বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



কারাগারের সিসিটিভির ফুটেজ ফাঁস: যা আছে তদন্ত প্রতিবেদনে



বিজ্ঞাপন

নিউজ ডেস্ক: কারা বিভাগ, রাষ্ট্র ও সরকারকে বিব্রত ও হেয় করা হয়েছে মন্তব্য করে সিনিয়র জেল সুপার ও জেলারসহ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারাবিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে কাশিমপুর কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁসের ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটি। আইজি প্রিজনসের নির্দেশে গঠিত এই তদন্ত কমিটি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ ১৮ পাতার একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কারা অধিদফতরে। যার অনুলিপি ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। খবর: বাংলা ট্রিবিউন।


যেসব কারা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তারা একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসাবে বক্তব্য তুলে ধরেন তদন্ত কমিটির কাছে। যা তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সিনিয়র জেল সুপার রত্না রায়, জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধা, ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন ও মফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়।

‘উত্তেজিত হয়ে টিভিতে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে কারা বিভাগ, সরকার ও রাষ্ট্রকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য’ দায়ী করে ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইনের বিরুদ্ধে ‘দৃষ্টান্তমূলক’ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। চার কারা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা ছাড়াও ভবিষ্যতে করণীয় বিষয়ে আরও পাঁচটি সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি। এরমধ্যে কারা বিভাগের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে উপযুক্ত মিডিয়া সেল গঠনের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। যাতে গণমাধ্যম ও কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি না হয়।

গত ৬ জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগারে বন্দির সঙ্গে এক নারীর দেখা করার সিসিটিভি ফুটেজ কিভাবে ফাঁস হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কারা কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। যে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় কারা অধিদফতরের যশোর বিভাগের ডিআইজি প্রিজনস মো. ছগির মিয়াকে। কমিটির সদস্য করা হয় কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার (চলতি দায়িত্ব) মো. গিয়াস উদ্দিন ও ফরিদপুর জেলা কারাগারের জেল সুপার আল মাসুমকে। সূত্র জানায়, গত ১১ ফেব্রুয়ারি কমিটি কারা অধিদফতরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি চার কারা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে। এছাড়াও ভবিষ্যতের করণীয় বিষয়ে আরও পাঁচটি সুপারিশ করে কমিটি। সুপারিশগুলো হচ্ছে জেল কোড অনুযায়ী কারাগারের তথ্য সংরক্ষণ ও তথ্য প্রদানে সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষ ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে কারা বিভাগের জন্য উপযুক্ত মিডিয়া সেল গঠন করার সুপারিশ করা হয়। কারাবিধি ও সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বয়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু কারা প্রশাসন নিশ্চিত করতে আইন অনুযায়ী গণমাধ্যমকে তথ্য দেওয়া নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। কারাগারকে একটি রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিটি বিষয়ে কারাবিধি অনুযায়ী চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে পুনর্নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। যেকোনও অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে ভিডিও ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট দাফতরিক রেকর্ডপত্রের যেন কোনও পরিবর্তন করা না যায় সেজন্য সারাদেশের কারাগার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিতে হবে। সিনিয়র জেল সুপার, জেল সুপার ও জেলারের বৈধ অনুমতি ছাড়া বহিরাগতদের কারা এলাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত সিনিয়র জেল সুপার রত্না রায় অফিস প্রধান হিসেবে সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব এবং গত ৬ জানুয়ারির ভিডিও ফুটেজের গোপনীয়তা রক্ষা ও সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু অন্যান্যদের ওপর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয় উল্লেখ করেই নিজ দায়িত্ব এড়ানোর অপচেষ্টা করেছেন। যা দায়িত্বহীনতার শামিল। তার বক্তব্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই জেলারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় জেলার ও সিনিয়র জেল সুপারের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতার অভাব ছিল। দাফতরিক কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একত্রিত রেখে সমন্বয়ের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে কারা প্রশাসন পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অধীনস্থদের সুষ্ঠু তদারকি ও অফিস ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার দায়ে তার বিরুদ্ধে কারা বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জেলার নুর মোহাম্মদ মৃধা (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) গত ১৪ জানুয়ারি হাজতি আসামি তুষারের দেখার করার বিষয়ে ভিডিও ফুটেজ এডিট করে কারারক্ষী আল আমিনের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন। এই ভিডিও ফুটেজে যে বিবৃতি প্রচারিত হয়েছে তাতে শুধুমাত্র সিনিয়র জেল সুপার কেন্দ্রিক। জেলার সংশ্লিষ্ট কিছুই দেখানো হয়নি।


ডেপুটি জেলার মো. গোলাম সাকলাইন জেলার নূর মোহাম্মদের সরকারি বাসার ড্রয়িং রুমে বসে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি চ্যানেল ২৪ এ প্রচারিত হয়েছে। এ বিষয়টিও জেলার তার সরকারি বাসার ড্রয়িং রুমে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি জানেন না বলে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন। কারাবিধি অনুযায়ী কারাগারের যাবতীয় রেজিস্টার, রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য জেলার দায়ী থাকার কথা। জেলারকে অধস্তন কর্মচারীদের কার্যাবলী তদারকি তথা যাবতীয় কাজ সঠিক সময় আদায় করে নিতে হবে। যা জেলার যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। এ বিষয়ে ভিডিও ফুটেজ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জেলারের কোনও দায়দায়িত্ব দেখানো হয়নি। এটা প্রমাণ করে যে, ভিডিও ফুটেজ ও দাফতরিক রেকর্ড মিডিয়ার হস্তগত হওয়ার ক্ষেত্রে জেলারের পরোক্ষভাবে হাত রয়েছে । কারাবিধি লঙ্ঘনের অপরাধে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলো।

ডেপুটি জেলার মো. গোলাম সাকলাইন কারাগারের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা নন। তার পরও জেলারের সরকারি বাসার ড্রইং রুমে বসে উত্তেজিত হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তার সেই ভিডিও ফুটেজের বক্তব্যটি গত ২২ জানুয়ারি চ্যানেল-২৪ এ প্রচারিত হয়েছে। তিনি কখনও জেলারকে, কখনও নিজেকে দায়মুক্ত করার অপচেষ্টা করেছেন। অত্যন্ত সুকৌশলে মিডিয়ার লোক বা তৃতীয় পক্ষের কোনও ব্যক্তিকে জেলারের সরকারি বাসার ড্রইংরুমে ডেকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে কারা বিভাগকে জনসম্মুখে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন তিনি। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে যে ধৃষ্টতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন, তাতে দেশের কারা বিভাগ, রাষ্ট্র ও সরকারকে বিব্রত করেছেন। তার এমন কার্যকলাপ কারাবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলো।

ডিপুটি জেলার মফিজুল ইসলাম সিনিয়র জেল সুপার রত্না রায়ের নির্দেশে সিসিটিভি ফুটেজ ও জেলারের নিকট থেকে বুঝে নেওয়ার পর তা সংরক্ষণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। যা কারাবিধির পরিপন্থী বিধায় তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলো।


এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমরা হাতে পেয়েছি। সেটি ভালোভাবে খতিয়ে দেখছি। প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দেখব। যাতে ব্যক্তিগত স্বার্থে কেউ কারা বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।