শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



সিলেটে এসআই আকবরের টর্চার সেলের নাম ‘ভিআইপি রুম’!

নিউজ ডেস্ক




সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। যার আধিপত্য ছিল বন্দরবাজার এলাকাজুড়ে। গায়ের জোরেই চালাতেন ফাঁড়ি। প্রতিদিনই টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সালিশ বসাতেন ফাঁড়িতেই। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় নাটক করে হিরো বনে যাওয়া এসআই আকবর এখন ভিলেনে পরিণত হয়েছেন।


বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ছিল আকবরের কাছে থানার মতোই। ইনচার্জ হয়েও তার ভাব ছিল থানার ওসির মতোই। পান থেকে চুন খসলেই ফাঁড়ির টর্চার সেলে নির্যাতন করা হতো। সেই কক্ষকে বলা হতো ‘আকবরের ভিআইপি’ রুম। এই ভিআইপি রুমে (টর্চার সেল) সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বন্দরবাজার এলাকার হকাররা। সবকিছু ছাপিয়ে সবার মনে এখন একই প্রশ্ন, আকবর হোসেন ভূঁইয়া কোথায়?

সিলেট মহানগর পুলিশের লাপাত্তা এই অফিসারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। রায়হান হত্যা ঘটনায় অভিযোগের অগ্রভাগে থাকা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবর পালিয়েছেন বলে খবর রটেছে।

এ বিষয়ে অবশ্য বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলছেন। কেউ বলছেন, তিনি পুলিশের হাতের মুঠোতেই আছেন। আবার পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি নাগালের বাইরে। চাকরির পরোয়া না করেই অবৈধ টাকার পেছনে ছোটাই ছিল তার একমাত্র কাজ। সোর্স আর লাইনম্যানদের দিয়ে শুধু বন্দরবাজার ফাঁড়ি থেকেই প্রতি মাসে আকবরের অবৈধ আয় ছিল ৫ লাখ টাকা। কাজ না করেই অবৈধ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ নিতেন পুলিশের বড় কর্তাদের।

গত শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতে মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য ফাঁড়িতে নির্যাতন করে রায়হান উদ্দিন নামের যুবককে খুনের ঘটনার পর তার সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও চুপ। এরপর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে আকবরের ভয়ংকর সব ঘটনা। রায়হানের মৃত্যুর পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেনসহ চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়েছে আরও তিনজনকে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে যাদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তাদেরকে বরখাস্ত ও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই মামলার সার্বিক তথ্য ইতোমধ্যে পিবিআইকে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন সবকিছু পিবিআই দেখবে। এসআই আকবর পুলিশের নির্দেশনা থাকার পর আত্মগোপনে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের নির্দেশনা ছিল মহানগরী এলাকা না ছাড়ার জন্য। আমাদের পাশাপাশি পিবিআইও বিষয়টি তদন্ত করছে। এখন তারা তাকে গ্রেফতার করবে কিনা এটা তাদের বিষয়। অপরাধ করলে শাস্তি অবশ্যই পেতে হবে বলেও মন্তব্য করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।


‘সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন’ সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এসআই আকবর হোসেনসহ তার একটি গ্রুপ রয়েছে। যারা অপরাধীদের সঙ্গে সখ্য করে পুলিশের চাকরি করে। তারা এক দিনে অপরাধ জগতে পা দেয়নি। দীর্ঘদিন থেকে এই পথে ছিল। যার ফলে সাধারণ মানুষকে পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতন করতে তাদের বুক একটুও কাঁপতো না। কারণ বিপদে পড়লে ওপরের ছায়া তাদের মাথায় আছে। সেই ছায়া দেওয়া ব্যক্তিরা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিতেন।

তিনি আরও বলেন, বন্দরবাজার ফাঁড়ির বহু ঘটনায় কোনও বিচার হয়নি। এই ফাঁড়ি কেন্দ্রিক নারী ব্যবসা, ছিনতাই, পকেটমার, মাদক ব্যবসা ও জুয়া খেলা চলতে থাকলে পুলিশের ভূমিকা থাকতো দর্শকের মতো। রায়হানকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা বাংলাদেশের যুদ্ধের ইতিহাসকেও হার মানায়। রায়হানদের যাদের দেখাশোনা করার কথা, তারাই দুর্নীতিবাজ। তাই এসব অপরাধ বেড়েই চলছিল।

পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকাল ৩টা ১০ মিনিট পর্যন্ত আকবর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতেই ছিলেন। তখন পর্যন্ত তাকে বেশ চিন্তিত দেখা গেছে। এরপরই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। আকবর তার নিজের ব্যবহৃত এবং সরকারি মোবাইল সেট দুটোই ফাঁড়িতে রেখে গায়েব হন। গা ঢাকা দিয়ে কোথায় আছেন, সেই হদিস কেউ দিতে পারছেন না। তবে অভিযুক্ত অন্য সদস্যদের পুলিশ লাইনে রাখা হয়েছে। এএসআই আশেক এলাহি, কুতুব উদ্দিন, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ, হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও সজীব এখন পুলিশ লাইনে বিশেষ নজরদারিতে আছেন। তবে রায়হান উদ্দিন হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি।

পুলিশ সূত্র জানায়, বন্দরবাজার ফাঁড়িকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দুই শিফটে চলে হকারদের ব্যবসা। সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ করলেও পুলিশ টাকা নিয়ে হকারদের রাস্তায় বসিয়ে দেয়। প্রতিটি হকারের কাছ থেকে ব্যবসা বুঝে আদায় করা হয় ৩০-৫০ টাকা। এই এলাকার রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে প্রতিদিন দেড় শতাধিক হকার ব্যবসা করেন। এছাড়া ছিনতাইকারীদের কাছ থেকেও টাকা আদায় করতেন এসআই আকবর। সবচেয়ে বেশি টাকা নিতেন সিলেটের আপা সিন্ডিকেটের কাছ থেকে। এই চক্রের মূল হোতা পপি, মুন্নি, স্বপ্না ও মালা। চক্রটি সিলেটের বিভিন্ন মার্কেটে নারী ও পুরুষদের বেকায়দায় ফেলে মোবাইল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিতো। আকবর খবর পেলে আর রেহাই পেতো না পপি সিন্ডিকেটের সদস্যরা। যতক্ষণ না আকবরকে টাকা না দেওয়া হতো ততক্ষণ আকবরের সোর্সরা তাদের খুঁজতো। টাকা পেলে সব অপরাধ মাফ।

এছাড়া সুরমা মার্কেটের দুইটি, মহাজনপট্টি ও কালিঘাটের দুইটি এবং জিন্দাবাজারের দুইটি হোটেলে গোপনে নারী ব্যবসা চলতো। প্রতিটি হোটেল থেকে মাসে ৫ হাজার করে টাকা দিতে হতো আকবরকে। সিলেট নগরীর তালতলা, লালদিঘীরপাড়, কাষ্টঘর ও মির্জা জাঙ্গালের জুয়া ও মাদকের স্পট থেকে এসআই আকবর প্রতি সাপ্তাহে তিন হাজার টাকা করে আদায় করতেন। অভিযোগ রয়েছে কোনও কাজে আকবরের কাছে গেলে তিনি টাকা ছাড়া কথাই বলতেন না।


কাজিরবাজার মাদ্রাসার শিক্ষক ফুয়াদ আদনান জানান, তার এক বন্ধুর একটি কাজের জন্য একবার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে গিয়েছিলেন। পরে তাদের নিয়ে এসআই আকবর বন্দরবাজার এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে বসেন। কাজটি করে দেওয়ার জন্য তিনি এক লাখ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় আকবর তাকে ফোন করে হুমকি দেন। পরে ভয়ে তিনি স্ট্যাটাসটি মুছে ফেলেন।

ফাঁড়ির আওতাধীন কালিঘাটের চালের আড়তের ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, লকডাউনের সময় একদিন দোকান খুলেছিলাম। তখন টহল পুলিশ এসে খবর দেয় ফাঁড়িতে যাওয়ার জন্য। ফাঁড়িতে গেলে এসআই আকবর দোকান খুলতে পুলিশের অনুমতির জন্য ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। না হলে মামলা দেবেন। এরপর ভয়ে আর দোকান খুলিনি। তখন চাকরি থেকে ৩ জন কর্মচারীকে ছাঁটাই করে দেই।

আকবরের চাঁদাবাজির যন্ত্রণায় গত জুলাই মাসে অন্যত্র চলে যান এক এসআই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, প্রতিদিন রাতে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তার জন্য টাকা আদায় করতে হতো। সন্ধ্যা থেকে রাত আড়াইটা তিনটা পর্যন্ত ফাঁড়িতে বসে থাকতো সে। ভোর পর্যন্ত ফাঁড়িতে ৩-৪ জন লোক ধরে না নিয়ে আসলে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতো। সবকিছুর শেষ আছে। এখন সে তার পাপের ফল ভোগ করছে।