শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ



সিলেটে হিজড়াদের দুঃখগাঁথা জীবন: জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়েছেন অনেকে!



বিজ্ঞাপন

নাসির উদ্দিন :: এমনিতে কঠিন জীবনধারণ। পেটের ভাত জোগানো, পরনের কাপড় কেনার সামর্থ থাকে না। থাকতে হয় ভাড়া বাসায়। মৌলিক চাহিদাগুলোর তিনটি পূরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে তাদের। ফলে ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে জীবনধারণ করতে হয় তাদের। স্বাভাবিক সময়ে কোনোমতে জীবনটা কেটে যেতো। কিন্তু করোনার মহামারিকালে সিলেটের হিজড়াদের জীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। খবর: বাংলা নিউজ

সম্প্রতি একাধিক হিজড়া জানিয়েছেন, খুব কঠিন অবস্থায় আছেন তারা। যৎসামান্য সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালেও পাওয়া যায় না। যে কারণে জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকে দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পাড়ি দিয়েছেন। ওখানে কিছুটা ভালোই কাটছে তাদের জীবনযাপন। সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া হিজড়াদের অনেকে ফোন করে জানিয়েছেন দেশে রেখে যাওয়া স্বগোত্রীয়দের মায়া।


এমনটি জানিয়ে এলিজা হিজড়া (ছদ্মনাম) বলেন, সিলেটে ৪শ ৫০ জন হিজড়া আছেন। করোনাকালে অন্তত ৬০ জন হিজড়া দেশ ছেড়েছেন। ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই সীমান্ত দিয়ে তারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ওখানে তারা ভালোই আছেন। বৈধপথেই আয় রোজগার করছেন, তাদের যেতেও আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার খাতিরে যাওয়া হচ্ছে না।

এক দশক আগে ময়মনসিংহ থেকে সিলেট আসা রানা হিজড়া (৩৪) বলেন, বিষাদময় জীবন থেকে মুক্তির জন্য অনেকবার আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিয়েছিলাম। পাপ হবে বলে মরিনি। রাস্তায় না নামতে বছর দেড়েক আগে সুরমার তীরে ক্বীন ব্রিজের নিচে চটপটির ব্যবসা শুরু করি। ভ্যানগাড়িটি দিয়েছিলো নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল। সেখানে অংশীদার আরও পাঁচজন। কিন্তু নিজে হিজড়া বলে সেখানে তারা দাঁড়াতে পারতেন না। কারণ, কাস্টমারদের কেউ কেউ কুসংস্কারের বশে, কেউ বা ঘৃণায় তার দোকানে আসতে চায় না। তবু মোটামুটি প্রথম ৬ মাস রোজগার ভালোই ছিল। কোনোমতে চলে যাচ্ছিল দিনকাল। কিন্তু এরপর হানা দেয় করোনা নামক মহামারি। গত মার্চ মাস থেকে প্রায় এক বছর ধরে তাদের আয়-রোজগারের অবস্থা এমন হয়েছে যে, কখনো কখনো না খেয়ে থাকতে হয়। বাধ্য হয়ে মানুষের কাছে হাত পাতলেও আয়-রোজগার তেমন একটা হচ্ছে না। রানার যুক্তি, হবে কীভাবে? মানুষের ব্যবসা নেই। অনেকে আবার মারতেও তেড়ে আসে। মারধরের ভয়ে এখন কারো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কিছু চাইতে সাহসে কুলোয়না। কিন্তু তবুও মাঝেমধ্যে বেরোতে হয়।

বয়স ৩০ ছুঁই ছুঁই রিনা হিজড়ার অবস্থা আরও খারাপ। সস্তা রঙচঙ মেখে আলো-আঁধারী জীবনে পথচলা। কখনো রেলস্টেশনে, কখনো বাসস্ট্যান্ডে বিচরণ। নিশাচর হয়েও ফিরতে হয় শূন্য হাতে।

তাদের দাবি, তাদের ব্যাপারে সরকার উদাসিন, যেমন উদাসিন পরিবারের সদস্যরা, সমাজ ও সংসারের সবাই। এ অবস্থায় কখনো কখনো আত্মহত্যার চিন্তাও মাথায় আসছে তাদের। তাদের আক্ষেপ, কত সংগঠনই তো এই করোনায় মানুষজনকে সাহায্য সহযোগিতা করছে। তৃতীয় লিঙ্গ বলে আমরা কী মানুষ না? সরকার মানবিক হয়ে ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের যদি আশ্রয় দিতে পারে। খাবার দিতে পারে। তবে, আমাদের কী অপরাধ? আমরা তো আর মঙ্গলগ্রহ থেকে আসিনি। আমরা কারো না কারো ঘরে জন্মেছি। কেবল তৃতীয় লিঙ্গ হয়ে জন্ম নেওয়াটাই আমাদের অপরাধ?

হিজড়ারা বলেন, কারোনার মধ্যে কোনো অনেক সংগঠনের উদ্যোগে খাবার সামগ্রী বিতরণ করা হলেও আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সাহায্য নিতে গেলে দাতারা এমনভাবে দানটা হাতে তুলে দিয়ে বলেন, যা তাড়াতাড়ি কেটে পড়। তাই সাহায্য আনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তারা। অবশ্য দুই-একটা এনজিও থেকে কিছুটা সহায়তা পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে।


বন্ধু ওয়েলফেয়ার সোসাইটি সিলেটের যুগ্ম সমন্বয়ক সাদিকুর রহমান সাকি বলেন, করোনা মহামারির মধ্যে যখন হিজড়া সম্প্রাদায়ের লোকজন খুবই অসহায় অবস্থায়। তখন সিলেট সিটি করপোরেশন থেকে তাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।

তিনি বলেন, হিজড়ারাও আমাদেরও সমাজের অংশ এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলকে তাদের মৌলিক অধিকার নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের স্বাবলম্বী করতে সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে ২০১৯ সালের নভেম্বরে ২৪ জন হিজড়াকে ৮টি খাবার ভ্যানগাড়ি দিয়েছিলেন সিলেট নগর পুলিশের উপ কমিশনার (প্রসিকিউশন) জাবেদুর রহমান। তিনি বছরখানেক কাদের কাউন্সেলিং করেন। তার দেওয়া ভ্যানগাড়িতে করে জীবিকা নির্বাহ হয় সেসব হিজড়াদের। ওই পুলিশ কর্মকর্তার ন্যায় রাষ্ট্র কিংবা সমাজের বিত্তবানরা পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাশে দাঁড়ালে হিজড়াদের জীবন চলার পথ সুন্দর হতে পারে, মনে করেন সুমি হিজড়া।