রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ



হাকালুকিতে ধরা পড়ছে রুপালি ইলিশ

নিউজ ডেস্ক::




দেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী হাওর হাকালুকিতে ধরা পড়ছে ইলিশ। এখন প্রতিদিনই জেলেদের জালে কমবেশি ইলিশ ধরা পড়ায় তারা বেজায় খুশি। এমন খবরে আনন্দিত এ জেলার মৎস্য বিভাগ, জেলে সম্প্রদায় ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এখানকার বাসিন্দাদের কাছে অন্যান্য মাছের সঙ্গে হাকালুকি হাওরের ইলিশের কদরও ব্যাপক। পর্যাপ্ত চাহিদা থাকায় তারা দামও পাচ্ছেন ভালো। তাই তারা কেজি দরে বিক্রি না করে পিস বা একসঙ্গে সব ইলিশ বিক্রি করছেন। এমনটি জানালেন হাওর তীরবর্তী কুলাউড়ার আছুরি ঘাট ও ঘাটের বাজার এলাকার সায়েদ মিয়া, তৈয়ব মিয়া, আশ্রব আলীসহ কয়েকজন জেলে। তারা জানালেন অযত্ন আর অবহেলার পরও ঐতিহ্য হারাতে বসা হাকালুকি হাওর মৎস্য উৎপাদন থেকে এখনো মুখ ফিরিয়ে নেয়নি।


সম্প্রতি পালের মোড়া এলাকায় ১৩-১৫ কেজি ওজনের বোয়াল আর বরমচাল এলাকার একটি ব্রিজের পাশ থেকে ১০-১২ কেজি ওজনের ধরাপড়া কাতলা মাছ জানান দিচ্ছে এবারও হাওরের মাছের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তাছাড়া নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির মাছের সঙ্গে মিলেছে বিলুপ্ত প্রজাতির রাণী মাছ। আর ৪-৫ কেজি ওজনের বোয়াল, রুই, কাতলা ও মৃগেল তাদের জালে প্রায়ই ধরা পড়ছে। এতে তারা আশান্বিত হচ্ছেন। জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার স্থানীয় হাওর সংলগ্ন বাজারগুলোতে এ সময়ে প্রতিদিনই হাওরের অন্যান্য মাছের সঙ্গে কমবেশি বিক্রি হচ্ছে হাকালুকি হাওরের ইলিশ। এমন তথ্য হাওর তীরের স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের। অন্যান্য বছরের মতো এবারও হাকালুকি হাওরে জেলেদের জালে অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছের সঙ্গে রুপালি ইলিশ ধরা পড়ার খবরে মহাখুশি হাওর পাড়ের জেলে সমপ্রদায়, মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, ইলিশের এমন ধারাবাহিকতা থাকলে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবেন তারা। জানা যায় গেল প্রায় মাসখানেক থেকে স্থানীয় বাজারে অন্যান্য মাছের সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে হাকালুকির মাঝারি ও ছোট ইলিশ।

জানা যায়, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা ও দীর্ঘ স্থায়ী জলাবদ্ধতার পর হাকালুকি তার আপন গতি বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। কারণ ওই বছরের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বোরো ধান পচে পানি দূষিত হয়ে হাওরের মাছ, হাঁস, জলজপ্রাণি ও উদ্ভিদ মারা যায়। এমন দুর্দিন যাওয়ার পর হাকালুকি তার গতি-প্রকৃতিতে ফেরা নিয়ে দেখা দেয় দুশ্চিন্তা। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে হাকালুকি ফেরে তার চিরচেনা স্বরূপে। দীর্ঘদিন পর ইলিশ উৎপাদনে হাকালুকি হাওর ঐতিহ্য ফেরায় বেজায় খুশি সংশ্লিষ্টরা। অন্যান্য বছর মাঝেমধ্যে ইলিশের দেখা মিললেও এ বছর তা বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয় মৎস্য বিভাগ ও হাওর পাড়ের জেলেরা। হাকালুকি হাওর তীরবর্তী বাজারগুলোতে মাঝারি এবং ছোট আকারের ইলিশ অন্যান্য মাছের সঙ্গে বিক্রি করছেন স্থানীয় মাছ বিক্রেতারা।

জেলেরা জানান, এ ইলিশ সাগরের ইলিশের মতো এতো ঘ্রাণ কিংবা স্বাদ না হলেও ক্রেতাদের চাহিদা প্রচুর। জুড়ী উপজেলার তেঘরিঘাট, কন্টিনালা, নয়াগ্রাম, খালের মুখ, খাগটেকা এলাকায় হাকালুকি হাওরের মাছ বিক্রেতাদের কাছে গেল প্রায় এক মাস থেকে মিলছে ইলিশ। এমন তথ্য স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের। বিক্রেতারা জানান হাওরের ভাসমান পানিতে এখন জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ইলিশ। ওই স্থানের মাছ বিক্রেতারা জানান, স্থানীয় জেলেরা হাকালুকি হাওরের অন্যান্য মাছের সঙ্গে তাদের কাছে ইলিশও বিক্রি করছেন।


‘হাওর বাঁচাও, কৃষকবাঁচাও’ সংগ্রাম কমিটি কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন আহমদ বাদশা ও জেলা বন্যা প্রতিরক্ষায় প্রেসার গ্রুপের সভাপতি সাংবাদিক বকশি ইকবাল আহমদ জানান, আগে সব সময়ই হাকালুকি হাওর ও কুশিয়ারা নদীতে বড় বড় ইলিশ ধরা পড়তো। গেল কয়েক বছর থেকে নতুন করে হাওরে রুপালি ইলিশ ধরা পড়ছে। এখন নানা কারণে আগের মত ইলিশের উৎপাদন হচ্ছে না। স্থানীয় নদী হাওরের বিলগুলো খনন হলে ইলিশসহ অন্যান্য মাছেরও উৎপাদন বাড়তো। আর রক্ষা পেতো মহাহুমকিতে থাকা নানা প্রজাতির জীব-বৈচিত্র্য।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনে সরকারের নানা উদ্যোগ সফল হওয়ায় এর সুফলতা দেশজুড়ে মিলছে। তিনি জানান, হাওরের উন্নয়নে একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়। তা বাস্তবায়ন হলে হাকালুকি হাওরে ইলিশ ও জীব-বৈচিত্র্যসহ তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে।