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বাইরে আসার সময় তুহিনের সাথে বাকবিতন্ডাকারী শিক্ষার্থী আরো কয়েকজন যুবককে নিয়ে তুহিনের উপর হামলা চালায়।

গুরুতর আহত তুহিনকে উদ্ধার করে তার সহপাঠীরা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তার অবস্থা অবনতি হলে বেলা উন্নত চিকিৎসার জন্য দেড়টা দিকে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ বিষয়ে মোগলাবাজার থানার ওসি আখতার হোসেন জানান, সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তানভীর হোসেন তুহিনের সাথে জুতা নিয়ে অন্য এক শিক্ষার্থী কামরানের সাথে বাকবিতন্ডা হয়। বিষয়টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ মীমাংস করে দেন। পরে কামরান তার সহপাঠীদের নিয়ে তুহিনের উপর হামলা চালায়। হামলায় তুহিন গুরুতর আহত হয় এবং ঢাকায় নেয়ার হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।


এ ঘটনায় ১০ জনকে আসামি করে বুধবার রাতেই মহানগর পুলিশের মোগলাবাজার থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন নিহতের চাচা নাজিম উদ্দিন।

মামলার ব্যাপারটি মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন নিশ্চিত করে বলেন, নিহতের চাচা বাদী হয়ে বুধবার রাতেই কামরান নামে এক ব্যক্তিকে প্রধান আসামি উল্লেখ করে আরও ১০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় তাহের নামের একজনকে আটক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

উপজেলা নাগরিক বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি এস এ মালেক বলেন, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক কলহ, অর্থ লিপ্সা, মাদকাসক্তি নানা কারণেই সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। তাই সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। একই সাথে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে অপরাধীদের যথোপযুক্ত শাস্তি। সচেতন মানুষের পাশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকলে অপরাধ দমন কঠিন হবে না। দেশের মানুষের মনে নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সক্রিয় হতে হবে। এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচার সুনিশ্চিত করলে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবেনা।


এ ব্যাপারে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ১টি আত্মহত্যা ও ১টি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অপর ঘটনাটি মোঘলাবাজার থানাধীন আলমপুর কারিগর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ঘটেছে। গোলাপগঞ্জ উপজেলার দুটি ঘটনায় পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে ।