শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



দিরাইয়ে চৌধুরী বনাম খাঁ পরিবারের ২০ বছরের দ্বন্দ্ব সিনেমাকেও হার মানায়




নিউজ ডেস্ক: এ যেন বাংলা সিনেমার গল্প। দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে চৌধুরী পরিবার আর খাঁ পরিবারে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব। জলমহাল নিয়ে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। এরপর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিবছর ঘটে সংঘর্ষ আর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। আর এসব সংঘর্ষে প্রাণ যায় গ্রামের নিরীহদের, লুটপাট হয় পুরো গ্রাম। আর তখন গ্রামছাড়া হয় শতাধিত পরিবার।


বারবার চেষ্টা করেও এই দুই পরিবারের দ্বন্ধ থামানো যাচ্ছে না। তাই একের পর এক ঘটে চলেছে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এতে ভীত আশপাশের মানুষজনও। গ্রামবাসীরা বলছেন, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এমন সংঘর্ষের ঘটনা গ্রামের নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের মধুরাপুর গ্রাম। পুরো গ্রামটিই জেলাবাসীর কাছে ভয়ঙ্কর এক নাম। এ গ্রামে সংঘর্ষ মানেই ভয়াবহ নৃশংসতা, হত্যা আর ভাঙ্চুরের ঘটনা। গেল ২০ বছর ধরে গ্রামের চৌধুরী পরিবার আর খাঁ পরিবারের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবছরই সংঘর্ষে একেকটি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোরর দুপক্ষের সংঘর্ষে একজন খুন হন।

আজ বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) গ্রামটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন এই প্রতিবেদক। গ্রামটির বাড়িঘরের ছবি দেখলেই বোঝা যায় এখানে কী ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। গ্রামের শতাধিক পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুরা গ্রামছাড়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে তারা বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না।

স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, ‘২০ বছর ধরে চৌধুরী পরিবার আর খাঁ পরিবারে আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে গ্রামের কেউ না কেউ মারা যায়। মারা যাওয়ার পর ওই রাতে চলে লুটপাট। আমরা নিরীহ পরিবারের মানুষ কেউ কিছু বলতে পারি না। প্রশাসনও যেন এই দুই পরিবারের কাছে অসহায়।’

স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদা বেগম বলেন, ‘মারামারি করে দুই পরিবারের লোকজন আর মামলায় পড়তে হয় আমাদের মতো অসহায় মানুদের। আমরা কোনো মারামারিতে ছিলাম না তারপরও আমাদের ওপর মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। আজকে আমরা ঘরবাড়ি ছাড়া। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, এই দুই পরিবারকে যেন আইনে আওতায় আনা হয়।’


একইভাবে কষ্টের কথা জানান গ্রামের মুরুব্বি আলী আমজাদ। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে চৌধুরী পরিবার আর খাঁ পরিবারে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। আর এই দ্বন্দ্বের জেরে প্রতি বছর গ্রামে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।’

চৌধুরী পরিবার আর খাঁ পরিবারের সংর্ঘষে এখন পর্যন্ত গ্রামের চারজন নিহত হয়েছে জানিয়ে গ্রামের এই বৃদ্ধ বলেন, ‘এ ঘটনায় থানায় মামলাও হয়েছে। আবার মামলা বিচারাধীনও আছে। যদি দ্রুত ট্রাইব্যুনালে এই মামলাগুলোর রায় প্রদান করা হয় তাহলে এই দ্বন্দ্বের শেষ হবে বলে আমি মনে করি।’

ভাটিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান কাজি এ বিষয়ে বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে চৌধুরী পরিবার আর খাঁ পরিবারে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। তবে পূর্বপুরুষদের সময় থেকে চলে আসা এই দ্বন্দ্বের শেষ হচ্ছে না।’


সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, ‘এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। হত্যা এবং বাড়িঘর ভাংচুরের ঘটনায় দুপক্ষের মামলাই নেয়া হয়েছে। কিন্তু সামাজিকভাবে এসব দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে এসব বিরোধ বাড়বেই।’