শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



রাজধানীর ৯ স্থানে বাসে আগুন: আতঙ্ক, নানা রহস্য




নিউজ ডেস্ক: বেলা ১২টা থেকে সাড়ে চারটা। এই সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর অন্তত ৯টি স্থানে বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অনেকটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হঠাৎ এই অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীজুড়ে। তবে ঘটনার পর কাউকে আটক করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনার পর বেশ কয়েকটি স্পট ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় একই কায়দায় বাসে আগুন দেয়া হয়। যেসব বাসে যাত্রী কম ছিল এমন বাসে আগুন দেয়া হয়। আগুন দেয়ার জন্য নিরাপদ স্থান বেছে নেয়া হয়। আগুনের ঘটনায় কোথাও কেউ আহত হয়নি।


অনেকে বলছেন এই অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো দক্ষ হাতে ঘটানো হয়েছে। হঠাৎ এমন ঘটনা রহস্যজনক বলে মনে করছেন অনেকে। ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা প্রথম বাসে আগুন লাগার কথা জানতে পারেন। তারপর কিছুক্ষণ পরপরই বংশাল, কাঁটাবন, মতিঝিল, গুলিস্তান, সচিবালয় মোড়, প্রগতি সরণিসহ আরো কয়েকটি স্থানে আগুন লাগার খবর পান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পুলিশের মতিঝিল জোনের পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় মোট চারটি বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। তারমধ্যে একটি ভ্যাট/ট্যাক্স অফিসের স্টাফ বাস, একটি অগ্রণী ব্যাংকের স্টাফ বাস। আর বাকিগুলোর মধ্যে একটি পাবলিক বাস ও অন্যটি বিআরটিসির বাস। পুলিশের রমনা জোনসূত্র জানিয়েছে, প্রেস ক্লাবে রজনীগন্ধা পরিবহনের একটি বাসে ও শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের পাশে কাঁটাবন সংলগ্ন দেওয়ান পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। লালবাগ বিভাগের পুলিশ জানিয়েছে বংশালে দুপুর আড়াইটার দিকে দিশারী পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সহিংসতার উদ্দেশ্যেই একটি মহল বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এসব ঘটনায় সন্দেহজনক কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

দুপুর ১.৩৯ মিনিটের দিকে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে দেওয়ান পরিবহনের বাসে আগুন লাগে। প্রত্যক্ষদর্শী আজিজ সুপার মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী আফজাল হোসেন বলেন, আমি তখন সাধারণ পোশাকে মার্কেটের সামনেই ছিলাম। হঠাৎ করে দেখি একটি বাসে পেছনের দিক থেকে কালো ধোঁয়ার মতো আসছে। একটু সামনে গিয়ে দেখি বাসের পেছনের সারির সিটে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে আর বাসের ভেতরে থেকে তড়িঘড়ি করে যাত্রীরা নামছেন। মুহূর্তের ভেতরে আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকে। তখন মার্কেটের ভেতর থেকে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুতেই আগুন নেভানো যাচ্ছিলো না। পরে মার্কেটের চারতলা থেকে সাপ্লাইয়ের পানি দিয়ে আগুন নেভানো হয়। আগুন লাগানোর ৭-৮ মিনিট পরে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে পৌঁছায়। ততক্ষণে আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। যে বাসটি পুড়েছে সেটি প্রায় নতুন। কিন্তু আগুনে বাসটির সব পুড়ে গেছে। রাস্তার গাছপালার পাতাও পুড়ে গেছে।


দেওয়ান বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছেন পিঠা বিক্রেতা রাবেয়া বেগম। তিনি বলেন, দোকানের পসরা সাজানোর জন্য আমি তখন দুটি পানির বোতল নিয়ে আজিজ সুপার মার্কেটের শেষ মাথায় আমার দোকানের সামনে অবস্থান করছিলাম। তখন রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তেমন কোনো যানজট ছিল না। ওই সময় হঠাৎ করে দেখি একটি বাসের ভেতরে আগুন জ্বলছে। আর ভেতরে থেকে যাত্রীরা বলছেন, আগুন আগুন। এই ড্রাইভার বাস থামাও, বাস থামাও। যাত্রীদের কথায় বাস থামায় চালক। ভেতরে বেশি যাত্রী ছিল না। তিনি বলেন, আগুন বাসের ভেতর থেকেই লেগেছে এবং সেটি বাসের পেছন থেকে। নতুন বাসটা চোখের সামনেই পুড়ে গেল। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী আসাদ বলেন, ৪-৫ মিনিট ধরে বাসে আগুন জ্বলছে। কিন্তু যাত্রীরা কেউ আগুন নেভানোর চেষ্টা করেনি। সবাই ছবি তোলা ও ভিডিও করা নিয়ে ব্যস্ত। বরং শাহবাগ মোড় থেকে এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। আগুন নেভাতে গিয়ে ওই ব্যক্তির পা পুড়ে যায়।

দুপুর ২টা ১০ মিনিটে জাতীয় প্রেস ক্লাবের পাশে সচিবালয় মোড়ে রজনীগন্ধা পরিবহনের বাসে আগুন লাগে। ওই বাসের ভেতরে তিন থেকে চারজন যাত্রী ছিলেন। যে স্থানে আগুন লেগেছে তার পাশে মেট্রোরেলের কাজ চলছে। সরু চিকন এই রাস্তায় এক পাশে মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজের সীমানা প্রাচীর। অন্যদিকে সচিবালয়ের সীমানা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আবু বকর বলেন, আগুন লাগা অবস্থায় রজনীগন্ধা পরিবহনের ওই বাসটি সচিবালয় মোড়ে এসে থামে। তারপর ভেতর থেকে ৩-৪ জন লোক নামে। এর বাইরে চালক ও তার সহকারী ছাড়া আর কোনো লোক বাসে ছিল না। বাসের ভেতর থেকে মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে আগুন ছড়িয়ে যায়। নিমিষেই বাসটি পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই বাসের অনেকাংশ পুড়ে যায়। তিনি বলেন, বাইরে থেকে নয়। মনে হচ্ছে বাসের ভেতর থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। কারণ বাসটি থামা পর্যন্ত আগুনের বিস্তার বাসের ভেতরেই ছিল। পরে ধীরে ধীরে সেটি বাইরে ছড়িয়েছে। প্রেস ক্লাবের সামনের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমি তখন বিএমএ ভবনের উল্টোপাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। তখন প্রায় আমার সামনেই এসে একটি বাস দাঁড়ায়। বাসের দিকে তাকিয়ে দেখি ভেতরে আগুন। চালক ও যাত্রী সবাই দৌড়ে নামছিল। যাত্রীরা বাস থেকে নেমে উধাও হয়ে যায়।

দুপুর ১টা ২৫ মিনিটের দিকে রমনা ভবনের সামনে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে। আশেপাশের মানুষ তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ফুটপাথের ব্যবসায়ী, হকাররা তখন তাদের মালামাল নিয়ে অন্যত্র চলে যান। ঘটনাস্থলের ৩-৪ হাত দূরে ব্যবসা করেন আশরাফুল। তিনি বলেন, হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি ভিক্টর ক্লাসিকের বাস জ্বলছে। বাসের ভেতরে আগুন থাকায় যাত্রীরা দৌড়ে দৌড়ে নামছিলেন। পথচারী বা অন্য যানবাহনের যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও বাসের ভেতরের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছিল না। বাস থেকে নামার পর আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে সবাই মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছিলেন। অনেক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। শহিদুল নামের এক ফল ব্যবসায়ী বলেন, স্বাভাবিকভাবেই যানবাহন চলাচল করছিল। তারমধ্যে একটি বাসে আগুন। সবার ভেতরে একটি ভীতি চলে আসে। প্রথমে মনে করেছিলাম গ্যাস সিলিন্ডার থেকেই মনে হয় আগুন লেগেছে। পরে শুনি ওই গাড়িতে নাকি কোনো সিলিন্ডার নাই। ভেতর থেকেই কেউ হয়তো আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।


বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্তব্যরত কর্মকর্তা রাসেল শিকদার জানান, প্রথম আগুনের ঘটনা ঘটে শাহজাহানপুরে একটি বাসে। এরপর কাঁটাবন, মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের কাছে, গুলিস্তানে গোলাপ শাহ মাজার এলাকা, বংশালের নয়াবাজার ও প্রেস ক্লাবের কাছে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রতিটি ঘটনায় খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছে বলে জানান তিনি।

বেলা দেড়টার আগে এসব ঘটনা ঘটেছে। বিকালে প্রগতি সরণির কোকাকোলা মোড়ে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বেলা ২টার দিকে প্রেস ক্লাবের সামনে রজনীগন্ধা নামক একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুরানা পল্টন হয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে আসতেই পুরো বাসে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ওই বাসে প্রায় ১৫ জন যাত্রী ছিল। পেছনে ৪-৫ জন যুবক ছিল। আগুন লাগার পরপর তারা দ্রুত নেমে যায়। আগুন ছড়িয়ে গেলে চালকের আসনের কাছাকাছি এলে চালক দ্রুত বাস থেকে নেমে যান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে দেড়টার মধ্যে ৬টি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে আরো কয়েক বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিকালে প্রগতি সরণি এলাকায় যাত্রীবাহী ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। এরমধ্যে নয়াপল্টনে আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারের কাছে পার্কিং করা একটি স্টাফ বাস, মতিঝিলে মধুমিতা সিনেমা হলের পেছনে একটি পাবলিক বাসে, গুলিস্তানে পীর ইয়ামিনি মার্কেটের সামনে ভিক্টর ক্লাসিকের বাসে, কাঁটাবনে দেওয়ান পরিবহনের বাসে, আড়াইটার দিকে বংশাল থানার নয়াবাজার এলাকায় ডিআইটি সুপার মার্কেটের কাছে দিশারী পরিবহনের বাসে এবং পৌনে ৩টার দিকে পল্টন থানাধীন পার্কলিং এ জৈনপুরী পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগে।

ডিএমপি’র গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে নাশকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে বাসে আগুন দিয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন স্থানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গেছে। দলীয় সন্ত্রাসীরাই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। এ বিষয়ে জড়িতদের আসামি করে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

কাঁটাবনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আজিজ সুপার মার্কেটের জমজম হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের কর্মচারী জাহিদ হাসান জানান, সময় প্রায় দেড়টা। সড়কে তখন যানজট। দেওয়ান পরিবহনের বাসটি ধীর গতিতে চলছিলো। হঠাৎ পেছন থেকে ধোঁয়া বের হতে থাকে। বাসের যাত্রীরা দ্রুত নেমে যান। এ সময় মার্কেটের ওপর থেকে পানি ঢালা হয়। মার্কেট থেকে অগ্নিনির্বাপকযন্ত্র নিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। আগুনে প্রায় পুরো বাসই পুড়ে যায়। পরে পুলিশ এসে রেকার দিয়ে গাড়িটি নিয়ে যায়।


এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই বাসের মো. রায়হান জানান, ৪০ সিটের ওই বাসে তখন ১২-১৩ জন যাত্রী ছিল। কাঁটাবন সিগন্যাল পার হওয়ার পরই হঠাৎ গাড়ির পেছন দিকটায় আগুন দেখতে পান চালক। কিন্তু পেছনে তখন কোনো যাত্রী ছিল না বলে জানান এই বাসের চালক। আগুন ছড়িয়ে পড়লে চালকসহ দ্রুত সবাই বাস থেকে নেমে যান।